মেলিনা জেমসের এহেন আচরণের কার্যকারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করল। জেমস হঠাৎ এমন বদলে গেল কেন? এ যেন এক অপরিচিত কেউ ওকে গ্রাস করতে চাইছে। মৃত্যুভয় কি মৃত্যুর চেয়েও খারাপ? প্রথম চুম্বন বলতে কী বোঝাতে চাইল জেমস? এসব কী ঘটছে?
মাথাটা ঝাঁকিয়ে জেমসের বন্ধন থেকে নিজেকে ছুটিয়ে নিতে চাইল মেলিটা। কিন্তু ওকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছে জেমস। মেলিটার মুখ দিয়ে আর্তচিৎকার বেরিয়ে এল, প্রতিধ্বনি তুলল বাথরুমে, ঘোঁতঘোত করছে জেমস। গাঁজলা তোলা গাৰ্গলের শব্দে থেমে গেল ঘোঁতঘোঁতানি।
মেলিটার মুখ দিয়ে ঝলক ঝলক রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল জেমসের ছুরিটি তার মাথার পেছন দিকে বসে যেতে। ছুরিটি মন্থর গতিতে চামড়া কাটতে কাটতে এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত পৌঁছাল। মেলিটার কপাল নিখুঁতভাবে কেটে ফেলা হলো। জেমস মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে বসে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে কাজটি করছে। মেলিটার পৃথিবী অবশেষে ডুবে গেল নিকষ আঁধারে…
.
সদর দরজার তালায় চাবি লাগানো হলো। ধাক্কা মেরে খুলে ফেলা হলো দরজা। প্লাস্টিক ক্যারিয়ার ব্যাগে শ্যাম্পেনের বোতল পরস্পরের গায়ে লেগে মিষ্টি টুং টাং শব্দ তুলল।
মেল, মাই ডার্লিং, তুমি চিন্তাই করতে পারবে না আমাদের অ্যানিভার্সারীর জন্য কী জিনিস নিয়ে এসেছি। মেল?
জেমস ওর পেছনে বন্ধ করে দিল দরজা। দেখল বাথরুমে আলো জ্বলছে। ও পা বাড়াল ওদিকে। দরজা ভেজানো দেখে ধাক্কা মারতেই খুলে গেল। সামনে ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের দৃশ্য ওকে বরফের মতো জমিয়ে দিল। ওহ, মাই গড! মেল!
ওর মনে প্রথমেই যে চিন্তাটা এল তা হলো জনের হাত থেকে স্কালপেলটা কেড়ে নিয়ে প্রচণ্ড একটা ঘুসি বসিয়ে দেয়। বীভৎস দৃশ্যটা ওর মতো শক্ত সমর্থ মানুষকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে। দুপুরের খাবার পেট ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে মুখ দিয়ে।
বাথটাব বোঝাই লাল ফেনা, সারফেসে ভাসছে মেল, চোখ জোড়া স্থির নিবদ্ধ ছাতের দিকে, এ দৃশ্য আর সহ্য হলো না জেমস হিদারিংটনের। সে ছুটে গেল ওয়াশ বেসিনে। তার জমজ ভাই জন বাচ্চাদের মতো হামাগুড়ি দিচ্ছে রক্তমাখা কার্পেটের ওপর, ডানে বায়ে দুলছে, গা থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে মেলের শরীরের রক্ত।
জেমস ছুটে গেল ফোনের কাছে। ৯৯৯ নম্বরে ডায়াল করল, তারপর একটু ভেবে রেখে দিল রিসিভার। আবার ফোন করল ও। তবে এবার অন্য জায়গায়।
প্রফেসর সিনক্লেয়ার বলছেন? জি, আমি জেমস হিদারিংটন। জি। ওকে পেয়েছি। তবে এবারে ওর অবস্থা আগের চেয়ে অনেক খারাপ। আপনি দয়া করে তাড়াতড়ি চলে আসুন।
