জন যদি মেরীকে ডির্ভোস দেয় তাহলে কে তাকে কনসার্টে নিয়ে যাবে, কে যাবে তার সঙ্গে নাটক দেখতে। তার সবচে প্রিয় জিনিস ডিনার পার্টি জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে। স্বামী পরিত্যক্তা মেরীকে কুশল জিজ্ঞেস করতেও কেউ আসবে না। একা, ডির্ভোসি মেরী বদ্ধ হয়ে পড়বে চার দেয়ালের মাঝখানে, কাটাতে হবে দুর্বিষহ জীবন। না, না, মেরীর এমন ভয়ানক অবস্থার কথা কল্পনাও করতে পারে না জন। যদিও জানে মেরীকে যদি সে বলে, আমি তোমাকে ডির্ভোস দেব, তাহলেও মেরী কোন প্রতিবাদ করবে না। এমনই বাধ্য মেয়ে সে।
নাহ্, ডির্ভোসের কথা বলে মেরীকে অবর্ণনীয় মানসিক যন্ত্রণা দেয়ার কোন মানে নেই। এত কষ্ট পাবার জন্য জন্ম হয়নি ভাল মেয়েটির।
ইস, যদি গতবারের বিজনেস ট্রিপে লেটিসের সঙ্গে তার পরিচয় না হত! কিন্তু জন এই অবিশ্বাস্য ব্যাপারটাকে অস্বীকার করবে কীভাবে? লেটিসের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর, গত ছয়মাস থেকে মনে হচ্ছে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে সে। লেটিসের তুলনায় মেরী কিছুই না। লেটিসকে দেখার পর তার মনে হয়েছে সে যেন দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। সারাজীবন সে কালা ছিল, এখন শুনতে পাচ্ছে। আর অলৌকিক ব্যাপারটা হচ্ছে লেটিসও তাকে ভালবেসেছে এবং বিয়ে করতে চাইছে, তার কোন পিছুটান নেই।
লেটিস অপেক্ষা করছে।
আর জেদ ধরছে।
ভালবাসার এই দৃশ্যপট থেকে মেরীকে বাদ দিতেই হবে। ছোটখাট একটা দুর্ঘটনা ঘটলে ব্যাপারটা বেশ সহজ হয়ে উঠবে। আর দুর্ঘটনা ঘটা বা ঘটাবার জায়গা হিসেবে দোকানটা সর্বোৎকৃষ্ট স্থান। মেরীর মাথার ওপরের তাকে মার্বেল পাথরের যেসব ভারি আবক্ষ মূর্তি এবং ঝাড়বাতি রয়েছে তার দুএকটা যদি পিছলে মাথার ওপর পড়ে যায় তাহলেই কেল্লা ফতে।
.
ডার্লিং, তোমার বউকে কথাটা বলতেই হবে, লেক্সিংটনের হোটেল ঘরে লেটিস জনের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলছিল। ওকে তোমার ডির্ভোস দিতেই হবে। আমাদের সম্পর্কের কথা তুমি এখনও মেরীকে জানাচ্ছ না কেন? লেটিসের কণ্ঠ এত নরম আর মিষ্টি যে জনের মনে হচ্ছিল সে সম্মোহিত হয়ে পড়ছে।
কিন্তু লেটিসের কথা সে কি করে মেরীকে জানাবে?
লেটিসের আবেদন জনের কাছে মোটেও যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয় না।
মেরীর চেহারা বা আচরণে স্বাভাবিক মাধুর্য লক্ষ্যণীয়, কিন্তু লেটিস বেশভূষায় আড়ম্বরপূর্ণ। লেটিস মেরীর মত সুন্দরী না হলেও বিছানায় ওর তুলনা মেলা ভার। লেটিসের উপস্থিতিতে অসাধারণ খেলুড়ে হয়ে ওঠে জন; কিন্তু মেরীর সঙ্গে তার আচরণ ব্যক্তিত্বপূর্ণ স্বামীর মত, রক্ষণশীলতা এখানে অনেকটাই ভূমিকা রাখে। লেটিস কামকলার যে ছলাকলা জানে মেরী হয়তো সেগুলোর নামও জীবনে শোনেনি। লেটিস মানে ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ প্রকৃতির চারটি উপাদান; মেরী মানে-থাক, সে এগুলোর সঙ্গে ওর তুলনা করতে চায় না। পরস্পরের সঙ্গে এত তুলনা করেই বা কী লাভ?
