বাড়ি ফেরার পথে বেশ কয়েকবার পুরন্দর আর সোমাকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে হল। কারণ ফ্রিকশনের কীসব দিয়ে শুরু করেছিল বিকুন, পথে গতিবেগ, ত্বরণ, বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের শতকরা হিসেবের গরমিল, বুলবুলি পাখি কেন সাধারণত জোড়ায়-জোড়ায় থাকে, পিঁপড়ে কেন লাইন ধরে চলে–এসব বিষয় নিয়ে পুরন্দর আর সোমাকে প্রায় কাহিল করে দিল।
দুপুরে বাড়ি ফিরে পুরন্দর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেন। বুদ্ধি বিকাশ কেন্দ্রর গোটা ব্যাপারটা তার কেমন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
একটু দম নিয়ে পুরন্দর যখন স্নান করতে যাচ্ছেন, তখন দেখলেন, বিকুন স্নানটান সেরে ডাইনিং টেবিলে বসে অঙ্ক বই নিয়ে একমনে পাতা ওলটাচ্ছে। পুরন্দর খুশি হলেন। যাক, ছেলেটার তাহলে অঙ্কে আগ্রহ বেড়েছে।
তিনজনে যখন খাওয়া শুরু করলেন তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। পুরন্দর গম্ভীরভাবে জিগ্যেস করলেন, অঙ্ক বই নিয়ে কী করছিলি?
একগ্লাস ভাত মুখে পুরে দিয়ে বিকুন নির্বিকারভাবে জবাব দিল, মুখে-মুখে বইয়ের সমস্ত অঙ্কগুলো একবার করে কষে নিলাম।
পুরন্দরের খাওয়া থেমে গেল।
সোমার হাতে ধরা ডালের হাত থেকে ডাল চলকে পড়ে গেল।
মুখে-মুখে বইয়ের সমস্ত অঙ্ক কষে ফেলেছে বিকুন।
পুরন্দর তাকালেন সোমার দিকে। সোমার কপালে ভাঁজ পড়েছে। ওঁরা দুজনে হাঁ করে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে।
.
এরপর প্রায় দেড় দিন বিকুন শুধু বইপত্র নিয়ে কাটাল।
নিজের যত বইখাতা তার সমস্ত লেখা গোগ্রাসে গিলল। তারপর শুরু করল তিনরকম ডিকশনারি আর দিদির বই। সেগুলো শেষ হয়ে গেলে পাড়ার লাইব্রেরিতে হানা দিল। এ ছাড়া, আরও কোথায়-কোথায় যে ও ঘুরে বেড়াল কে জানে!
যতক্ষণ ছেলেটা বাড়িতে থাকে ততক্ষণই নানা বিচিত্র বিষয় নিয়ে ওর যত অদ্ভুত-অদ্ভুত কথা।
একদিন সন্ধেবেলা ঝুনু মাকে বলছিল, পাশেই ওর বন্ধু অরুণাদের বাড়িতে যাবে ভিডিয়োতে সিনেমা দেখতে। বিকুন ইংরেজি খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিল। ফস্ করে জিগ্যেস করল, দিদি, বলতো, ভিডিয়ো কথাটার মানে কী?
ঝুনু ভাইয়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফেরাল মায়ের দিকে। ওর মুখ বেজার। এ আবার কী বিপদ!
