জন আর মেরীর সুখী দাম্পত্য জীবনের কথা স্মরণ করে সবাই আহা উঁহু করতে লাগল। ওদের মনে পড়ল বিংশত বিবাহবার্ষিকীতে এই সুখী দম্পতি তাদের মৃত্যু যেন একসঙ্গে হয় বলে সবার কাছে আশীর্বাদ চেয়েছিল। সত্যি, এযুগে এমন স্বামী-স্ত্রীর দেখা মেলা ভার। কি অসাধারণ ভালবাসা আর টান ছিল পরস্পরের প্রতি। আর এই তীব্র প্রেমই দুজনকে টেনে নিয়েছে অমোঘ নিয়তির দিকে, দুজনেই শেষযাত্রা করেছে অনন্তের উদ্দেশে একই রাতে, যেমনটি তারা চেয়েছিল।
ট্র্যাপ – উইলিয়াম এফ নোলান
ভিন্স থম্পসন দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই দেখল দোরগোড়ায় এক টুকরো কাগজ পড়ে আছে।
বেশ তো! ভাবল সে, আবার তাহলে ডাক পড়ল। মাসখানেক আগে আর শেষবার ডাক পড়েছিল।
দরজা বন্ধ করে টুকরোটার ভাঁজ খুলল ভিন্স। সেই একই চেহারার চিরকুট, শুধু একটা ফোন নাম্বার আর নিচে ইংরেজী আদ্যাক্ষর R। আর কিছু লেখা নেই। লাইট জ্বালাল ভিন্স, শিখার ওপর মেলে ধরল চৌকোণা কাগজটাকে। দ্রুত কালো হয়ে এল অক্ষর আর সংখ্যাগুলো, কুঁকড়ে গেল কাগজ। অবশেষে ছাই-এ পরিণত হলো। ফুঁ দিয়ে আঙুল পরিষ্কার করল ভিন্স, হাত বাড়াল ফোনের দিকে।
ভিন্স? R এর কণ্ঠ বরাবরের মতোই ধাতব আর খনখনে শোনা গেল ওপাশ থেকে।
হ্যাঁ। এইমাত্র খবর পেলাম।
যেতে পারবে তো?
বললে এখুনি বেরিয়ে পড়ি।
এখনই দরকার নেই। আরেকটু পরে বেরুতে হবে। সানসেট-এর পরে বেল এয়ার রোডের মাথায়। পাহাড়টার চুডোর বাঁ দিকে খোলা একটা উঠোন। পঞ্চাশ গজের মতো এগোলে পাহাড়ের মাঝখানে সাদা প্লাস্টার করা একটা বাড়ি দেখতে পাবে। সামনে একটা গ্যারেজ আছে। গ্যারেজের ভেতরে লুকিয়ে থাকবে তুমি। দরজা খোলাই পাবে। কাজেই ভেতরে ঢুকতে কোন অসুবিধে হবে না। এগারোটা নাগাদ তোমার শিকার চলে আসবে। সুতরাং তোমাকে পৌনে এগারোটার মধ্যে ওখানে হাজির থাকতে হবে।
১৬৬
হ্যাঁ, ঠিক আছে। লোকটার চেহারা-সুরত কিরকম?
লম্বা। একহারা গড়ন। চল্লিশের কোঠায় বয়স।
আগের মতোই কাজ সারব?
হ্যাঁ, পরিষ্কার কাজ চাই আমার।
আর কিছু?
