ছোট দরজায় দাঁড়িয়ে আমার আর ডক্টর সমাদ্দারের চোখাচোখি হল। কারণ, দরজা পেরিয়েই একটা ছোট ঘর। সেই ঘরের ডানদিকে রয়েছে আর-একটা দরজা, আর দরজার পরে দেওয়ালের গায়ে লাগানো রয়েছে একটা ধবধবে সাদা বেসিন। সেটা জলে টইটম্বুর। কল থেকে ফোঁটা-ফোঁটা জল টপটপ করে বেসিনে পড়ছে। বেসিনের বাঁ-পাশে ছোট তাকে একটা সাবান রয়েছে: তার রং নীল—সাদা নয়।
এবার আমি সম্মোহিতের মতো ডানদিকের খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকালাম না। কিন্তু শুনতে পাচ্ছিলাম ডক্টর সমাদ্দারের ভারী বুটের শব্দ।
সামনের করিডরে একটা অল্প পাওয়ারের আলো জ্বলছে। সেটার শেষ প্রান্তে একটা খাটে দরজা। ধরজাটা ভেজানো ছিল, আমি সেটা খুলে বাইরের অন্ধকার খোলা মাঠে পা রাখলাম।
অন্ধকারের মধ্যেই দূরে কয়েকটা আলোর বিন্দু চোখে পড়ছে। আমি অক্লান্ত পায়ে হেঁটে চললাম। গন্তব্যস্থল কোথায় জানি না।
হঠাৎই পায়ের কাছে একটা আলোর বৃত্ত দেখে চমকে উঠলাম। পেছন ফিরে দেখি ডক্টর সমাদ্দার পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে জ্বেলেছেন। এই ঘন অন্ধকারে তাঁর সঙ্গে হেঁটে চলা দুশমনকে স্পষ্টভাবে নজরে পড়ছে না।
আমাকে ফিরে তাকাতে দেখে বলে উঠলেন অম্বিকা সমাদ্দার, ‘মিস্টার রায়, একমিনিট। আপনার কি মনে হচ্ছে যে, আপনার স্বপ্নের সঙ্গে এইসব মিলে যাচ্ছে?’
আমি কোনও জবাব দিতে পারলাম না। শুধু মাথা ঝাঁকালাম।
ডক্টর সমাদ্দার থমকে দাঁড়ালেন। আমিও ঘুরে দাঁড়ালাম তাঁর মুখোমুখি।
‘আমার মনে হয়, আপনার অন্য স্বপ্নগুলের মতো এটাও আপনার কল্পনা। শুধু এই হোমের পটভূমি আপনার কল্পনাকে স্বপ্নে গড়ে তুলতে হেলপ করেছে, তার বেশি কিছু নয়। সুতরাং, আমার মনে হয়, আর সময় নষ্ট না করে আমাদের ফিরে যাওয়াই ভালো। বাড়ি ফিরে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করুন, ঘুরে বেড়ান, দেখবেন দু-দিনেই ওই নাইটমেয়ার কোথায় মিলিয়ে গেছে। সো, লেটস গো ব্যাক—।’
ডক্টর সমাদ্দার ঘুরে দাঁড়াতেই আমি চাপা গলায় বলে উঠলাম, ‘নো ডক্টর, নেভার। আমি এর শেষ দেখতে চাই।’
অন্ধকারে সমাদ্দারের অভিব্যক্তি আমার নজরে পড়ল না। শুধু তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘শেষ মানে? ও. কে.—অ্যাজ ইউ উইশ। কাম অন, দুশমন—।’
আমরা আবার চলতে শুরু করলাম।
আচ্ছন্নের মতো চলতে-চলতে হঠাৎই আবিষ্কার করলাম, একটা হালকা জঙ্গলে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ভিজে হাওয়ার ঝাপটা আমার চোখে-মুখে ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। চারপাশে চেয়ে দেখি কয়েকটা বড়-বড় গাছ: কী গাছ জানি না। তারই মাঝে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। পায়ের কাছে টর্চের আলোর বৃত্তে নজরে পড়ল ঘাসে ছাওয়া মাটি।
