এখন রাত্রি প্রায় বারোটা। অতএব বিবাহ এবং নিমন্ত্রণের পাট শেষ করিয়া সকলেই শয্যাভিমুখী হইয়াছে। বরযাত্রীদের অন্য বাড়িতে শয়নের ব্যবস্থা করা হইয়াছিল–কেবলমাত্র চন্দ্রমোহনের তিন বন্ধু ও জনৈক আত্মীয় বিশ্বনাথবাবু বাসর-ঘরে চন্দ্রমোহনকে সঙ্গ দিতে থাকিয়া গিয়াছেন। কন্যাপক্ষের একমাত্র পুরুষ প্রতিনিধি আমি স্বয়ং, ইহা ছাড়া যে কয়েকজন বালিকা, কিশোরী ও তরুণী ঘরে উপস্থিত, তাহারা মৌমাছির ন্যায় মধুভাগুরূপ মাধবীকে ঘিরিয়া নানান জল্পনা-কল্পনায় ব্যস্ত। কেবল মধ্যে-মধ্যে তাহাদের হাস্যরোল ও কলগুঞ্জন কানে আসিতেছে।
চন্দ্রমোহন ও তাহার তিন বন্ধু আমার সহিত অনেক গল্প করিলেও বিশ্বনাথবাবুকে লক্ষ করিলাম একেবারে নিশ্চুপ। শুধু প্রয়োজনমতো আমাদের বক্তব্য সমর্থন করিতেছেন। ভদ্রলোকের বয়স প্রায় আমারই সমান। শান্ত দুইটি চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে এক অদ্ভুত প্রচ্ছন্ন দৃঢ়তা ও প্রতিজ্ঞার ছাপ। জুলপির চুলে বোধ করি তাঁহার অজ্ঞাতসারে পাক ধরিয়াছে। পরনের ধুতি পাঞ্জাবিকে বেষ্টন করিয়া সাদা রঙের লোভনীয় কাশ্মীরি শাল। অভিব্যক্তিতে অস্বস্তি ও বিষণ্ণতা আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে। চন্দ্রমোহন ও তাহার বন্ধুদের সহিত বিশ্বনাথবাবুকে আমি ঠিক মিলাইতে পারিতেছি না। যেন সিঁড়ি-ভাঙা কোনও সরল অঙ্কের উত্তর বারংবার ভুল হইয়া যাইতেছে।
আমার কৌতূহলী দৃষ্টি ও দ্বিধাগ্রস্ত মনোভাব সম্ভবত চন্দ্রমোহনের দৃষ্টি এড়ায় নাই। সুতরাং উপযাচক হইয়া সে আমাকে বিশ্বনাথবাবুর পরিচয় দিল। কহিল, সমীরদা, বিশ্বনাথদা আমার পিসতুতো ভাই–বলতে গেলে এক মহাপুরুষ। সারা ভারতের আনাচেকানাচে বহু ঘুরেছেন। ওঁর ঝুলিতে অনেক বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে। তা ছাড়া খুব ভালো হাত দেখতে জানেন…।
উত্তরে বিশ্বনাথবাবু মাথা নীচু করিয়া সলজ্জ হাসিলেন। মৃদু কণ্ঠে বলিলেন, তেমন কিছুই না, বই পড়ে শেখা বিদ্যে–
ভদ্রতাবশে আমার ডান হাতটি তাঁহার সম্মুখে বাড়াইয়া দিলাম। কিছুক্ষণ ইতস্তত করিয়া তিনি আলোয়ানের ফাঁক হইতে নিজের ডান হাতখানি সামান্য বাহির করিলেন। আমার হাত টানিয়া লইয়া তাহাতে মনোনিবেশ করিলেন। অতঃপর চশমাটি ঈষৎ বিন্যস্ত করিয়া বলিলেন, আপনার ভাগ্যরেখা খুব ভালো। সচরাচর দেখা যায় না।
অনুভব করিলাম, বিশ্বনাথবাবুর হাতটি অত্যন্ত কর্কশ। অনুমান হয়, তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী মানুষ। তাহার কথার জবাবে কহিলাম, সে তো নিশ্চয়ই, নইলে মালতীর মতো বউ পেয়েছি!
