নিক ভেলভেট পেশায় একজন তস্কর। তবে বিশেষ ধরনের চোর।
সে কখনও টাকা চুরি করে না, নিজের হাতে তো নয়ই। সে কাজ করে চুক্তি ভিত্তিতে। এমন সব কাজ যা অন্য তস্করদের জন্য শুধু বিপজ্জনকই নয়, অস্বাভাবিকও বটে। সে চুরি করেছে জাদুঘর থেকে, কর্পোরেশন থেকে, সরকারের কাছ থেকে। সে একটি ডাকঘরের সর্বোচ্চ তলা থেকে রোমান দেবতা মার্কারীর একখানা মূর্তি চুরি করেছে, মধ্যযুগীয় শিল্পকলার জাদুঘর থেকে চুরি করে এনেছে দাগে ভরা একটি কাঁচের জানালা। একবার সে গোটা একটি বেসবল টিম চুরি করেছিল দলের ম্যানেজার, কোচ এবং নানান ইকুইপমেন্টসহ।
এমন নয় যে এ কাজটি তার পছন্দের কিংবা এটিকে সে ক্যারিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। তবে ঘটনা যখন ঘটে যায় এ নিয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি নিক। তার চৌর্যবৃত্তির পারিশ্রমিক বেশ মোটা অঙ্কের এবং বছরে সে বড়জোর চার পাঁচবার এ কাজটি করে। আর কাজ সারতে সে এক হপ্তা বা এরচেয়ে বেশি সময় নেয় না। তাকে তার ক্লায়েন্টরা ঠিকঠাক পারিশ্রমিক দেয় এবং পেশার সুবাদে দারুণ ইন্টারেস্টিং লোকজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তস্কর চূড়ামণির।
তবে হ্যারি স্মিথ সেই ইন্টারেস্টিং মানুষজনের পর্যায়ভুক্ত নয়।
লোকটা ঝর্নার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল গ্যাংস্টারদের মতো ভাব ধরে। তার ভাব মোটেই পছন্দ হলো না নিক ভেলভেটের, বিশেষ করে যখন নিজের পরিচয় দিল শুধু স্মিথ বলে। তার নামটিও পছন্দ হলো না নিকের।
শিকাগোর এক লোক আপনার নামটি সুপারিশ করেছেন, ভেলভেট। বলল স্মিথ। তার বলার ভঙ্গিটিও চাঁছাছোলা।
হতে পারে। আপনি কী চান?
এখানে দাঁড়িয়েই কথা বলব? আমার হোটেল রুম আছে।
হাসল নিক ভেলভেট। হোটেল রুমে সহজেই ছারপোকা পাতা যায়। আমার বিজনেস ডিল রেকর্ড হবে আমার তা পছন্দ নয়।
কাঁধ ঝাঁকাল হ্যারি স্মিথ। বর্তমান জমানায় যে কেউই আপনার কথা আড়ি পেতে শুনতে পারে। হয়তো এ মুহূর্তে কেউ লং রেঞ্জের আড়িপাতা যন্ত্র দিয়ে আমাদের কথা শুনছে।
এজন্যই ঝর্নার ধারটা বেছে নিয়েছি। পানি পড়ার শব্দে আমাদের কথা শোনা যাবে না। এখন কাজের কথায় আসুন।
মাথার ওপরে গাছে ঢাকা বাড়ির আলো পড়েছে ঝর্নার চত্বরের এক পাশে। বৃত্তটির মাঝখানে এসে দাঁড়াল হ্যারি স্মিথ। বেশ গাট্টাগোট্টা ধরন, ছোটখাট গরিলাই বলা যায়, উভয় গালে বসন্তের দাগ।
আপনাকে একটা জিনিস চুরি করতে হবে।
সে আগেই বুঝতে পেরেছি। আমার দর কিন্তু অনেক উঁচু।
কত উঁচু?
পঁচিশ হাজার এবং তার ওপরে, নির্ভর করে কাজের ধরনের ওপর।
এক কদম পিছিয়ে গিয়ে অন্ধকারে ঢুকে পড়ল হ্যারি স্মিথ।
আপনাকে চিড়িয়াখানা থেকে একটি বাঘ চুরি করে এনে দিতে হবে।
নিজের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ বহু আগেই শিখেছে নিক। সে স্রেফ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, বলুন, শুনি।
চিড়িয়াখানাটি শহরেই–গ্লেন পার্ক জু। বাঘটির একটি গালভরা নাম আছে– ক্লাউডেড টাইগার। দুর্লভ প্রজাতির।
কতটা দুর্লভ?
