এই হল প্রাইভেট সিকিওরিটি গার্ডের দশা! একে ভাড়া করে নিয়ে এসে দিনের-পর-দিন টাকা গুনে গেছে শত্রুজিৎ! গত একমাস ধরে তো মেয়েটার খাওয়া আর ঘুমোনো ছাড়া কোনও কাজ নেই! আজ যখন বিপদ হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়েছে, তখনও সে দিব্যি ঘুমোচ্ছে!
এইজন্যই ঝুমকির কথা রাজরীতার প্রথমে মনে পড়েনি।
ঝুমকি হর্স নেবুলার কে-২০৪ গ্রহের মানুষ। আলটিমেট সিকিওরিটি অন্তত সেরকমই জানিয়েছিল। শত্রুজিৎকে ওরা বলেছিল, স্যার, আসলে এরা মানুষ নয়, হিউম্যানয়েড–মানে, সাইবারম্যানও বলতে পারেন। ওদের শরীরে আমাদের মতো রক্ত-মাংস আছে বটে, তবে ওদের হার্ট ধুকপুক করে ব্যাটারির জোরে। ওদের এমন সব আশ্চর্য ক্ষমতা আছে যা আমাদের সিকিওরিটির ব্যাপারে মোক্ষম। তবে সত্যি-সত্যি দরকার না হলে ওরা সেইসব স্পেশাল পাওয়ার ব্যবহার করে না। আপনি ওকে ভাড়া নিন–তা হলে সেফটি নিয়ে আপনার আর কোনও চিন্তা থাকবে না। ও আপনার বাড়িতে বাড়িরই একজন হয়ে থাকতে পারবে। কেউ ওকে সিকিওরিটি গার্ড বলে সন্দেহ করবে না।
আপনাদের চার্জটা বড় বেশি। শত্রুজিৎ অনুযোগ করে বলেছিল।
তখন আলটিমেট সিকিওরিটি-র অফিসারটি হেসে বলেছে, উই আর বেস্ট ইন দ্য গেম। কে-২০৪-এর সঙ্গে শুধু আমাদের কোম্পানিরই ইমপোর্ট এগ্রিমেন্ট হয়েছে। সুতরাং আপনি যা পাচ্ছেন তা হল সেরা নিরাপত্তা–আলটিমেট সিকিওরিটি। তারপর গলায় বাঁধা টাইয়ের নটটা ঠিক করতে করতে সামান্য ইতস্তত করে অফিসারটি বলেছে, শুধু একটা ছোট্ট প্রবলেম আছে..।
কী প্রবলেম? কৌতূহলে শত্রুজিতের ভুরু কুঁচকে গেছে।
মানে, ঝুমকির গলার স্বরটা মেটালিক..যেটাকে পরিভাষায় ধাতব কণ্ঠস্বর বলে–মানে, আদ্যিকালের সিনেমাগুলোর রোবটের গলা যেমন শোনায় আর কী!
হাসল শত্রুজিৎ ও গলার স্বর মেটালিক হোক বা পেটালিক হোক, আমার কাজ নিয়ে কথা!
