কিন্তু কেনেথের জন্য সে এমন পাগল হলো কেন? কেনেথের ক্লায়েন্টই বা কেন তখন মোৎসার্টের মূর্তির জন্য বায়না ধরেছিল? ব্রড স্ট্রীটের সেকেন্ডহ্যান্ড দোকানগুলোতে মোৎসার্টের মূর্তি কত সস্তায় পেত কেনেথ। কিন্তু সেখানে না গিয়ে সে মেরীর দোকানেই বা কেন সেদিন এসেছিল?
এখন আর এসব ভেবে কী লাভ? কেনেথের সঙ্গে সে এখন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে, এ থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় নেই। দুজনের মিলনই এর অনিবার্য পরিণতি।
কিন্তু পরিণতিকে অনিবার্য করতে হলে তাকে এখন ভাবতে হবে কত দ্রুত, সুন্দর, সহজ এবং দক্ষভাবে জনের কাছে থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।
আর খুব তাড়াতাড়ি।
.
ব্যবসার কাজে দিন তিনেকের জন্য বাইরে গিয়েছিল জন জনসন। লেটিসের সঙ্গে সুখসাগরে গা ভাসিয়েছে সে এই কটা দিন। কিন্তু বাড়ি ফিরে মেরীকে দেখে বিস্ময়ে হাঁ করে গেল সে। মেরীকে এত সুন্দরী মনে হয়নি তার জীবনেও। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো মেরী ছাড়া তার জীবন বৃথা। কিন্তু পরক্ষণে লেটিসের মুখ মনের আয়নায় ভেসে উঠল। সিদ্ধান্ত নিল কাজটা সে আজই করবে। আজকেই সে মেরীকে খুন করবে। তবে কাজটা করবে রাতে। মেরীর সঙ্গে খুশি মনে ডিনার খাবে। মেরী নিশ্চয়ই আজকেও ওর জন্য চমৎকার সব জিনিস রান্না করে রেখেছে। প্রতিবারই করে, বাইরে থেকে ফেরার পরেই। খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে সে মেরীকে চিরতরে বিদায় দেবে এই দুনিয়া থেকে।
কিন্তু মেরীকে কীভাবে হত্যা করবে সেটা এখনও ঠিক করতে পারেনি জন। সুযোগ মিললে দুএকটা মূর্তি ফেলে দেবে ওর মাথায়। নয়তো অন্য কোন উপায় পরে ভেবে বের করা যাবে।
মেরী ঠোঁটে মধুর হাসির রেখা টেনে জনের হাতে কফির কাপটা দিল।
নাও, কফি খাও, বলল সে। লম্বা ভ্রমণের ক্লান্তি কেটে যাবে।
ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞচিত্তে বলল জন। এই মুহূর্তে সত্যি তার এককাপ গরম কফির খুব দরকার ছিল।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে টেবিলের পাশে বসা মেরীর দিকে তাকাল জন। ওর চেহারায় অদ্ভুত একটা অভিব্যক্তি। অবাক হলো জন। গত বিশটা বছর ধরে ওরা পরস্পরের এত কাছে যে সহজেই একে অপরের মনের কথা পড়তে পারে। তাহলে কি মেরী বুঝে ফেলেছে জন তাকে নিয়ে কি ভাবছে? হাসল মেরী; হানিমুনের সেই প্রথম দিনগুলোর মন পাগলকরা নিষ্পাপ হাসি। নাহ্, মেরী কিছু টের পায়নি। অযথাই সে সন্দেহ করছিল ওকে।
ডার্লিং, এক মিনিট, বলল মেরী। দোকানে একটা জিনিস ফেলে এসেছি। ওটা এখুনি নিয়ে আসছি।
উঠে দাঁড়াল মেরী, দ্রুত বেরিয়ে ডাইনিং রুম থেকে, হলওয়ে দিয়ে ঢুকল দোকানে।
কিন্তু এক মিনিটের মধ্যে ফিরল না মেরী। কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে দেখে জন দ্রুত চুমুক দিল কাপে। তারপর সিধে হলো, মেরী দেরি করছে কেন দেখবে।
নিঃশব্দে দোকানে ঢুকল জন। মিডলরুমে, ঝাড়বাতি রাখার ঘরে, একটা সোফায় জনের দিকে পিছন ফিরে বসে আছে মেরী, হাত দুটো একটা মূর্তির ওপর।
ঈশ্বর, জন যা ভেবেছে তাই। মেরী ওর মনের কথা জেনে গেছে। ওর কাঁধ দুটো কাঁপছে। কাঁদছে মেরী। কাঁদছে স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার কথা জেনে। নাকি ও হাসছে? কাঁধ দুটো যেভাবে নড়ছে তাতে মেরী হাসতেও পারে। কিন্তু কাঁদুক আর হাসুক, যাই করুক, ওর অভিব্যক্তি দেখার সময় এখন জনের নেই। এরকম সুযোগ লাখে একটা মেলে। নিচু হয়ে আছে। মেরী। ওর ঠিক মাথার ওপরের তাকে ভিক্টর হুগো, ফ্রাঙ্কলিন এদের বড় বড় সব মূর্তি। যে কোন একটা মূর্তিকে সামান্য ধাক্কা দিলেই ওটা সরাসরি মেরীর মাথায় পড়বে, চৌচির করে দেবে খুলি। শুধু সামান্য একটু ধাক্কা।
ধাক্কা দিল জন।
কত সহজ কাজ!
