সে ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড় করাল গাড়ি। এক পথচারীকে জিজ্ঞেস করল বিলটন টাওয়ার্সটা কোনদিকে। লোকটা তার দিকে তাকাল এবং চার্লি গ্রাম থেকে এসেছে বুঝতে পেরে বিরক্ত গলায় রাস্তার ওপাশে চোখ তুলে চাইতে বলল, আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করেন নাকি, মিয়া? ঝাঁঝাল সুর তার কণ্ঠে।
চার্লি মুখ তুলে তাকাল। সত্যিই তো রাস্তার ওপাশে আকাশ ছোঁয়া। ভবনটির প্রবেশপথে নিয়ন বাতিতে জ্বলজ্বল করছে নাম দ্য বিলটন টাওয়ার্স। সমস্যা হলো এখানে আসতে তাকে অন্তত আটবার ট্রাফিক জ্যামে পড়তে হয়েছে।
লোকটাকে ধন্যবাদ দিল চার্লি। ইন্ডিকেটর বাতি নিভিয়ে রোদে পোড়া হাতটা বের করে তার শেভ্রলে ঢুকিয়ে দিল কতগুলো গাড়ির সারির মধ্যে।
সঙ্গে সঙ্গে গাড়িগুলো ব্রেক কষল, তারস্বরে হর্ন বাজাতে লাগল। একটা বিশ্রী অবস্থার সৃষ্টি হলো। অবিচলিত চার্লি কোনাকুনিভাবে গাড়ি চালাতে লাগল। গাড়ি নিয়ে এসে থামল পেভমেন্টের সামনে। ইউনিফর্ম পরা এক নিগ্রো দারোয়ান ওকে দেখে মজা পেয়ে হাসছিল।
বাহ, দেখালেন বটে। আপনি নিশ্চয় শহুরে লোক নন, স্যার। মুখ টিপে হেসে চার্লির গাড়ির দরজা খুলে দিল দারোয়ান। চাবিটা রেখে যান। আমি আপনার গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করছি। আপনার মালপত্র পাঠিয়ে দেব, স্যার। কী নাম আপনার?
পার্কার। চার্লি পার্কার। ধন্যবাদ। সে লোকটার কালো হাতে একখানা নোট গুঁজে দিয়ে পা বাড়াল লবি অভিমুখে।
.
আমান্ডা উইন্টারটন ধীরে সুস্থে ঘুরে দেখছে জমকালো সুইটটি।
দামী দামী আসবাব, মেঝেতে পুরু কার্পেট, দেয়ালে ঝোলানো চিত্রকর্ম, আলোকিত কুলুঙ্গিতে রাখা ছোট ছোট ভাস্কর্য সব খুঁটিয়ে দেখল।
বেডরুমে, যেখানে সাঙ্গ হবে তার অনাঘ্রাতা যৌবন, আগ্রহ এবং আনন্দ নিয়ে নীল মখমলের বেড কাভারে ঢাকা বিছানা, নীল কার্পেট এবং পর্দায় চোখ বুলাল। সবকিছু কী সুন্দর পরিপাটি এবং গোছানো।
আমান্ডা আশা করছে মি. চার্লস হ্যাকফোর্থকে বিছানায় নিতে বিশেষ ঝামেলা হবে না; ও বইটই পড়ে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা নিয়েছে। তাছাড়া নিজেরও কিছু কৌশল খাটাবে আমান্ডা।
এখন কাজে লাগাতে হবে পরিকল্পনার কুশলী অংশ। ও শেরাটন স্টাইলের লেখার টেবিলে বসে ড্রয়ার থেকে হোটেলের অলংকৃত একখন্ড সাদা কাগজ বের করল। তারপর মুক্তোর মতো হস্তাক্ষরে লিখল :
প্রিয় মি. হ্যাকফোর্থ,
আমার পরিকল্পনায় সামান্য রদবদল ঘটেছে। আপনি যখন এখানে আসবেন তখন আমি থাকব না। আপনি অনুগ্রহ করে আমার ২১২২ নম্বর সুইটের চাবি নিয়ে সোজা সেখানে চলে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। আপনার জন্য ওখানে হুইস্কি এবং বরফের ব্যবস্থা করা আছে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরব।
ইতি
আমান্ডা উইন্টারটন
একটি সুদৃশ্য খামে চিঠিখানা ভরে ওটা বন্ধ করল আমান্ডা। বড় বড় অক্ষরে লিখল চার্লস হ্যাকফোর্থ। সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়ে শুধু সাইডবোর্ডের একটি ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখল আমান্ডা। মিটমিটে আলো হলেও দেখা যাচ্ছিল স্কচের বোতলটি কোথায় রাখা আছে।
সে এলিভেটরে চেপে লবিতে চলে এল এবং চিঠিখানা ও ২১২২ নম্বর সুইটের চাবি হেড পোর্টারের হাতে তুলে দিল। নটা বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকি। আমান্ডা বুফে বারে পা বাড়াল, খানিকটা সময় কাটাতে।
.