বিছানায় ঝড় তুলে পরিতৃপ্ত জন লেটিসকে নিয়ে নিচে এসেছে, বার-এ লেটিস যাবে কিনা জানার জন্যে প্রশ্ন করতে যাচ্ছে, এমন সময় চেট ফ্লেমিংকে হোটেলে ঢুকতে দেখল ও। লবি পার হয়ে সোজা ডেস্কের দিকে আসছে।
চেট ফ্লেমিং লেক্সিংটনে কি করছে? দরকারী কাজে যে কেউ এখানে আসতেই পারে। নাহ্, প্রকাশ্যে লেটিসকে নিয়ে ঘোরাঘুরি বড্ড ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে। যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় ওরা ধরা খেতে পারে। কোন জায়গাই ওদের জন্য নিরাপদ নয়। আর চেট ফ্লেমিং ওদের দেখে ফেললে কম্ম সাবাড়। বাঁচালটা দুনিয়ার সব লোককে জানিয়ে দেবে জনের সঙ্গে এক সুন্দরীকে সে হোটেলে দেখেছে। আর মেরীর কানে তো সব কথা যাবেই। ওর অন্তরটা তখন টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু অত বেদনা অবশ্যই মেরীর প্রাপ্য নয়।
জন চট করে লেটিসের পেছনে লুকাল। চেট খামোকা ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে রিসেপশনিস্টের সঙ্গে বকবক করতে লাগল। চোখ তুলে তাকালেই চেট তাদের দেখতে পাবে ভেবে জন পাশের নিউজস্ট্যান্ডের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল। চট করে একটা পত্রিকা নিয়ে মুখ নিয়ে মুখ আড়াল করে পড়ার ভান করল। চেট রেজিষ্টারে সই করে লিফটে না ওঠা পর্যন্ত সে ওভাবেই থাকল। তারপর একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক বাবা, বড় একটা ফাড়াকাটল।
জন আর ঝুঁকি নিতে চায় না। লেটিসের সঙ্গে তার সম্পর্কটাকে চিরস্থায়ী বন্ধনে না বাঁধা পর্যন্ত তার শান্তি নেই। কিন্তু একই সাথে মেরীকেও যে তার আঘাত দিতে ইচ্ছে করছে না।
আমেরিকায় হাজার হাজার মানুষ ঘুমের মধ্যে মারা যায়। মেরী কেন তাদের একজন হয় না? কেন তাকে খুন হতে হবে?
জন তার আতঙ্কের কথা খুলে বলল লেটিসকে, আবার যখন লেক্সিংটনে গেল সে।
শুনে মাথা নাড়ল লেটিস। বলল : ডার্লিং, এই কাজ করলে আমিও ফেঁসে যাব। কারণ সবাই তখন আমাকেও সন্দেহ করবে। আমি বলি কী, তোমার বউকে আমার কথা এখুনি বলে ফেলো। আমি কিন্তু আর সহ্য করতে পারছি না। কিছু একটা করো।
হ্যাঁ, সোনা। ঠিক বলেছ তুমি। কিছু একটা করব আমি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
.
আশ্চর্য হলেও সত্যি মেরী জনসনও তার স্বামীর মতো অবস্থায় পড়েছে। প্রেমে পড়ার কথা কল্পনাও করেনি সে। তার বিশ্বাস ছিল সে শুধু জনকেই ভালবাসে। কিন্তু কেনেথকে দেখার পরেই মাথায় কেমন গোলমাল হয়ে গেল। সেদিন সকালে কেনেথ দোকানে এসে জিজ্ঞেস করছিল মেরীর কাছে মোসার্টের আবক্ষ মূর্তি আছে কিনা। হ্যাঁ, তা অবশ্য মেরীর কাছে ছিল; শুধু মোৎসার্ট কেন, বাখ, বিটোফোন, ভিক্টর হুগো, বালজাক, শেক্সপীয়র, জর্জ ওয়াশিংটন, গ্যেটে কার মূর্তি নেই তার কাছে?
