কিন্তু কে শোনে কার কথা! মালিক গদগদ হয়ে মেয়েটিকে বলল, নিমতলা ঘাট? ওই তো সামনে…পাঁচমিনিট হাঁটলেই…। দেখেছেন, পম আপনাকে হ্যালো বলছে। ও আপনাকে পছন্দ করে ফেলেছে।
হুঁ! নিজে পছন্দ করে আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছে!
না, না! প্রায় আঁতকে উঠে সরে গেল মেয়েটি? ওকে চেন দিয়ে বেঁধে রাখুন। কুকুর আমি খুব ভয় পাই।
এই তো, চেন লাগিয়ে দিচ্ছি– চাকরের মতো মেয়েটির কথা শুনল মালিক।
আমি মেয়েটির চোখে তাকালাম। ওর চোখের তারায় নীল আলো ধকধক করে জ্বলছে। ও বুঝতে পেরেছে, আমি ওকে চিনে ফেলেছি।
মালিক মেয়েটিকে বলল, এই ঠান্ডার মধ্যে এই নির্জন রাস্তায় আপনি একা-একা…মানে…।
হাসল মেয়েটি। হাসির সঙ্গে-সঙ্গে ওর ফঁপা শরীর থেকে ঠান্ডা জমাট বাতাসের হলকা বেরিয়ে এল। বলল, আমি তো একাই–দোকা আর কোথায় পাব!
জানেন, আমিও ভীষণ একা। মালিক কাতর গলায় বলল, কী সাংঘাতিক একা আপনি ভাবতে পারবেন না।
মালিক, ওর কথাটা ভালো করে বোঝো। ওরা সবসময় একা-একা ঘোরে মরণফঁদ পাতে–তোমাদের মতো বোকা হাঁদা ল্যাবাকান্তদের জন্যে। মালিক, প্লিজ, বাড়ি চলো।
কিন্তু মালিক আমার কথা শুনবে কি! হাঁ করে মেয়েটাকে গিলছে।
বাব্বা! আপনার কুকুরটা কী ঘেউঘেউ করছে! আপনি ওকে আড়াল করে রাখুন।
ব্যস, অমনি আমাদের মাঝে পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে গেল। তারপর মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে-বলতে নিমতলা ঘাটের দিকে এগোল।
মালিকের দুপাশে আমরা দুজন। তবুও চলার সময় এগিয়ে-পিছিয়ে আমি মেয়েটাকে দেখছিলাম। ঠিকই বলেছে মেয়েটা। নিমতলা ঘাটই ওর আসল ঠিকানা। ওর শিরায়-শিরায় রক্তের ছিটেফোঁটাও নেই–আছে ঠান্ডা শুকনো বাতাস। আর হাড়ের বদলে রয়েছে গঙ্গার পলিমাটি, শ্যাওলা আর মরা গাছের ডালপালা।
আমার নাকে পচা শ্যাওলার গন্ধ আসছিল। তার সঙ্গে পারফিউমের গন্ধ। হঠাৎই বুঝলাম, পারফিউমের গন্ধটা অগুরু সেন্টের। ওঃ, মালিক যে কেন বুঝতে পারছে না মেয়েটা আর বেঁচে নেই!
জানেন, এই কুকুরটা আমার একমাত্র সঙ্গী। ফাঁকা বাড়িতে আমি একা-একা থাকি। বুকটা একেবারে খাঁ-খাঁ করে।
তাই? ঘাড় বেঁকিয়ে সুন্দর করে তাকাল মেয়েটা। কপাল থেকে চুলের গুচ্ছ সরিয়ে মিষ্টি করে হাসল।
নিমতলা ঘাটে আপনার কী দরকার?
মাঝে-মাঝে ওখানে যাই–মন ভালো করার জন্যে। অন্ধকারে, নির্জন জায়গায় একা-একা থাকতে আমার বেশ লাগে।
মাঝে-মাঝে ওখানে যান..অথচ আমাকে জিগ্যেস করলেন…। মালিকের কপালে ভাঁজ পড়ল। চোখে ফুটল সন্দেহের ছায়া।
খিলখিল করে হাসল মেয়েটি। হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ে আর কী!