শত্রুজিতের বলা কথাগুলো রাজরীতার মনে পড়ছিল। তবে ওই কোম্পানি থেকে এটা বলে দেয়নি যে, ঝুমকি ঘুমোতে ভীষণ ভালোবাসে। একটু ফাঁক পেলেই চট করে একপ্রস্ত ঘুমিয়ে নেয়।
ঝুমকিকে দেখেই নিকি আর ভিকি থমকে গেল। কিন্তু সে এক লহমার জন্য। তারপরই অশ্লীল উল্লাসে ওদের হাসি চওড়া হল।
নিকি, আমাদের লাক দারুণ! ম্যাডামকে আর শেয়ার করতে হবে না।
নিকি তখন রাজরীতার শরীরের উত্তর গোলার্ধে ব্যস্ত ছিল। হাসতে হাসতে ও জবাব দিল, তুই ওকে নে। ম্যাডামকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
শেষ কথাটা ন্যাকা-ন্যাকা সুরে বলেই রাজরীতার দিকে দ্বিগুণ মনোযোগ দিল নিকি। আর ভিকি অ্যাথলিটের ক্ষিপ্রতায় দৌড়ে গেল ঝুমকির দিকে। এবং কেউ কিছু আঁচ করে ওঠার আগেই এক হ্যাঁচকায় ঝুমকিকে কোলে তুলে নিল।
ভিকি মরশুম-খ্যাপা কুকুরের মতো ঝুমকিকে আদর করছিল। আর হিউম্যানয়েড ঝুমকি অবাক হয়ে লোকটার পাগলামো দেখছিল।
এদিকে রাজরীতা নিজেকে বাঁচানোর জন্য নিকির সঙ্গে প্রাণপণে ধস্তাধস্তি করছিল। আর একইসঙ্গে ভাবছিল, ব্যাপারটা কতদূর গড়াবে। রেপ, নাকি রেপ অ্যান্ড মার্ডার? কিন্তু ঝুমকির বেলায় কী হবে? ও তো মানুষ নয়! যদিও বাইরে থেকে ওর সবকিছুই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো।
আমাকে ছেড়ে দিন। আমি হিউম্যানয়েড। আমাকে ছেড়ে দিন। আমি হিউম্যানয়েড। আমাকে…। অবাক চোখে ভিকির দিকে তাকিয়ে থেকে একঘেয়ে ধাতব সুরে বলে চলল ঝুমকি।
ওর গলার স্বরে চমকে উঠল ভিকি। এক ঝটকায় ওকে মেঝেতে নামিয়ে দিল।
নিকিও তখন নিজের জরুরি কাজ ছেড়ে হাঁ করে রোগা ফরসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে।
ঝুমকি তখন বলছে, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আমি এই ফ্ল্যাটের সিকিওরিটি গার্ড। আপনারা দয়া করে এক্ষুনি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যান, নইলে আপনাদের বিপদ হবে। সে-বিপদ থেকে আর ফেরা যায় না। আশা করি আপনারা আমার অনুরোধ রাখবেন। আমার অনুরোধ রাখবেন। আমার অনুরোধ…।
রাজরীতাও অবাক হয়ে ঝুমকির কাণ্ড দেখছিল। ভয়ংকর দুজন ক্রিমিনালকে ও যেন নিশ্চিন্তে গীতা পাঠ করে শোনাচ্ছে।
প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কাটা ভিকি সামলে নিয়েছিল। ঝুমকির কথা শুনে ও ব্যঙ্গ করে বলল, আমরা দয়া করে এক্ষুনি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাব। তার আগে চটপট আমাদের কাজটা সেরে নিতে দাও। এসো, কাছে এসো–।
আমি মানুষ নই হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। ঝুমকি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়ার মতো করে কথাগুলো উচ্চারণ করল।
আরে বাইরে তো কোনও ফারাক নেই–ওতেই আমার কাজ মিটে যাবে! অধৈর্যভাবে বলল ভিকি।
আমার ভেতরে ব্যাটারি আছে। আমি মানুষ নই হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড..।
এসো, ব্যাটারির সুইচটা একটু খুঁজে দেখি। ঝুমকির দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত করে বলল ভিকি, এবং ঝুমকিকে আবার জাপটে ধরল।
ওর গায়ে মুখ ঘষতে-ঘষতে ভিকি বলল, কই, সবই তো দেখছি মানুষের মতো। এতেই আমার কাজ চলে যাবে। দেখি তো, তোমার ব্যাটারির সুইচটা কোথায়!
ঝুমকি যান্ত্রিকভাবে আগের কথাগুলোই বারবার বলছিল, কিন্তু ভিকি ওর কথায় কোনওরকম আমল দিচ্ছিল না। একমনে নিজের কাজ করছিল।
নিকি এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। বিপদের জন্য আগাম সতর্ক হয়ে টেবিলে রাখা ব্যাগের দিকে দু-পা এগিয়েও গিয়েছিল–যাতে দরকার হলেই ব্যাগ থেকে একটা অস্ত্র বের করে নেওয়া যায়।