আমাকে দ্বিধাগ্রস্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অম্বিকা সমাদ্দার কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু দুশমনের চাপা হিংস্র গর্জন তাঁকে থামিয়ে দিল। দুশমন আমাদের ছাড়িয়ে চট করে কিছুটা এগিয়ে গেল। ছটফটে পায়ে ফাঁকা জায়গাটাতে পায়চারি করতে লাগল।
আমার বুকের ভেতরে কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে। একটা অদ্ভুত আশঙ্কা যেন পাকে-পাকে জড়িয়ে ফেলতে চাইছে।
দুশমনের গর্জন একটু জোরালো হল। অন্ধকারে ওর আবছায়া শরীরটা ঘাস-ছাওয়া জমিতে নড়াচড়া করছে।
কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম নড়াচড়া নয়, দুশমন প্রাণপণে মাটি আঁচড়াচ্ছে।
ডক্টর সমাদ্দারের টর্চ-ধরা হাত কেঁপে উঠল। তারপর গিয়ে স্থির হল দুশমনের কালো বিশাল শরীরের ওপরে। ওর তীক্ষ্ন থাবার আঁচড়ে ওপরের ঘাস ছিঁড়ে নীচের মাটি ইতিমধ্যেই বেরিয়ে এসেছে।
মাত্র কয়েকমিনিট। তারপরই যে-দৃশ্য দুশমন দেখাল, তাতে আমি অবাক না হলেও ডক্টর সমাদ্দার চমকে উঠলেন। তাঁর মুখ থেকে একটা চিৎকার বেরিয়ে এল। গর্জন করে উঠল দুশমন। আমি নিশ্চুপ, নিথর। ডক্টর সমাদ্দারের টর্চের আলো খাবলানো মাটির ওপরে থরথর করে কাঁপছে। তবুও দেখতে আমাদের কোনও অসুবিধে হল না। স্পষ্ট দেখলাম, সামান্য খোঁড়া মাটি থেকে বেরিয়ে রয়েছে পচে যাওয়া একটা হাত। সে-হাতের কোনও-কোনও জায়গায় সাদা হাড়ের আভাস নজরে পড়ছে। আর সেই বিধ্বস্ত হাতের মুঠোয় ধরা রয়েছে একটা ময়লা সাদা সাবান।
অমানুষিক হাত (নভেলেট)
সকলে মিলিয়া বাসর জাগিতেছিলাম।
এই বাসর-জাগরণ অনুষ্ঠানে আমার মতো পঞ্চাশোর্ধ্ব প্রৌঢ়ের সম্ভবত স্থান হইবার কথা নহে, কিন্তু বরপক্ষের একান্ত অনুরোধ ও দলবদ্ধ আড্ডার প্রতি আমার অনমনীয় আকর্ষণ এড়াইতে পারি নাই। বরপক্ষের একান্ত অনুরোধের একটি বিশেষ কারণ ছিল। কীরূপে যেন তাহারা জানিতে পারিয়াছিল আমার কণ্ঠসঙ্গীত তাবৎ কোকিল জাতিকে নিমেষে ব্রীড়াময় করিয়া তুলতে পারে। যদিও আমার স্ত্রী মালতী ওই মতের ঘোরতর বিরোধী, তবুও বাহিরের অভ্যাগতদের সম্মুখে নিজের স্বামীর প্রশংসা শুনিয়া সর্বসমক্ষে তাহার মত আর জাহির করে নাই। পরিবর্তে আমার কানের নিকটে মুখ লইয়া আসিয়া বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে এই কথা কয়টি উচ্চারণ করিয়া দ্রুতগতিতে নিষ্ক্রান্ত হইয়াছে।
বিবাহ আমার কনিষ্ঠা শ্যালিকা মাধবীর। অন্যান্য তিন শ্যালিকা অপ্রত্যাশিত তৎপরতায় নিজ-নিজ স্বামীগৃহে রিজার্ভেশন পাইলেও মাধবীকে তিনটি বৎসর ওয়েটিং লিস্টে নাম লিখাইয়া রাখিতে হইয়াছিল। অবশেষে প্রজাপতির নির্বন্ধে ও মাধবীর পিতা-মাতার অনলস প্রচেষ্টায় কলিকাতা হইতে এই যমুনাপুর নামক অজ পাড়াগাঁয়ে ইঞ্জিনিয়ার পাত্র শ্রীমান চন্দ্রমোহন বন্ধুবান্ধব সমভিব্যাহারে এই ঘোরতর শীতকালে হ্যাজাক লন্ডনের আলোয় বিবাহকার্য সুসম্পন্ন করিতে আসিয়াছে।