না, না, ভয় পাবেন না। আমার অ্যামনেজিয়া গোছের অসুখ আছে। হঠাৎ-হঠাৎ সব ভুলে যাই….আবার হঠাৎ-হঠাৎ সব মনে পড়ে যায়।
আমি চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করলাম, মিথ্যে কথা! এটা ওর ছল, মালিক। এখনও সময় আছে– ফিরে চলো।
মালিক আমাকে ধমক দিল ও চুপ কর! চুপ কর বলছি! স্টপ বার্কিং, পম।
জানেন, রাস্তা হঠাৎ ভুলে গেলে পর কাউকে জিগ্যেস করতেও ভয় লাগে। আজকালকার লোকগুলো যা গায়ে পড়া। হাসল রূপসি। তারপর গলা নামিয়ে বলল, অবশ্য আপনি সেরকম নন।
এ-কথায় মালিক তো আটখানা।
হঠাৎই একঝলক ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা ছুটে এল। মালিক শিউরে উঠল। হাতে-হাত ঘষে ম্যাগাজিনটা বুকের কাছে আঁকড়ে বলল, কী শীত! উঃজ্যাকেটটা পরে এলে হত। তারপর, এতক্ষণ পর, যেন এইমাত্র খেয়াল করেছে এমনভাবে বলল, আপনার শীত করছে না?
মেয়েটা হাসল। উড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল টেনে ধরে বলল, শীতে আমার কিছু হয় না। আমি শীত ভালোবাসি। আপনি?
আমিও–আমিও শীত ভালোবাসি। শীতে কাঁপতে কাঁপতে আমার বোকা-হাঁদা মালিকটা বলল।
দূরে কয়েকটা দোকানের আলো দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার ধারে কতকগুলো বড়-বড় লরি চুপচাপ দাঁড়িয়ে। বাঁ-দিকে পুরোনো আমলের বিশাল মাপের সব গোডাউন। তার গা-ঘেঁষে কয়েকটা ঝুপড়ি–সেখানে কেরোসিনের আলো জ্বলছে।
আপনি কি রাতে বেড়াতে বেরোন? মালিক ওকে জিগ্যেস করল, আসলে জায়গাটা তো ভালো নয়–একেবারে কঁকা-ফাঁকা…।
একা-একা থাকার এটাই সমস্যা। তা ছাড়া বিকেল-বিকেল বেরোলে রাস্তায় লোকজন বড় বিরক্ত করে।
চলুন, তা হলে আপনাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি…।
মালিকের হ্যাংলা-উৎসাহ কুকুরকেও হার মানাল।
কিন্তু দেখলাম, যা ভেবেছি তাই। মালিকের প্রস্তাবে মেয়েটা একেবারে আঁতকে উঠল, না, না, বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার নেই। কে কী বলবে তার ঠিক আছে!
ওর বাড়ি হল জলের তলায়, মালিক। ও বহু বছর ধরে সেখানে থেকে-থেকে পচে গলে শেষ হয়ে গেছে। ওর গা থেকে তুমি পচা গন্ধ পাচ্ছ না? অবশ্য কী করে পাবে! তোমার তো আর আমাদের মতো ঘ্রাণশক্তি নেই!
মেয়েটা আবার বলল, এই ঠান্ডায় আপনার সঙ্গে বসে এক কাপ চা কিংবা কফি খেলে বেশ হত। আপনি আমাকে হেল্প করলেন। মানে…অথচ…এদিকে সেরকম দোকান বা রেস্টুরেন্ট নেই…।
আমার বাড়িতে গেলে আমি কিন্তু আপনাকে কফি খাওয়াতে পারি। হেসে বলল মালিক, তা ছাড়া আমি ভালোই রান্না করতে পারি। যদি বলেন…।
তাকিয়ে দেখি মালিকের প্রস্তাবে মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠল। ও জিভ বুলিয়ে নিল ঠোঁটের ওপর। বলল, সত্যি, এটা তো ভেবে দেখিনি! চলুন, এই ঠান্ডায় কফি দারুণ জমবে! কত দূরে আপনার বাড়ি?
