উল্টোডাঙ্গা-ভি. আই. পি.-র মোড়ে গাড়ি আসতেই ইন্দ্রজিৎ ঘড়ি দেখল। রাত প্রায় নটা। খিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে। জিনি আর দশরথদারও বোধহয় একই অবস্থা। তাই ও বলল, ‘এসো, এখানে কোনও একটা রেস্তরাঁয় আমরা ডিনার সেরে নিই। জিনি, তুমি বাড়িতে একটা ফোন করে দাও। আমি তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেব।’
রাস্তার পাশ ঘেঁষে গাড়ি পার্ক করল ইন্দ্রজিৎ। ওরা গাড়ি থেকে নামল।
জিনি বলল, ‘আমি চট করে একটা ফোন করে আসছি।’
ও চলে যেতেই নিজের পেটে হাত বোলাল ইন্দ্রজিৎ: ‘দশরথদা, পেটে একেবারে ছুঁচোয় ডন মারছে। তোমারও নিশ্চয়ই একই অবস্থা?’
দশরথ একগাল হেসে বলল, ‘না, স্যার। পুলিশে চাকরি করার সময় ইউনিয়ন করতাম। তখন হাঙ্গার স্ট্রাইক করে-করে খিদে সহ্য করার অভ্যেস হয়ে গেছে।’
ইন্দ্রজিৎ হো-হো করে হেসে ফেলল।
‘প্রথমেই সবাইকে জানাই—বিছানার চাদরে যে-রক্তের দাগ পাওয়া গেছে, সেটা মানুষের রক্ত নয়…মুরগির রক্ত।’
ইন্দ্রজিতের কথা শেষ হতে-না-হতেই দশরথ চাপা গলায় বলল, ‘মোরগেরও হতে পারে।’
সে-কথা ইন্দ্রজিতের কানে গেল বলে মনে হল না। ও তখন কৌতূহল নিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখের দিকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছে।
ওঁরা সকলেরই চমকে উঠলেন।
অনিমেষ সরকার, মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র, নবনীতা—আর পরান।
প্রথম চারজন সোফায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে ছিলেন। আর পরান একপাশে সংকুচিতভাবে দাঁড়িয়ে।
‘কী বলছেন, মিস্টার চৌধুরী!’ অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলেন অনিমেষ সরকার, ‘মানুষের রক্ত নয়! মুরগির রক্ত—!’
‘মোরগেরও হতে পারে।’ আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল দশরথ।
‘হ্যাঁ—মুরগির রক্ত।’
দশরথ আবার বিড়বিড় করল। কী বলল ঠিক বোঝা গেল না, তবে অনুমান করা গেল।
‘তা হলে বাবার কোনও বিপদ হয়নি!’ এবারে সুরেন্দ্র কথা বললেন।
ইন্দ্রজিৎ সুরেন্দ্রর কথাটা যেন শুনতে পেল না। সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে চোখ বুজে বলল, ‘এই ইনফরমেশানটা ল্যাব থেকে পাওয়ার পরই আমি অন্য অ্যাঙ্গল থেকে ব্যাপারটা অ্যানালিসিস করতে শুরু করলাম…।’
হঠাৎই চোখ খুলে হাসল ইন্দ্রজিৎ: ‘আর তখনই সব কেমন ঠিকঠাক খাপে-খাপে মিলে গেল। এবং কিডন্যাপিং রহস্যের উত্তরটা ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে।’
‘সেন কটেজ’-এর ড্রইং কাম ডাইনিং স্পেসে বসে কথা হচ্ছিল। ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাতটার ঘরে পৌঁছে গেছে। বিচিত্র ঢঙের সুন্দর-সুন্দর সব বাতি ঘরটাকে প্রায় দেওয়ালির রাত করে তুলেছে। কিন্তু এখন আবহাওয়া খানিকটা থমথমে। সবাই কেমন যেন গম্ভীর। এমনকী নবনীতাও। আজ, এই মুহূর্তে, যেন গৃহকর্তার অভাবটা টের পাওয়া যাচ্ছে।
