বিকুন ভয়ে-ভয়ে গদিওয়ালা চেয়ারটায় গিয়ে বসল। ডক্টর বর্ধন কাপের মতো ছোট-ছোট চারটে টার্মিনাল লাগিয়ে দিলেন ওর মাথার চারপাশে। তারপর দূরে একটা বোর্ডের কাছে সুইচ অন করে একটা ডিজিটাল মিটারে কীসব দেখলেন। পরক্ষণেই সুইচ অফ করে আক্ষেপের চুকচুক শব্দ করলেন, মাথা নাড়লেন ধীরে-ধীরে। বললেন, খুবই স্যাড ব্যাপার। শুভঙ্করকে নিয়ে আপনাদের তো প্রবলেম হবেই। ওর আই. কিউ. মাত্র ৮৮। যাদের বুদ্ধি স্বাভাবিক বলা হয়, তাদের আই. কিউ. হয় ১০০। আর যাঁরা খুব নামকরা বিজ্ঞানী, তাদের আই. কিউ. জেনারেলি খুব বেশি হয়। যেমন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আই. কিউ. ছিল ১৪৬।
পুরন্দর আমতা-আমতা করে বললেন, বিকুনের–মানে, শুভঙ্করের আই. কিউ.-টা ওইরকম বাড়িয়ে দেওয়া যায় না?
ঘাড় নাড়লেন ডক্টর বর্ধন। হেসে বললেন, যায়, যায়, নিশ্চয়ই যায়। তবে বুঝেশুনে ধাপে ধাপে বাড়াতে হবে–যাতে ও বুদ্ধিবৃদ্ধির চাপটা সইতে পারে। ও নিয়ে চিন্তা করবেন না, ওটা আমার ব্যাপার। আজ আমি কয়েকটা স্পেশাল ডোজ দিয়ে ওর বুদ্ধি বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিচ্ছি। ওর ব্রেনের, মানে, সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ারের প্যারিটাল লোব আর ফ্রন্টাল লোবে একটু এক্সাইটিং সিগনাল দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। নানারকম সেন্স আর ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাক্টিভিটি প্যারিটাল লোব থেকেই জন্ম নেয়। আর ফ্রন্টাল লোবের কাজ হল যুক্তিপ্রয়োগ আর উদ্ভাবনী ক্ষমতায় সাহায্য করা। এই দুটো লোবকে একটু চাঙ্গা করে দিলেই শুভঙ্করের বুদ্ধি বেড়ে যাবে। তবে এই বাড়তি বুদ্ধির এফেক্ট মাত্র তিনদিন–মানে ৭২ ঘণ্টা থাকবে। যদি ব্যাপারটা ঠিকমতো শুভঙ্করের সুট করে যায় তা হলে আর কোনও প্রবলেম নেই–তিনদিন পর ওকে নিয়ে আসবেন, ওই বর্ধিত বুদ্ধিটা একেবারে পারমানেন্ট করে দেব। মানে, কংক্রিট ঢালাই যাকে বলে–
কথা বলতে বলতে শুভঙ্করের চেয়ারের মুখোমুখি রাখা কয়েকটা লোহার স্ট্যান্ডের কাছে চলে গেছেন ডক্টর বর্ধন। তারপর একটা বড় বাক্স থেকে চারটে বড়-বড় চাকতি বের করে পাশাপাশি দাঁড় করানো স্ট্যান্ডগুলোয় ফিট করে দিয়েছেন। চক্রগুলোয় দাবার ছকের মতো কালো-সাদা ছক কাটা রয়েছে। সেই ছকগুলো চক্রের কেন্দ্র থেকে শুরু হয়ে মাপে ক্রমশ বড় হতে-হতে এগিয়ে এসেছে চক্রের কিনারায়।
বিকাশ বর্ধন কোথায় কী একটা বোতাম টিপে দিতেই চক্রগুলো ধীরে-ধীরে ঘুরতে শুরু করল।
