লাল আর সবুজ পাথরগুলো ওরা মা-মেয়েতে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। ছুঁয়ে টের পেয়েছিল, পাথরগুলো কী অদ্ভুত ঠান্ডা। রাতে ঘুমোনো পর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু তারপরই ওরা দ্যাখে, চারপাশটা অন্ধকার–আর পাথরগুলো কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।
এরপর থেকেই চলেছে এক অদ্ভুত জীবন। আমি একা মানুষ বাড়িতে থাকি। নিজে হাতে চা করি, রান্না করি, খেয়েদেয়ে অফিসে যাই। আর বাড়িতে যতক্ষণ থাকি সারাক্ষণ বউ আর মেয়ের সঙ্গে গল্প করি। মাঝে-মাঝেই ওরা বলে, এখানে কী কষ্ট! এই অন্ধকারে আর থাকতে পারছি না। মা গো!
আমি সেই আর্তনাদ শুনে ডুকরে উঠি, নিষ্ফল আক্রোশে হাত-পা ছুড়ি। কিন্তু তার বেশি আর কিছু করতে পারি না।
যতই দিন যেতে লাগল তপতী আর মল্লিকার কথা অস্পষ্ট হয়ে আসতে লাগল। মনে হতে লাগল, ওরা যেন বহুদূর থেকে আমার সঙ্গে কথা বলছে। ক্রমশ যেন দূরে সরে যাচ্ছে। আমার কাছ থেকে। যেমন, যদি মল্লিকাকে আজ দুপুরে জিগ্যেস করি, তোমার মাথাব্যথাটা কেমন আছে? কমেছে? তা হলে পরদিন ভোরবেলা ওর উত্তর শুনতে পাই। যেন আমার কথা বাতাসে ভেসে ওর কাছে পৌঁছোতে বেশ সময় লাগছে। আবার উত্তর ফিরে আসার সময়েও ঠিক তাই।
তপতী মাঝে-মাঝে বলে, বাবা, তোমার কথা খুব আস্তে শোনা যাচ্ছে।
মল্লিকাও বলে, আর একটু জোরে বলো, শুনতে পাচ্ছি না।
বুঝতে পারছি, আমার হাতে আর সময় নেই। এইভাবে দূরে সরতে সরতে ওরা একেবারে মিলিয়ে যাবে। এমনিতেই আমি আমার অশরীরী সংসার নিয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছি, তার ওপর যদি ওরা চিরকালের মতো হারিয়ে যায় তা হলে…।
তাই আমি প্রতিদিন সন্ধেবেলা বাসের ভিড়ে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে খুঁজি। থুতনিতে সামান্য খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। মাথার চুল প্রায় সাদা। চোখের মণি যেন আলোয় ফুলকি। নাকের ওপরে হাই পাওয়ারের চশমা। আর হাতে সান্ধ্য আজকাল।
আমি পাগলের মতো প্রতিটা দিন কাটাই, আর পাগলের মতো সেই বৃদ্ধ লোকটিকে খুঁজে বেড়াই–যে লাল-সবুজ ঝিকিমিকি পাথর দিয়ে আমার জীবন পাথর করে দিয়েছে।
আপনি কি তাকে দেখেছেন? দেখতে পেলে অবশ্যই সান্ধ্য আজকাল-এর দপ্তরে অন্তত একটা পোস্টকার্ড দিয়ে জানাবেন। আমি যে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছি।
দয়া করে আমাকে বাঁচান। সংসার-হারানো এক প্রৌঢ়কে দয়া করে সাহায্য করুন। আপনার কাছে এই আমার একান্ত প্রার্থনা।
.
গল্পটা পড়া শেষ করে রমাপদবাবু কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন। ভারি অদ্ভুত গল্প তো! গল্প, নাকি সত্যি?
খবরের কাগজটা ভাজ করে সতর্ক চোখে চারপাশটা একবার দেখে নিলেন রমাপদবাবু। যেই একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলতে যাবেন অমনি বাঁ-পাশ থেকে কে যেন ডেকে বলল, কী ব্যাপার, রমাপদবাবু! চিনতে পারছেন?
রমাপদবাবু চোখ ফেরালেন। বাঁ দিকে আড়াআড়ি সিটে জানলার দিকে পাশেই এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক বসে আছেন। তাঁর হাতে এক কপি সান্ধ্য আজকাল।
রমাপদবাবুর দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ হাসলেন। হাতের কাগজটা ভাঁজ করে বললেন, চিনতে পারলেন না তো!
