বোম্বে মেইল এই স্টেশনে এসে থামা মাত্র আমি ক্যারিজের দিকে এগিয়ে গেলাম। ট্রেনে সাকুল্যে একটাই সেকেন্ড ক্লাস। আমি কমপার্টমেন্টের জানালা নামিয়ে দেখি লাল দাড়িঅলা এক লোক ট্রেনের কম্বল গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে। দেখেই বুঝলাম এ সেই লোক। তার বুকের খাঁচায় খোঁচা দিলাম আলতো করে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল লাল দাড়ি, ঘোত-ঘোত করতে করতে বলল, আবার টিকেট?
না, জবাব দিলাম আমি। আমি আপনাকে বলতে এসেছি সে হপ্তাখানেকের জন্যে চলে গেছে দক্ষিণে। কথাটা পুনরাবৃত্তি করলাম আবার জোরে।
এদিকে ট্রেন নড়তে শুরু করছে। লাল দাড়ি দুহাতে চোখ ঘষছে। সে হপ্তাখানেকের জন্যে চলে গেছে দক্ষিণে? কথাটা রিপিট করল সে। সে তো যাবেই। ওটাই তার কম্ম। ভালো কথা, সে কি কিছু দিতে বলেছে। আপনাকে? কিন্তু আমি দেব না।
না, বলেনি, বলে চলন্ত ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। তাকিয়ে রইলাম অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকা ট্রেনের পেছনের লাল বাতি দুটির দিকে। ভীষণ ঠান্ডা পড়েছে, বাতাস বালু ওড়াচ্ছে। আমি এবার নিজের ট্রেনে চড়ে বসলাম, তবে মধ্যম শ্রেণীতে নয়। লোকগুলোর ব্যাপারে আর কৌতূহল দেখালাম না। কিন্তু জানতাম না এদের সাথে আবার আমার অদ্ভুতভাবে দেখা হয়ে যাবে। এক আশ্চর্য গল্প জন্ম নেবে এ থেকে। সে কথাতেই এবারে আসছি।
শুরুতেই বলেছি আমি ভ্যাগাবন্ড, যখন পেটের টান পড়ে একটা কিছু কাজ জুটিয়ে নিই।
এবার একটা খবরের কাগজে ফোরম্যানের চাকরি হলো আমার। একদিন ফোরম্যানের ডিউটি পালন করতে গিয়ে সেই লোকগুলোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সেই দুজন, যাদের এক জনের সাথে আমার ট্রেনে দেখা হয়েছিল।
সেই লোকটি বেঁটেখাটো। তার সঙ্গী সেই লালদাড়ি। তবে ওদের দেখে আমি খুশি হতে পারলাম না। কারণ সারা রাত ডিউটির পরে এখন আমার ঘুমের সময়। এখন এদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তা ছাড়া এরা আমার এমন ঘনিষ্ট কেউ নয় যে, এদের জন্যে ঘুম নষ্ট করতে হবে। অবশ্য এদের দেখে আমার এড়িয়ে যাবার চেষ্টার পেছনে একটা কারণও আছে। বেঁটে লোকটা, অর্থাৎ আমার ট্রেনের সেই সহযাত্রী ডেগুম্বরের রাজাকে ব্ল্যাকমেইল করার পরিকল্পনা করেছিল। সে ব্যাকউডসম্যান নামের পত্রিকায় ভুয়া সাংবাদিক সেজে কাজটা করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তার পরিকল্পনার বাদ সাধি। ফলে ব্ল্যাকমেইলিং-এর প্ল্যান ভুল হয়ে যায় তার। এ কারণে আমার ওপর রাগ ছিল তার।
তাই তাকে দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠছিলাম। অবশ্য অতীত প্রসঙ্গের ধারে কাছ দিয়েও গেল না সে। হয়তো নতুন ফন্দি এঁটেছে, আমার সাহায্য দরকার। আমার ধারণাই ঠিক। লাল দাড়ি বলল, তোমার কাছে এসেছি একটা সাহায্যের জন্যে। আগেই বলে রাখি, ডেগুম্বরের মতো কোনো ঘটনা যেন ঘটাতে যেয়ো না। তা হলে কিন্তু খবর আছে, হ্যাঁ।