বাথরুমে ফিরে এল জেমস। জনের মুখ দিয়ে যে শব্দগুলো বেরুচ্ছে। তার কথা সে কোনদিন ভুলবে না। সুন্দরী মেল, এখন তুমি আমার। তোমাকে আমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। এমনকী আমার। ওই বিশ্রী বড় ভাইটা জেমসও নয়। আমি জীবনে কোনদিন প্রথম হতে পারিনি। সবসময় দ্বিতীয় হয়েছি। তবে এবারে আর নয়। সুন্দরী মেল, সুন্দরী…
দ্য মেন হু উড বি কিং – রাডিয়ার্ড কীপলিং
যে গল্পটি বলতে যাচ্ছি তার শুরু একটি ট্রেনে। ট্রেনটি মাহা থেকে আজমীর যাচ্ছিল। পকেটে মালপানি কম ছিল বলে মধ্যম শ্রেণীর যাত্রী হয়েছিলাম আমি। মধ্যম শ্রেণীতে আরাম-আয়েশের কোন ব্যবস্থা নেই। নিতান্ত দরিদ্র শ্রেণীর লোকজন ছাড়া এতে কেউ যাতায়াতও করে না। আর আমি সেই শ্ৰেণীরই মানুষ। ভ্যাগাবন্ড টাইপের, কোন পিছু টান নেই, পেটে টান পড়লে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজটাজ জুটিয়ে নিতে পারি।
মধ্যম শ্রেণীতে এবারের ভ্রমণটা অবশ্য আমার কাছে আরামদায়কই মনে হচ্ছিল। কারণ নাসিরাবাদ পর্যন্ত কেউ আমার কমপার্টমেন্টে ওঠেনি, হাত-পা ছড়িয়েই আসতে পারছিলাম।
নাসিরাবাদ পৌঁছানোর পরে এক লোক উঠল। চেহারাসুরতে আমার মতোই ভ্যাগাবন্ড টাইপের। আর ভয়ানক বাক্যবাগীশ। ভারতবর্ষের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ল সে যাত্রার শুরুতেই। আর এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে সে কথা বলতে ছাড়ল না। এক পর্যায়ে সে আমাকে ধরে বসল আজমীর থেকে ফেরার পথে আমি যেন অবশ্যই মারোয়ার জংশনে, বোম্বে মেইলের একটি কক্ষে উঁকি মেরে দেখি। কারণ সে তার জন্যে কিছু জিনিস নিয়ে আসবে।
আমার সেই মেসেঞ্জার, বলল আমার নতুন যাত্রী, লাল দাড়িঅলা দীর্ঘদেহী পুরুষ। একটা সেকেন্ড ক্লাস কমপার্টমেন্টে হাত-পা ছড়িয়ে তাকে ঘুমাতে দেখবেন আপনি। আপনার কাজ হবে তার কমপার্টমেন্টের জানালা খুলে সে হপ্তাখানেকের জন্যে দক্ষিণে চলে গেছে, এই কথাটি শুধু বলা। আপনার মায়ের কসম, কাজটা আমার জন্যে আপনি করবেন। তা হলে আমার খুব উপকার হবে।
সমস্যা হলো আমি সহজে কাউকে না বলতে পারি না। আর লোকটা যেভাবে আমাকে মিনতি করছিল, খারাপই লাগছিল বলা যায়। শেষে তাকে কথা দিতে বাধ্য হলাম, কাজটা আমি করব। সে খুশি হয়ে রাস্তার ধারে একটি ছোট স্টেশনে নেমে পড়ল। আর আমাকে নিয়ে ট্রেন ছুটে চলল আজমীরের দিকে।
আজমীরে কিছু কাজ ছিল আমার, সেগুলো সেরে নাইট মেইলে চড়ে রওনা হয়ে গেলাম গ্রেট ইন্ডিয়ান ডেজার্ট অভিমুখে। প্রতিশ্রুতি মাফিক নেমে পড়লাম মারোয়ার জংশনে। এখানে নেটিভদের তৈরি একটি রেলওয়ে। আছে, ট্রেন যোধপুর পর্যন্ত যায়। বোম্বে মেইল মারোয়ার জংশনে খানিক বিরতির জন্যে থেমে দাঁড়ায়।