এইবার সুইচ টিপে ঘরের সবকটা আলো নিভিয়ে দিলেন তিনি। তারপর হঠাৎই দেখা গেল চারটে জোরালো আলোর ছটা এসে পড়েছে চারটে চক্রের ওপরে। বিকুনের মাথায় লাগানো টার্মিনালগুলো পালটে দিয়ে আরও কীসব সুইচ খটাখট করে বিকাশ বর্ধন গম্ভীর গলায় বললেন, বিকুনবাবু, তুমি পালা করে পরপর ওই চারটে চক্রের দিকে একমনে তাকিয়ে যাও। লক্ষ্মী ছেলে। দেখবে, একটু পরেই তোমার বুদ্ধি বেড়ে যাবে। আর তোমার লেখাপড়ার খিদে এমন বেড়ে যাবে যে, সবাই একেবারে চমকে যাবে।
হালকা আলোর আভায় বিকাশ বর্ধনের মুখ দেখা যাচ্ছিল। তার চোখেমুখে উৎসাহ আর আগ্রহ ফেটে পড়ছে।
বিকুন কেমন যেন ঝিমুনির ঘোরের মধ্যে বলে উঠল, ডাক্তার জেঠু, শুধু চক্রগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। চক্রগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলেই তোমার বুদ্ধি একেবারে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকবে।
আমার মাথার ভেতরটা কেমন চুলকোচ্ছে– বিকুন একটু ভয়ার্ত গলায় বলল, যেন অনেকগুলো শুয়োপোকা হেঁটে বেড়াচ্ছে…।
ইউরেকা! শুয়োপোকা! ব্রেনোটিকা! উৎফুল্ল হয়ে হাতে হাত ঘষলেন বিকাশ বর্ধন ও সাকসেসফুল, মিস্টার মিত্র, সাকসেসফুল! ওই শুয়োপোকার ব্যাপারটাই হল আসলমানে, ওটাই হল মগজের ভেতরে বুদ্ধির কামড়। আর কোনও চিন্তা নেই আপনাদের। আজ বুধবার। আপনারা শনিবার এরকম সময়ে শুভঙ্করকে আমার এখানে নিয়ে আসুন–তখন একেবারে ফাইনাল ঢালাই করে দেব।
মাত্র ৫০০ টাকা নিলেন বিকাশ বর্ধন। পুরন্দর যা ভেবেছিলেন তার তুলনায় বলতে গেলে একেবারে জলের দর।
বুদ্ধি বিকাশ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতে-আসতে সোমা চাপা গলায় পুরন্দরকে জিগ্যেস করলেন, কী গো, ডাক্তারবাবু তো বললেন ওর বুদ্ধি বেড়ে গেছে, কিন্তু আমরা বুঝব কেমন করে!
বিকুন মা-বাবার একটু আগে-আগে হাঁটছিল। হঠাৎই পিছনে তাকিয়ে সোমাকে লক্ষ করে বলে উঠল, , তুমি একটু সাবধানে হাঁটো। এ-জায়গাটার মেঝের সঙ্গে তোমার জুতোর হিলের কোইফিশেন্ট অফ কাইনেটিক ফ্রিকশন ভীষণ কম। সাবধানে না হাঁটলে তুমি পা পিছলে পড়ে যাবে।
সোমা বিকুনের কথা শুনতে-শুনতে সত্যিই পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলেন, পুরন্দর ওঁকে সময়মতো ধরে ফেলে পদভঙ্গের হাত থেকে রক্ষা করলেন। তারপর অবাক চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, কী ফ্রিকশন বললি?
বাবার প্রশ্নের উত্তরে বিকুন বিজ্ঞের মতো জবাব দিল, স্ট্যাটিক কোইফিশেন্ট অফ ফ্রিকশন– স্থিতীয় ঘর্ষণ গুণাঙ্ক। মেঝের সঙ্গে মায়ের জুতোর হিলের যে ঘষা লাগছে তা থেকে এটা হিসেব কষে বের করা যায়। সে ভীষণ জটিল ব্যাপার…।
পুরন্দর ঘাবড়ে গেলেন, কিন্তু খুশিও হলেন ভেতরে-ভেতরে। ঘণ্টা দেড়েক আগে শোনা আট বছরের মেয়েটির কথা মনে পড়ে গেল তার। চশমার লেন্সের ফোকাল লেংথের গোলমাল নিয়ে কী যেন বলছিল মেয়েটা। এইটুকু এইটুকু বাচ্চা ছেলেমেয়ে এরকম সব দুর্বোধ্য কথাবার্তা বলছে! বিকাশ বর্ধনের এক্সপেরিমেন্ট সাকসেসফুল হলে কি এইরকমই হয়?