জবাবে আমি কিছু বললাম না, চুপ করে রইলাম। এবার কথা বলল আমার ট্রেনের সঙ্গী, বেঁটেখাটো লালচুলো মানুষটা। বলল, কথা শুরুর আগেই নিজেদের পরিচয় দিয়ে নিই। এ হলো আমার ভাই ড্যানিয়েল ড্রাভট আর আমি পিচি কার্নেহান। আমাদের পেশা সম্পর্কে যত কম মুখ খুলব। ততই মঙ্গল। তবে আমরা এমন কোনো কাজ নেই যা করিনি। সৈনিক, নাবিক, কম্পোজিটর, ফটোগ্রাফার, প্রুফরিডার, ফেরিঅলা, সাংবাদিক সব ধরনের পেশায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। আমরা সারা ভারতবর্ষ চষে বেরিয়েছি। বেশিরভাগ সময়ই পায়ে হেঁটে। তবে এ জীবন আমাদের আর ভালো লাগে না। তাই ঠিক করেছি রাজা হব।
রাজা হবে? অবাক হয়ে গেলাম আমি। বললেই রাজা হওয়া যায় নাকি?
অবশ্যই যায়। বলল ড্রাভট। রাজা হবার স্বপ্ন আমরা দেখে আসছি গত ছমাস ধরে। কোন দেশের রাজা হওয়া যায় সন্ধান পাবার জন্যে আমরা বই-পত্র, মানচিত্র সব ঘেঁটেছি। শেষে এমন একটা জায়গার সন্ধান পেয়েছি, যেখানে আমাদের মতো করিকর্মা মানুষের পক্ষে রাজা হওয়া সহজ কাজ। জায়গাটার নাম হলো কাফিরিস্তান। যতদূর জানি এটা আফগানিস্তানের সর্বানে, পেশোয়ার থেকে তিন শ মাইল দূরে। ওখানে স্লেচ্ছ লোকদের বাস। আমরা ওখানেই ঘাটি করব। পাহাড়ি এলাকা, আর মেয়েগুলো বেশ সুন্দরী।
কিন্তু এই ব্যাপারটা আমাদের চুক্তির বাইরে। বলল কার্নেহান। মদ কিংবা মেয়েমানুষ স্পর্শ করা যাবে না, ড্যানিয়েল।
জানি সেটা। আমরা ওখানে গিয়ে অশিক্ষিত লোকগুলোকে সহজেই বশ করতে পারব। তারপর এক সময় রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজেরাই রাজা হয়ে যাব।
আরে, সীমান্ত থেকে পঞ্চাশ মাইল ভেতরে যেতে পার কিনা তাই। দেখ, ব্যঙ্গ করলাম আমি। স্রেফ কচু কাটা হয়ে যাবে। ওই দেশে পৌঁছুতে তোমাদের আফগানিস্তানের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। ওখানে শুধু পাহাড় আর গ্লেসিয়ার। কোনো ইংরেজ আজতক আফগানিস্তান পাড়ি দিতে পারেনি। পাহাড়ি লোকগুলো ভয়ানক হিংস্র স্বভাবের। ওখানে যেতে পারলেও কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না।
তুমি আমাদের পাগল ভাবতে পার, বলল কার্নেহান, তাতে বরং আমরা খুশিই হব। যাকগে আমরা যে জন্যে এসেছি তোমার কাছে সেটা শোন। তুমি আমাদের এই দেশটা সম্পর্কে কিছু জ্ঞান দাও। আর ওদের ম্যাপটা দেখাও। আমরা বইটই পড়তে পারি। তবে তোমার মতো শিক্ষিত নই।
আমি ওদের অনুরোধে ভারতের বিশাল ম্যাপটা খুলে বসলাম, দুটো ফ্রন্টিয়ার ম্যাপও দেখালাম। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে ইনফকান ভল্যুম পড়েও শোনালাম।