রহস্যটা খতিয়ে দেখতে মাত্র তিনদিন সময় নিয়েছে ইন্দ্রজিৎ। জিনির টাইপ করে দেওয়া তথ্য, নিজের স্মৃতি আর বুদ্ধিকে বারবার ব্যবহার করে তারপর একটা অনুমানে পৌঁছেছে। তারপর অনিমেষ সরকারের লিখে দেওয়া ঠিকানা আর ফোন নম্বর ওকে একটা প্রায়-সিদ্ধান্তের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
সুতরাং, পুরোপুরি তৈরি হওয়ার পর ও মহেন্দ্র সেনকে ফোন করেছ। জানিয়েছে, আজ সন্ধ্যায় চায়ের আসরে ও সব রহস্যের জট খুলবে। চেষ্টা করবে, কিডন্যাপড হয়ে-যাওয়া জিতেন্দ্রনাথকে ফিরিয়ে আনতে।
‘…কিডন্যাপাররা টাকা চাইতে দেরি করায় আমার প্রথম খটকা লেগেছিল। তা হলে কিডন্যাপিংটা যে বা যারা করিয়েছে তারা খুবই বড়লোক? তাদের টাকার দরকার নেই?’ একে-একে মহেন্দ্র, সুরেন্দ্র এবং নবনীতাকে দেখে নিল ইন্দ্রজিৎ: ‘সাধারণত কিডন্যাপিং-এর কেসে যেটা হয়, পণবন্দিদের লুকিয়ে রাখাটা ভীষণ রিস্কি বলে কিডন্যাপাররা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে ব্যাপারটায় তাড়াহুড়োর বদলে কেমন যেন ডিলি-ড্যালি গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছিল।
‘সেদিন আপনাদের সবার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হল, কিডন্যাপিং-এর মতো দুঃসাহসিক কাজ করার সাহস আপনাদের কারও নেই। আশা করি আমার এই মন্তব্যকে আপনারা প্রশংসা হিসেবে নেবেন। যাই হোক, বাকি আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি অনিমেষবাবুকে কয়েকটা কথা বলতে চাই—আর সেইসঙ্গে আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই, জিতেন্দ্রনাথকে কে কিডন্যাপ করেছে।’
সবাই উসখুস করতে লাগলেন। এ-ওর দিকে অস্বস্তির চোখে দেখতে লাগলেন।
অনিমেষ বললেন, ‘বলুন, কী বলতে চান—।’
হাসল ইন্দ্রজিৎ—অপরাধীকে ধরে ফেলার হাসি: ‘দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি—জিতেন্দ্রনাথকে আপনিই কিডন্যাপ করেছেন।’
সবাই অবাক চোখে তাকালেন অনিমেষ সরকারের দিকে। ঘরে আলোচনা আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। দশরথ মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করে চোখ বুজে মাথা নাড়তে লাগল।
‘একমিনিট!’ সবাইকে কথা থামাতে ইশারা করল ইন্দ্রজিৎ: ‘আর-একটা কথা অনিমেষবাবুকে আমার বলার আছে। জিতেন্দ্রনাথ সেনের সঙ্গে আপনার সারা জীবনেও আর দেখা হবে না। আপনি যদি একশো বছরও এ-বাড়িতে অপেক্ষা করেন, তা হলেও তাঁর দেখা পারেন না।’
‘কেন, জিতেন কি আর বেঁচে নেই?’ অনিমেষ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন।
‘সে তো আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন—।’ চোখ মটকে বাঁকা হাসল ইন্দ্রজিৎ।
‘বাবা…বাবাকে কি মেরে ফেলা হয়েছে?’ মিহি গলায় প্রশ্ন করলেন সুরেন্দ্র।
‘বাবা কি এ-বাড়িতে আর কখনও আসবেন না?’ মহেন্দ্র।
