‘কীসব কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কথা বলছেন। স্টপ বিটিং অ্যারাউন্ড দ্য বুশ।’ নবনীতা।
হাত তুলে সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলল ইন্দ্রজিৎ। তারপর: ‘অনিমেষ সরকার যতদিন এ-বাড়িতে আছেন ততদিন জিতেন্দ্রনাথের এ-বাড়িতে আসা সম্ভব নয়। ওঁরা দুজন হরিহর-আত্মা হলে ওঁদের দুজনকে একসঙ্গে পাওয়া ইমপসিবল।’
‘কেন? অনিমেষ প্রশ্ন করলেন।
‘কারণ, আপনারা দুজনে একই লোক। হরিহর-আত্মা নন—একই আত্মা।’
পলকে সবাই চুপ করে গেলেন। নিস্তব্ধতা পুরু মোলায়েম চাদরের মতো বিছিয়ে গেল সারাটা ঘরে।
অনেক—অনেকক্ষণ পর জিতেন্দ্রনাথের গলায় কথা বললেন অনিমেষ, ‘থ্যাংকু ইউ, মিস্টার চৌধুরী।’ এবং পরচুলা, চাপদাড়ি ও চশমা খুলে ফেললেন। নাকের ডগা থেকে টেনে খুলে নিলেন একদলা প্লাস্টিসিন।
‘বাবা!’ মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতা।
পরান ছুটে গিয়ে জিতেন্দ্রনাথের পা জড়িয়ে ধরল। কান্না-ভাঙা গলায় ডুকরে উঠল, ‘বড়বাবু! আপনি বড়বাবু!’
জিতেন্দ্রনাথ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে দাঁড় করিয়ে দিলেন, বললেন, ‘হ্যাঁ রে, আমি। আর কোনও চিন্তা নেই।’
এবার ইন্দ্রজিতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি খুব প্রমিসিং ডিটেকটিভ, মিস্টার চৌধুরী। এখন বলুন তো, আমাকে আপনি কী করে সন্দেহ করলেন?’
ইন্দ্রজিৎ মাথার ঝাঁকড়া চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিল। তারপর: ‘প্রথম সন্দেহ হল, আপনি জিতেন্দ্রনাথের লেখা বহু চিঠির কথা বলেছেন, একটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছেনও—কিন্তু আপনার লেখা কোনও চিঠির কথা বলেননি। বাড়িতে আপনার লেখা কোনও চিঠিও পায়নি কেউ। সবসময়েই অনিমেষ সরকার ফোন করে কথা বলতেন।
‘দ্বিতীয়: আপনার লাঠিটা নতুন। আর আপনার সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটাটা মাঝে-মাঝে ঠিকঠাক স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছিল।
‘তৃতীয়: আমি যখন সন্দেহ থেকেই আপনাকে অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার লিখে দিতে বলছিলাম, আপনি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না।
‘চার নম্বর: আপনার রুমাল। আমি আর আপনি যখন সেদিন ও ঘরে বসে—’ ইশারা করে ঘরটার দিকে দেখাল ইন্দ্রজিৎ: ‘—কথা বলছিলাম তখন আপনি রুমাল বের করে চোখ মোছার ভান করছিলেন। সেইসময়ে পরান চায়ের কাপ-প্লেট নিতে ঘরে ঢুকেছিল। আপনার হাতের রুমালটা দেখে ও চমকে উঠেছিল। আমি পরে ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ওটা জিতেন্দ্রনাথের রুমাল। সে-রুমাল আপনার পকেটে গেল কেমন করে!’
‘অবশ্য তখন আমি আপনাকে কিডন্যাপিং-এর নাটের গুরু বলে সন্দেহ করেছিলাম। পুরোপুরি জিতেন্দ্রনাথ বলে ভাবিনি।’
‘সেটা ভাবলেন কখন?’