চন্দ্রমোহন ও তাহার বন্ধুরা হাসিয়া উঠিল। বিশ্বনাথবাবু আরও যোগ করিলেন, আপনার যশ-রেখাও ফ্যালনা নয়।
চন্দ্রমোহন কহিল, তাও তো হ্যাঁজাকের আলোয় ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। ইলেকট্রিকের আলোয় আরও জোরদার দেখাত।
চন্দ্রমোহনের এক বন্ধু, অবিনাশ, আক্রমণাত্মক সুরে কহিল, দাদা, আর ছাড়ছি না। নিন, শুরু করুন। একটা অভাবনীয় সংগীতের মূর্ঘনায় আমাদের মূর্ছা ঘটিয়ে বিশ্বনাথদাকে প্রমাণ দিন যে আপনার যশ-রেখা সত্যিই জোরদার।
ব্যস, এইটুকুই যথেষ্ট। অতএব সকলের পীড়াপীড়িতে গান ধরিলাম ।
আনন্দেরই সাগর হতে এসেছে আজ বান…।
বান যখন মধ্যপথে, তাহাকে বাধা দিল মালতী। লক্ষই করি নাই, কখন সে দরজার পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এক্ষণে তাহার দশম বর্ষীয়া একমাত্র কন্যাসহ ঘুমাইয়া পড়িবার কথা। অতএব চন্দ্রমোহন যখন আমার মনোযোগ আকর্ষণ করিল, তখন স্বভাবতই অবাক হইলাম। গান থামিল। সকলের দৃষ্টিতেই নীরব প্রশ্ন ফুটিয়া উঠিল। মালতী সমস্ত কিছু উপেক্ষা করিয়া মৃদু কণ্ঠে আমাকে ডাকিল, একটু শুনবে?
আদেশ নীরবে পালন করিলাম। আমি নিকটে আসিলে সে ফিশফিশ করিয়া কহিল, আমার সীতাহারটা খুঁজে পাচ্ছি না!
লক্ষ করিলাম, তাহার মুখমণ্ডল বিবর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। স্বাভাবিক। কারণ সীতাহারটি একাধারে আমাদের বিবাহের যৌতুক, মালতীর মাতৃবংশের ঐতিহ্যবাহী এবং সাড়ে নয় ভরি সোনায় তৈয়ারি। সর্বোপরি, উহা যে পুনরায় গড়াইয়া দেওয়া আমার ন্যায় চাকুরিজীবীর পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব, ইহা মালতী ও আমি উভয়েই সবিশেষ জানি।
প্রশ্ন করিয়া জানিলাম, কন্যাকে ঘুম পাড়াইয়া সে যখন নিত্যকার অভ্যাসমতো শয়নের আগে কানের দুলজোড়া খুলিয়া আলমারিতে রাখিতে যায়, তখনই সবিস্ময়ে লক্ষ করে যে, সীতাহারটি যেন কোন জাদুমন্ত্রবলে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে। বিস্ময়ের কারণ, আলমারি সর্বদাই চাবিবন্ধ থাকে, এবং খুলিবার সময় মালতীকেও চাবি ব্যবহার করিতে হইয়াছে। বন্ধ আলমারি হইতে হার চুরি! এ ঘটনা যেমন অভিনব, তেমনই আশঙ্কাজনক। আলমারিতে টাকাপয়সাও ছিল, কিন্তু তাহাতে হাত পড়ে নাই।
আমাদের দুজনের নিম্নই আলোচনা যখন অপর সকলের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইবার মতো যথেষ্ট হইয়াছে, এবং আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার সর্বশেষ সীমায় পৌঁছিয়াছি, তখন চন্দ্রমোহন প্রশ্ন করিল, কী হয়েছে, দাদা?
আমি দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া পড়িলাম। এই ঘটনা ব্যক্ত করিয়া বর ও বরযাত্রীদের ব্যতিব্যস্ত করিয়া লাভ কী? কিন্তু সীতাহার-শোকে বিহ্বলা মালতী নিজেকে সংবরণ করিতে পারিল না। প্রায় কঁদো কঁদো হইয়া কহিল, দ্যাখো না ভাই, আলমারি থেকে আমার বিয়েতে পাওয়া সাড়ে নভরির সীতাহারটা চুরি গেছে। অথচ আলমারিটা তালাবন্ধ ছিল। তা ছাড়া, ঘণ্টাখানেক আগেও হারটা আমি দেখেছি।