মেরী! বেচারী মেরী!
যাক্, এটাই সবচে ভালো হলো। ডির্ভোসের জ্বালা আর সইতে হলো তার স্ত্রীকে। কাজটা এত সহজে হবে ভাবেনি জন। সময়ই তো লাগল না। এত অনায়াসে কাজটা যাবে জানলে সে আরও আগে সুযোগটা নিত।
জন খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর শেষবারের মতো মেরীর দিকে তাকিয়ে ডাইনিংরূমে চলে এল। কফিটা শেষ করে ডাক্তারের কাছে ফোন করবে। সন্দেহ নেই ডাক্তার পুলিশকে জানাবে মৃত্যুটা স্রেফ দুর্ঘটনা ছিল। জনকে একটু মিথ্যে বললেই হবে। বলবে মেরী মূর্তি নামাতে গিয়ে হাত পিছলে মাথা ফেটে মরেছে। বলবে মেরীকে সে এর আগেও সাবধান করে দিয়েছিল তাক থেকে ভারি মূর্তি নামানোর সময় যেন সতর্কতা অবলম্বন করে। কিন্তু আমার কিছু হবে না বলে মেরী তার কথার গুরুত্ব দেয়নি।
কফিটা এখনও গরম। তারিয়ে তারিয়ে ওটা পান করল জন। লেটিসের কথা ভাবছে সে। ওকে টেলিফোন করবে, জানাবে আর কোন সমস্যা নেই, এখন নিশ্চিন্তে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু পরক্ষণে নাকচ করে দিল চিন্তাটা। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। লেটিসকে পরে জানালেও চলবে।
আনন্দিত হলেও উল্লসিত হলো না জন। শান্ত থাকল। নিজেকে খুব রিল্যাক্স লাগছে। কাজটা নির্বিঘ্নে করতে পারার আয়েশ আর কি। ঘুম পাচ্ছে ওর। ভীষণ ঘুম। লিভিংরুমের কাউচে গিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। ডাক্তারের কাছে পরে ফোন করলেও চলবে। কিন্তু কাউচে গিয়ে শোয়া হলো না জনের। ডাইনিং টেবিলে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল। হাত দুটো ঝুলতে থাকল টেবিলের পাশে।
.
করুণ ঘটনাটা কিভাবে ঘটল জন কিংবা মেরীর কোন বন্ধুই ঠাহর করতে পারল না। ওদের মনে সামান্য সন্দেহ পর্যন্ত জাগল না। সবাই ধরে নিল মেরী কোন কারণে ওই ভারী মূর্তিগুলো নামাতে গিয়েছিল। হাত ফস্কে মূর্তি পড়ে যায় তার মাথায়, তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে মেরীর। আর বাইরে থেকে জন এসে মৃতা মেরীকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে বেঁচে থাকার কোন মানে নেই। হয়তো জন ওইসময় সুস্থভাবে চিন্তা করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। সে তৎক্ষণাৎ কফিতে ঘুমের ট্যাবলেট গুলে ওই কফি পান করে আত্মহত্যা করে।