বিকুন বলল, ভিডিয়ো মানে হচ্ছে, আমি দেখি। তেমনই অডিয়ো মানে হচ্ছে, আমি শুনি। এ দুটোই ল্যাটিন শব্দ।
ঝুনু বেশ ভয়ের চোখে ভাইকে খানিকক্ষণ দেখল। তারপর সরে পড়ল সেখান থেকে।
সেদিন রাতেও সেই একই ব্যাপার।
রেডিয়োতে গান শোনা পুরন্দরের বরাবরের অভ্যাস। নিজে এককালে সংগীতচর্চা করতেন, হয়তো সেইজন্যই। ট্রানজিস্টর রেডিয়ো হাতে নিয়ে মেজাজে আধুনিক গান শুনতে-শুনতে এঘর ওঘর আর বারান্দা করছিলেন তিনি। বিকুন হঠাৎই বলে উঠল, বাবা, বড় ডার এফেক্ট হচ্ছে।
ডপলার এফেক্ট! পায়চারি থামিয়ে চোখ কপালে তুললেন পুরন্দর।
জানো না, চলতে-চলতে শব্দ করলে সেই শব্দ যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে শোনে, তার মনে হয় শব্দের কম্পাঙ্ক পালটে গেছে।
পুরন্দরের বিষয় ছিল ইকনমিক্স। ডার কী-না কী–এই ব্যাপারটা বোধহয় বিজ্ঞানের। কিন্তু তিনি ধৈর্য না হারিয়ে বিকুনের খুব কাছে এসে মোলায়েম গলায় জিগ্যেস করলেন, ব্যাপারটা আর-একটু খোলসা করে বল তো–ঠিক বুঝলাম না।
বিকুন নড়েচড়ে বসল। বলল, শোনো। তুমি ধরো স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছ। আর দূর থেকে হুইসল বাজিয়ে ট্রেন আসছে। তখন তোমার কানে হুইসলের শব্দটা অনেক বেশি তীক্ষ্ণ শোনাবে। মানে হুইসলের শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি বেড়ে গেছে বলে মনে হবে। আবার এর উলটোটাও হতে পারে। ট্রেন যখন হুইসল বাজিয়ে তোমার কাছ থেকে দূরে চলে যাবে তখন সেই শব্দের তীক্ষ্ণতা অনেক কম মনে হবে। এই ব্যাপারটা প্রথম ব্যাখ্যা করেন অস্ট্রিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী সি. জে. ডলার।
পুরন্দর ছেলের কথা শুনতে-শুনতে রেডিয়োর সুইচ অফ করে দিয়েছিলেন। এবার হাঁ করে নিজের ছেলেকে দেখতে লাগলেন।
বিকুন এতটুকু বিচলিত না হয়ে বলল, এরকম করে তাকিয়ে থেকো না, বাবা, তোমার রেটিনার ক্ষতি হতে পারে। রেটিনার যেসব রড আর কোন রয়েছে…।
পুরন্দর ছেলেকে বাধা দিলেন, থাক, থাক, আর তোকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
তখন বিকুন বলল, বড় গরম লাগছে। পাখার আর. পি. এম.-টা একটু বাড়িয়ে দেবে, বাবা?
আর. পি. এম.!
রিভোলিউশানস পার মিনি–টসংক্ষেপে আর. পি. এম.। তোমরা যাকে চলতি কথায় স্পিড বলো আর কী!
পাখার স্পিড বাড়িয়ে ফুলস্পিড করে দিলেন পুরন্দর। তারপর মানে-মানে সরে পড়লেন ছেলের কাছ থেকে।
রাতে এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আড়ালে একটু আলোচনা করতে চাইলেন পুরন্দর।
সোমা প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থায় নিজের হেনস্থার কথা জানালেন স্বামীকে। বললেন, আর বোলো না! আজ সকালে বিকুন রান্নাঘরে ঢুকে আমাকে খাবার-দাবারের ক্যালরি, মেটাবলিজম, গ্যাসের দহন, পরিবেশ দূষণ এসব নিয়ে একেবারে নাজেহাল করে ছেড়েছে। তারপর বলে কী, নুনের মধ্যে আছে সোডিয়াম আর ক্লোরিন। নুন নোনতা। আর চিনির মধ্যে আছে কার্বন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। চিনি মিষ্টি। এরকম তফাত হল কেন? তারপর টাইঅ্যালিন নামে কী একটা জিনিসের নাম করে বলল, ওটা নাকি একটা এনজাইম, আমাদের থুতুর মধ্যে আছে। আবার সেটার বানান নাকি পি অক্ষর দিয়ে শুরু। আমি তখন তরকারিতে হলুদগুঁড়ো দিচ্ছিলাম, বলে কি হলুদের মধ্যে কী কী রাসায়নিক উপাদান আছে বলো তো মা।সোমা কাতর গলায় অনুযোগ করে বললেন, তুমি বলো, এসব আমি কখনও বলতে পারি?
