এই তো কাছেই। ননী ঘোষ লেন। শোভাবাজার ঘাট থেকে ডানদিকে হেঁটে সাত কি আট মিনিট।
চলুন, আপনার সঙ্গে হাঁটতে আমার ভালোই লাগবে।
সর্বনাশ করেছে! কী হবে এবার?
নিমতলা ঘাটে আপনি যাবেন না? মালিক জিগ্যেস করল।
নাঃ, আজ আর যাব না। সেখানে যাওয়ার চেয়ে আপনার কম্প্যানি অনেক বেটার, অনেক অ্যাট্রাকটিভ।
ব্যস! আমরা উলটো দিকে ঘুরলাম। হাঁটতে শুরু করলাম শোভাবাজার ঘাটের দিকে।
আমি তো চিন্তায়-চিন্তায় পাগল হয়ে গেলাম। কী করি এখন? কী করে এই পিশাচীর হাত থেকে বাঁচাই আমার হ্যাংলা মালিককে?
আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, থামো, মালিক থামো! এই রক্তপিশাচকে তোমার বাড়িতে নিয়ে যেয়ো না–তোমার সর্বনাশ হবে।
আপনার কুকুরটা খেপে গেছে। বড্ড ঘেউঘেউ করছে।
আমার চেন ধরে টান মারল মালিক। বলল, পম, স্টপ বার্কিং। তারপর মেয়েটার দিকে। ফিরে বলল, আপনার কোনও চিন্তা নেই। বাড়িতে ঢুকে পমকে সিঁড়ির নীচের ঘরে বন্ধ করে রাখব। তারপর শুধু আপনি, আমি, আর কফি। কথা বলতে বলতে মালিক চোখ দিয়ে মেয়েটাকে চেটে নিল।
নাঃ, আর চুপ করে থাকা যায় না। আমি এক হ্যাঁচকা টানে মালিকের হাত থেকে চেন ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর বিদ্যুঝলকের মতো মালিককে পাশ কাটিয়ে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লাম মেয়েটার ওপরে।
কিন্তু কী আশ্চর্য! হাওয়া, শুধু হাওয়া!
শাড়িটায় নাক ঠেকতেই বিশ্রী কটু গন্ধ পেলাম। বাতাসে দুলে উঠল শাড়িটা। আর কী ঠান্ডা, কী ঠান্ডা! যেন এভারেস্টের চুড়োয় নাক ঘষছি।
আমাদের অবাক করে শাড়িটায় আমার বডি জড়িয়ে গেল। আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায়। আর মেয়েটির পোশাক–শাড়ি, ব্লাউজ সবখসে পড়ল মাটিতে। তবে মেয়েটা কোথাও নেই– পুরোপুরি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
গঙ্গার দিক থেকে বাতাস ছুটে এল। কালো জল খলখল করে হেসে উঠল। আকাশে উড়ে যাওয়া একটা ধূসর পাচা কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল হঠাৎই।
মালিক থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছিল। ম্যাগাজিনটা হাত থেকে খসে পড়ে গিয়েছিল। এবার মৃগী রুগির মতো হাত-পা ঠকঠক করে বসে পড়ল রাস্তায়। কঁদো-কঁদো স্বরে ডেকে উঠল, পম! পম! তুই আমাকে বাঁচালি!
আমি মালিকের কাছে গিয়ে ওর গায়ে গা ঘষলাম, বললাম, তোমাকে তো কখন থেকে সাবধান করছি! তুমি তো আমার কথা কানেই তুলছ না!
আমার ঘেউ-ঘেউ শুনে মালিক আমার গায়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগল। বারবার আমার নাম ধরে ডাকতে লাগল।
হঠাৎই চোখ ফিরিয়ে দেখি মেয়েটার পড়ে থাকা জামাকাপড়গুলোও আর নেই। সেগুলোও কোন জাদুমন্ত্রে কখন যেন উধাও হয়ে গেছে!