‘ওই রক্তের রিপোর্টটা পাওয়ার পর। তখন বুঝলাম, পয়সা থাকলে একটা নকল কিডন্যাপিং-এর ব্যবস্থা করা কোনও কঠিন ব্যাপার নয়। তা ছাড়া টাকা আদায়ের ব্যাপারে কিডন্যাপারদের যেন কোনও মাথাব্যথাই ছিল না। এ ছাড়া আর-একটা ব্যাপার সবচেয়ে উদ্ভট ছিল…।
‘কোনটা?’
‘আপনার ওই ”মালিক” বন্ধু অনিমেষ সরকারকে হঠাৎ করে ”জন্ম” দেওয়া। আগে তো কখনও আপনি অনিমেষ সরকারের কথা ছেলেমেয়েদের বলেননি! তা হলে হঠাৎ করে এই ক্ষমতাবান ”বন্ধু” এল কোত্থেকে!
‘আসলে, মিস্টার সেন—আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কম-বেশি দুটো করে ব্যক্তিত্ব আছে। একটা নরম, আর-একটা কঠিন। একজনের কাজ ভালোবাসা, অন্যজনের কাজ শাসন করা। যদিও ব্যাপারটা অ্যাবসলিউটলি আপনাদের ফ্যামিলির ব্যাপার—তবুও বলছি, আপনার একটা পারসোনালিটি বহুদিন ধরে ঘুমিয়ে ছিল। অনিমেষ সরকার। আপনি জিতেন্দ্রনাথ আর অনিমেষ—দুজনকেই সজাগ রাখুন। তবে দুজনের মধ্যে ব্যালান্সটা আপনাকেই মেইনটেইন করতে হবে। বেশি ভালোবাসাও যেমন ঠিক নয়, বেশি শাসনও তাই। যদি আপনি এবার থেকে এটা মেইনটেইন করতে পারেন তা হলে সবার ভালো হবে। আর সীমন্তিনীদেবীও খুশি হবেন।’
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ইন্দ্রজিৎ। সকলের দিকে একবার দেখে নিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘বয়েসে ছোট হয়েও অনেক অপ্রিয় কথা বললাম—হোপ ইউ উডন্ট মাইন্ড। আমাদের কাজ শেষ—আমরা এবার যাই।’
‘একমিনিট, মিস্টার চৌধুরী।’ উঠে দাঁড়ালেন জিতেন্দ্রনাথ। তারপর পরানকে বললেন, ‘পরান, আমার চেকবইটা নিয়ে আয় তো।’
পরান তাড়াতাড়ি চলে গেল জিতেন্দ্রনাথের ঘরের দিকে।
জিতেন্দ্রনাথ ইন্দ্রজিতের কাছে এসে আন্তরিক গলায় বললেন, ‘আপনার কথায় আমি কিছুই মনে করিনি। বরং আপনার কথাগুলো মনে রাখার চেষ্টা করব। আসলে মেন্টাল টরচারে-টরচারে আমি দিশেহারা হয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম। তারপর, ঝোঁকের মাথায় এসব করে ফেলেছি…।’
চেকবই এসে গিয়েছিল। জিতেন্দ্রনাথ পেন নিয়ে খসখস করে একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক লিখে দিলেন। নামের জায়গায় এসে থমকালেন তিনি, ‘কী নামে হবে চেকটা?’
‘প্রাইভেট আই ডট কম।’
‘কত টাকার চেক দিলে, বাবা?’ নবনীতা জিগ্যেস করল।
জিতেন্দ্রনাথ ওর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘দ্যাট ইজ নান অফ ইওর ব্লাডি বিজনেস, লেডি।’
ইন্দ্রজিৎ বুঝল জিতেন্দ্রনাথ তাঁর নতুন ভূমিকা শুরু করে দিয়েছেন।
ওরা তিনজনে বেরিয়ে এল ‘সেন কটেজ’ থেকে।
মারুতি ভ্যানে ওঠার পর দশরথ বলল, ‘স্যার, কাল সকালে এই চেকটা শার্লক হোমসের ছবিতে ঠেকিয়ে তারপর ব্যাঙ্কে জমা দেবেন।’
ইন্দ্রজিৎ হাসল। গাড়ি স্টার্ট দিল।
জিনি বলল, ‘আমাদের মাইনে নিয়ে আর তা হলে কোনও চিন্তা রইল না।’
