কাজেই গোটা কাজ নিয়ে ভীত ভিন্স ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পরদিন রাতে চুরি করা একটি স্টেশন ওয়াগন নিয়ে, তাতে গ্যাসোলিনের জেরিক্যান এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পেইন্ট থিনারের বড় বড় ড্রাম ভরে ফ্রন্ট স্ট্রিটে হাজির হলো।
পুরানো ওয়্যারহাউজের প্রবেশপথে আলগা ঝুলতে থাকা বোর্ড পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল ভিন্স। অন্ধকারে গা ছমছম করছে। ওয়্যারহাউজ খালি এবং ধুলো ময়লায় ভর্তি, তবে ইনসিওরেন্স কোম্পানি জানে লুই-র ফুট অ্যান্ড
ভেজিটেবল ফার্ম মাত্র হপ্তাখানেক আগে গুদামঘরে ঠেসে রেখেছে মাল।
ভিন্স টের পেল তার হাত কাঁপছে। আমি ঠিকমত কাজ দেখাতে না পারলে লুই আমার পেছনে বিগ বলস ফ্যালকোনিকে লেলিয়ে দেবে।
এমন সময় সে জোরে শ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পেল।
জমে গেল ভিন্স। অন্ধকারে নিজেকে অদৃশ্য করে দিতে ইচ্ছে করল।
কেউ শ্বাস নিচ্ছে। এবং সেটা ভিন্স নয়।
খাইছে আমারে। ওরা তো আমাকে বলেনি এখানে নাইট গার্ড আছে।
আমি নাইট গার্ড নই।
ভিন্স ভয়ানক চমকে উঠল।
আমি পুলিশও নই। কাজেই ভয় পেয়ো না।
কে… ভিন্সের গলা খ্যাড়খেড়ে শোনাল। ঢোক গিলে এবারে একটু গম্ভীর গলায় জানতে চাইল, কে তুমি?
আমি ঘুমাবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু এ জায়গাটা স্টোনহেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সারাক্ষণ লোকজন আসছে আর যাচ্ছে।
ভিখারি, ভাবছে ভিন্স। কোনো ভিখারি গুদামঘরটিকে তার আশ্রয়স্থল বানিয়েছে।
এবং আমি কোনো ভিখারি নই, শক্ত গলায় বলল কণ্ঠটি।
আমি তোমাকে তা বলিওনি, জবাব দিল ভিন্স। তারপর সে কেঁপে উঠল, কারণ ও তো এসব কথা মুখ ফুটে বলেইনি। মনে মনে চিন্তা করেছে। কেবল।
খালি ওয়্যারহাউজের বিপুল অন্ধকারের মাঝে একটা আলো জ্বলজ্বল করে উঠল। ভিন্স একঠায় তাকিয়ে রইল ওদিকে, তারপর বুঝতে পারল ওটা একটা চক্ষু। জ্বলজ্বলে একটা চোখ, কুটিল নয়ন, খাড়া মণি, বেড়ালের মতো। তবে চক্ষুটা বিরাট একটা বলের সমান!
ক্ব-ক্বী…
ওটার পাশে খুলে গেল আরেকটা চোখ। ধিকিধিকি জ্বলা দুটি চোখের আলোয় ভিন্স আবছা ঠাহর করল আঁশযুক্ত একটা মাথাও আছে ওগুলোর সঙ্গে, আর প্রকাণ্ড মুখ জুড়ে দাঁত আর দাঁত।
সে তা-ই করল যা অন্য যে কেউই করত। অজ্ঞান হয়ে গেল ভিন্স।
চোখ খোলার পরে আবারও জ্ঞান হারাতে চাইল সে। পুরানো গুদামঘরের ভাঙা কাঁচের জানালা গলে ঢোকা ভুতুড়ে চাঁদের আলোয় ভিন্স দেখল তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা ড্রাগন।
লম্বা, সর্পিল একটা শরীর, চকচকে সবুজ এবং নীলচে আঁশ দিয়ে মোড়া, চারটে প্রকাণ্ড পায়ে করাতিদের করাতের মতো বিরাট বিরাট থাবা। লেজটি কুণ্ডলী পাকানো, এতই বড় যে ডগা গিয়ে ঠেকেছে ওয়্যারহাউসের আরেক মাথায়।
ভিন্সের ঠিক মাথার ওপর মুখ ভর্তি দাঁত আর বিড়ালের মতো জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে ঝুঁকে আছে প্রাণীটা। হাসছে।
তুমি খুব কিউট, বলল ড্রাগন।
কী?