মালিক কাঁপতে কাঁপতে কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আমার চেন ধরে টান মারল? চল, চল, বাড়ি চল–জলদি।
ভয় পাওয়া খরগোশের মতো আমরা দুজনে তরতর করে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। রাস্তা তখন আরও নির্জন হয়ে গেছে। হালকা কুয়াশা কালো রাতকে ধীরে-ধীরে ঘোলাটে করে দিচ্ছে।
আমি দুঃখে মাথা নাড়ছিলাম। যদি আমার মালিকের আগেই একটা হিল্লে হয়ে যেত তা হলে আজকের প্রেতিনীর ফাঁদে মোটেই পা দিতে হত না। ব্যাপারটা আর-একটু এগোলে কী সর্বনাশ হত কে জানে!
তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আমরা শোভাবাজার ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে সবে ডানদিকে বাঁক নিয়েছি, এমন সময়…এমন সময় একটি মেয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
লম্বা, স্মার্ট চেহারা, চোখে হালফ্যাশানের চশমা, কাঁধে ঝোলানো সাইডব্যাগ, হাতের মুঠোয় একটা রুমাল।
রাস্তার আলোয় মেয়েটির শাড়ির রং গাঢ় বলেই মনে হল। আর গায়ের শালটা সাদাটে।
ঠান্ডায় গায়ের শালটাকে প্রায় আঁকড়ে ধরেছে মেয়েটি। শীতে কষ্ট হলেও মুখে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে মালিককে জিগ্যেস করল, নন্দরাম সেন স্ট্রিট কীভাবে যাব একটু বলে দেবেন? স্ট্যান্ডে একটাও অটো পেলাম না। রাস্তাটা অন্ধকার-অন্ধকার…কী বলব..মানে একটু ভয়-ভয় করছে..।
আমি শুধু পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিলাম। তার সঙ্গে আর কোনও ভয়ের গন্ধ ছিল না। তাই মালিককে বললাম, লেডি ইন ডিসট্রেস। নাও, হেল্প করো। আমাদের সঙ্গে ওকে ডেকে নাও। আমরাও তো অনেকটা সেদিকেই যাব।
আমি কথা বলায়–মানে, ঘেউঘেউ করায়–মেয়েটা আমাকে খেয়াল করল, সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, কী সুন্দর পমিরেনিয়ান! দারুণ দেখতে।
নাও, নাও, শুরু করো তোমার কুকুর রচনা। কুইক।
মালিক পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ চকের মতো সাদা। দেখলাম, ওর ঠোঁট নড়ছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোচ্ছে না। আর হাতের আঙুলগুলো অল্প-অল্প কাঁপছে।
বুঝলাম, মালিক ভয় পেয়েছে।
আমি চেঁচিয়ে মালিককে বললাম, তুমি ভুল করছ, মালিক। তুমি যা ভাবছ ও তা নয়। তোমার লাইফটাকে পালটে নেওয়ার এটা একটা সুযোগ।
আপনার কুকুরটা তো ভীষণ চেঁচাচ্ছে! একটু মজার সুরেই বলল মেয়েটা, কী নাম ওর?
মালিক সেকথার জবাব না দিয়ে আমার দিকে আঙুলের ইশারা করে বলল, জাম্প, পম, জাম্প!
মালিকের এই কথায় আমি থতমত খেয়ে গেলাম। লাফ দেব! কিন্তু কেন?
মালিককে সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করে বললাম, লাফ দেব কেন, মালিক? এই মেয়েটি তোমারই মতো রক্ত-মাংসের তৈরি–অন্য কিছু নয়। তুমি যা ভাবছ তা নয়।
মালিক শুনলে তো আমার কথা!
আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল মালিক। আঙুলের ইশারা করে মেয়েটিকে দেখিয়ে আমাকে শক্ত গলায় বলল, জাম্প আই সে! লাফ দে, হারামজাদা শিগগির!