না, আর কিছু জানাবার নেই, ভিন্স। কেটে গেল লাইন।
রিসিভারটা যথাস্থানে রেখে কাউচে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ভিন্স থম্পসন। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। কাজ হাসিল মানেই একতাড়া কড়কড়ে নোট। উইলমাকে এবার ফারের কোটটা কিনে দেবে ভিন্স। বেচারীর খুব শখ ফারের কোট পরার। আগামী রাতটা ওরা সেলিব্রেট করবে, একসাথে নাচবে, খাবে দামী খাবার…..।
একটা সিগারেট ধরাল ভিন্স, ফুসফুসে টেনে নিল ধোঁয়া। ভাবছে। রহস্যময় R-কে নিয়ে। এই লোককে কখনো কেউ দেখেনি, জানে না তার পরিচয় কি। অদৃশ্য একটা লোকের কাছ থেকে ফোনে নির্দেশ পায় ভিন্স। চিরকুটে ফোন নম্বর লেখা থাকে। তারপর হুকুম আসে অমুককে খতম করো। কাজ শেষ। সাথে সাথে কড়কড়ে নোট। কোন ঝামেলা নেই। অন্তত এ পর্যন্ত কোন সমস্যায় পড়তে হয়নি ভিন্সকে।
তবুও অস্বস্তিতে ভোগে ভিন্স। নাম পরিচয়হীন এই R কে অশরীরী মনে হয় তার। লোকটার পরিচয় জানার চেষ্টা করেছে অনেক। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। তার মতো আরো অনেকেই R-এর ধাতব, খনখনে কণ্ঠের সাথেই শুধু পরিচিত। কেউ দেখেনি তাকে। তবে ভিন্স একটা কথা স্বীকার করে R এর সেটআপে কোন ভুল থাকে না। অত্যন্ত নিখুঁত তার পরিকল্পনা। সব রকম ঝুঁকি এড়িয়ে চলে বলেই ভিন্স আজও পুলিশের কাছে ধরা পড়েনি।
ভিন্স ঘড়ি দেখল। রাত সাড়ে নটা। আধঘণ্টার মতো লাগবে বেল এয়ার-এ পৌঁছুতে। আরো দশমিনিট যাবে পাহাড় চুড়োয় উঠতে। তার মানে গলা ভিজিয়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট সময় এখনো পাবে সে।
.
বার-টা খদ্দেরে ভরা। শুক্রবার তাই। বেশ কসরৎ করে ভেতরে ঢুকতে হলো ভিন্সের। স্কচ আর পানি আনতে বলে ভিড়ের ওপর চোখ বোলাতে লাগল সে।
আজ রাতে আমি একটা মানুষ খুন করতে যাচ্ছি, মনে মনে ভাবল ভিন্স। আর সেই হতভাগ্য লোকটা হয়তো এ ঘরেই কোথাও আছে। ড্রিঙ্ক এসে গেছে। অল্প চুমুকে গ্লাসটা খালি করছে ভিন্স।
R-এর জন্য এ পর্যন্ত কতজনকে খুন করছে ভিন্স? দশজন? বারোজন? সংখ্যাটা যাই হোক তাতে কিছু আসে যায় না ভিন্সের। ভিন্স থম্পসনের কাছে খুন হচ্ছে পেশা, হিসেব রাখার দায়িত্ব অজানা মি. R এর। বছরখানেক আগে ফ্রিসকো থেকে লস এঞ্জেলস এসেছে ভিন্স। ওর পুরানো বন্ধু মিচ R-কে বলে তার এ কাজটা জুটিয়ে দিয়েছে। R তার কাজে খুশী, মিচ বলেছে ভিন্সকে। তবে মজার ব্যাপার মিচ নিজেও নাকি R সাহেবের চেহারা এখনো চাক্ষুস করেনি।
পেশাদার খুনী হিসেবে বেশ ঠাঁটেবাটে আছে ভিন্স। মার্সিডিজ গাড়ি কিনেছে একটা। বান্ধবীকে দামী গিফট দিতে পারছে। সুদৃশ্য ফ্লাটে থাকছে। ব্যস, আর কি চাই? বারের ওয়েটারগুলোকে বকশিস পেয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসতে দেখে মনে মনে করুণা হলো ভিন্সের। ওরা তিন মাসে যা আয় করে ভিন্স একরাতেই তা রোজগার করে।
স্কচটা শেষ করে আরেকটা ড্রিঙ্ক নিল ভিন্স।
বার ছেড়ে যখন বের হলো, শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগল। একটুও পা টলছে না তার। জানে হাতের কাজটা শেষ করে মাঝরাতের মধ্যে ঘরে ফিরতে পারবে সে। চাই কি উইলমাকে ফোন করে খবরটাও জানাতে পারে।
বেল এয়ার রোডের ঠিক মুখে সানসেট-এর জং ধরা, উঁচু গেটটার নিচে গাড়ি থামাল ভিন্স। কাছে পিঠে গাড়ি-ঘোড়া-মানুষজন কিছু নেই। দ্রুত ড্যাশ বোর্ড খুলে হালকা চেহারার ইটালিয়ান বেরেটা পিস্তলটা বের করল। অস্ত্রটা সবসময় এখানেই রাখে সে। ম্যাগাজিন খুলে চেক করল, তারপর আলগোছে পকেটে রেখে দিল। বুকভরে বাতাস টানল একবার।