গত কয়েক রাতে লুই এখানে অন্য যেসব লোকজন পাঠিয়েছে তুমি মোটেই তাদের মতো দেখতে নও। ওরা ছিল বুড়ো, মোটা আর হোঁতকা।
অন্য লোকজন?
সাদা দাঁতের সারির ভেতর দিয়ে ড্রাগনের চেরা জিভ লকলক করে উঠল। তোমার কি ধারণা আরসনিস্ট হিসেবে লুই তোমাকেই এখানে প্রথম পাঠিয়েছে? ওরা গত বেশ কয়েক রাত ধরে এখানে ঝাড় বেঁধে আসছিল।
এখনও চিৎ হয়ে শুয়ে আছে ভিন্স, জিজ্ঞেস করল, ও… ওদের কী হয়েছে?
ড্রাগন পেটের ওপর ভর করে উবু হয়ে বসল। তারপর ভিন্সের দিকে তাকিয়ে হাসল। ওদেরকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। ওরা আমাদের বিরক্ত করতে আসবে না। চেরা জিভটা আবার বেরিয়ে এসে ঘষা খেল ভিন্সের মুখে। হ্যাঁ, তুমি খুব কিউট।
ধীরে ধীরে ফিরে আসছে ভিন্সের হারানো সাহস। সে ড্রাগনের সঙ্গে কথা বলছে বটে, তবে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না এটা সত্যি ঘটছে। সে আস্তে আস্তে উঠে বসল।
আমি তোমার মনের কথা পড়তে পারি, বলল ড্রাগন। কাজেই পালাবার চিন্তার কথা ভুলে যাও।
আ.. ইয়ে, এ জায়গাটাতে আমার আগুন লাগাবার কথা ছিল, স্বীকার গেল ভিন্স।
জানি আমি, বলল ড্রাগন। কথা শুনে শুনে হচ্ছে এটি মেয়ে ড্রাগন।
হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ, বলল সে। আমি মেয়ে ড্রাগন। সত্যি বলতে কী এ পর্যন্ত তোমরা মানুষরা যত ড্রাগনের সঙ্গে ঝামেলা পাকিয়েছ সবগুলোই ছিল মেয়ে ড্রাগন।
সেন্ট জর্জের মতো? অস্ফুটে বলল ভিন্স।
ওটা একটা মরদ নাকি! ওই লোকটা এবং তার বর্ম দুটোই মেয়েলি। শিশা খালা ইচ্ছে করলেই ও যে প্রেশার কুকার গায়ে দিয়েছিল তার মধ্যে ওকে ঝলসে ফেলতে পারত। কিন্তু লোকটাকে দেখে তার এমন হাসি পেয়ে যায় যে, হাসতে হাসতে তার আগুনই যায় নিভে!
কিন্তু সেন্ট জর্জ তো ওকে হত্যা করেছিলেন।
হত্যা করতে পারেনি! রেগে গেল ড্রাগন, বাম নাকের ফুটো দিয়ে ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী বেরুল। শিশা খালা নিজেকে অদৃশ্য করে পালিয়ে যায়। হাসতে হাসতে তার হেঁচকি উঠে গিয়েছিল।
কিন্তু কিংবদন্তি বলে,
রাখো তোমার কিংবদন্তি। ড্রাগন হত্যা করা এতই সোজা! ড্রাগন মারতে পারে এমন মানুষের এখনও জন্ম হয়নি।
আমার ওপর রাগ কোরো না। আমি কিছু করিনি।
না, তুমি কিছু করনি, ড্রাগনের কণ্ঠ নরম শোনাল। তুমি খুব কিউট, ভিন্স।
ভিন্সের মগজে তখন উথাল পাথাল। হয় সে পাগল হয়ে গেছে নতুবা সত্যিই সত্যিকারের একটি আগুন ছোঁড়া ড্রাগনের সঙ্গে কথা বলছে।