কোম্পানির খরচে পেট পুরে ডিনার সারল চার্লি পার্কার। উদার চিত্তে ড্রাই মার্টিনি এবং আধ বোতল ওয়াইন শেষ করল। ঈর্ষা নিয়ে ভাবল এই তো জীবন যে জীবন বেন এ এলাকায় এসে দারুণ উপভোগ করে। অথচ চার্লিকে কিনা কাজ করতে গিয়ে থাকতে হয় চাষাভুষোদের কোনো মফস্বলের এক তারা হোটেলে যেখানে শুধু স্থানীয় ড্রাগস্টোরেই খাবার মেলে। খেতে হয় গরুর মাংস অথবা আলুভাজা, এক ক্যান বিয়ার এবং আন্ট ম্যাবেলের বিখ্যাত আপেল পাই।
নটা প্রায় বাজে। লম্বা সফরে বড় ক্লান্ত চার্লি। টেল ট্রাক্টরস এর ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কাল সকাল দশটায় তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট। [কাঁটায় কাঁটায় দশটায় ওখানে তোমার উপস্থিত থাকতে হবে, খোকা। পই পই করে বলে দিয়েছে বুড়ো। কারণ উনি শনিবার সকালে আসছেন শুধুমাত্র এই কন্ট্রাকটা সই করতে!] এখন মখমলের চাদর বিছানো বিছানায় শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে যাবে চার্লি। সে উঠে দাঁড়াল, বিলে সই করল, বুঝতে পারছে আজ একটু বেশিই গিলে ফেলেছে। তারপর সাবধানে বেরিয়ে এল প্রকাণ্ড ডাইনিং রুম থেকে।
লবিতে অনেক ভিড়। পোর্টারের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল চারি। বিধ্বস্ত চেহারার দুই অ্যাটেনডেন্ট হোটেলের বোর্ডারদের চাবি বুঝিয়ে দিচ্ছে, আবার একই সঙ্গে লিখে রাখছে স্পেশাল ফোনকলগুলোর কথা এবং ইস্ট্রাকশনগুলো। ঘুম ঘুম চোখে লোকের ভিড়টাকে লক্ষ করছিল চার্লি। হঠাৎ পোর্টার তাকে জিজ্ঞেস করল :
জি, স্যার। কত নম্বর রুম?
কী? ওহ্, ২১২২ প্লিজ।
পোর্টার চাবির দঙ্গল থেকে চার্লির চাবিটি খুঁজে নিয়ে ওকে দিল। এক মুটকি মহিলা ওকে পাশ কাটাতে গিয়ে ধাক্কা খেল এবং ওরা পা মাড়িয়ে দিল। চলে যেতে যেতে অগ্নিদৃষ্টিতে দেখল সে চার্লিকে। চার্লি বিনীত ভঙ্গিতে ক্ষমা প্রার্থনা করে এলিভেটরের দিকে পা বাড়াল।
আকাশ ছোঁয়া প্রকাণ্ড ভবনটির উপরের কোনো এক তলায় পুরু কার্পেটে মোড়া করিডরের সামনে এসে ওকে উগরে দিল এলিভেটর।