কাঁধ ঝাঁকাল লোকটা। আবার গরিলার কথা মনে পড়ে গেল নিকের। মধ্যপ্রাচ্যের এক প্রিন্স তাঁর ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় জানোয়ারটাকে রাখার জন্য ভাল টাকা দিতে রাজি। আমরা আপনাকে কুড়ি হাজার দিতে পারব।
জীবজন্তুর জন্য ত্রিশ হাজার, বলল নিক। এতে বিপদের আশঙ্কা বেশি।
সেক্ষেত্রে অন্যদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বলুন। জানেনই তো আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে।
দাঁড়ান! দাঁড়ান! নিকের কাঁধ খামচে ধরল হ্যারি স্মিথ। কাজটি আমাদের তিন দিনের মধ্যে করতে হবে–সোমবার সকালে। সিদ্ধান্ত যা নেয়ার আজ রাতেই নিতে হবে।
তাহলে চিড়িয়াখানাটা আমার আগে একবার দেখা দরকার।
কাল এবং রোববার সময় পাবেন দেখার জন্য।
ত্রিশ হাজার?
একটু ইতস্তত করল লোকটা। ঠিক আছে। পাঁচ হাজার অ্যাডভান্স।
ওরা হাত মেলাল। নিক ভেলভেট চলে এল গ্লোরিয়ার বাসায় ব্যাগ গোছাতে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। ওর মাথার ওপরের তারাগুলো ক্রমে নিভে যেতে লাগল।
.
ওরা তিনজন– হ্যারি স্মিথ; হালকা পাতলা গড়নের একজন ইংরেজ, নাম করমিক এবং সোনালি চুলে তরুণী জেনি। কথা শুনে মনে হলো মেয়েটি করমিকের সঙ্গিনী এবং পরিস্কার বোঝা গেল ইংরেজ লোকটিই এ অপারেশনের মাথা। সে নিরাসক্ত গলায় যেভাবে হুকুমজারি চালাল হ্যারি স্মিথের ওপর, প্রভুরা তাঁদের ভৃত্যদের সঙ্গে এ ভাষায় কথা বলেন। আমার জায়গাটা দেখা দরকার, নিক আবার বলল ওদেরকে।
সরু কাঁধ ঝাঁকাল করমিক। আপনার ইচ্ছে হলে দেখবেন।
সোমবার সকালেই কেন কাজটা করতে হবে?
এ প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে টাকা দেয়া হয়নি, মি. ভেলভেট।
ওরা হোটেল রুম ছেড়ে বসেছে নতুন, কালো একটি কনভার্টিবলের পেছনে ছোট একটি হাউস ট্রেইলারে। গাড়ি এবং ট্রেইলার দুটোরই মালিক সম্ভবত করমিক।
বাঘটি সম্পর্কে বলুন। স্কচের গ্লাসে চুমুক দিল নিক।
করমিক বোধহয় প্রাণিবিদ্যার ক্লাসে লেকচার দেয়। সেই ঢঙে বলতে লাগল। চিড়িয়াখানায় বাঘ কোন মহার্ঘ প্রাণী না হলেও কিছু আছে দুর্লভ প্রজাতির যাদেরকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। সাইবেরিয়ান টাইগার এরকম একটি অত্যন্ত দুর্লভ জাতের বাঘ, আলবিনো টাইগারও তাই, আর আছে চীনের কিছু এলাকার নীলচে ধূসর রঙের বাঘ। তবে তথাকথিত ক্লাউডেড ব্যাঘ্রটি এদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্লভ বলে পরিচিত। কয়েক বছর আগে সাইনোইন্ডিয়ান বর্ডারে এ প্রজাতির একটি বাঘ ধরা পড়ে এবং সেটি গ্লেন পার্ক জু তে দান করা হয়। এ ধরনের বাঘ সম্ভবত একটিই রয়েছে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি এবং আমাদের প্রিন্স যে কোনো মূল্যে এ বাঘটির মালিক হতে চান।
