এখন রাস্তায় বেরোলে সবাইকে সিকিওরিটি ভ্যানে করে যাতায়াত করতে হয়। ওগুলোই হল বাসের বিকল্প। এ ছাড়া ট্যাক্সি বা প্রাইভেট কার মানেই আর্মার্ড কার–সবসময় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি। সন্ধের অন্ধকার নেমে এলেই লোকজন যার-যার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন শুরু হয় বেপরোয়া উচ্চুঙ্খল ক্রিমিনালদের দিন।
ভারতের প্রায় প্রতিটি রাজ্যেই এই একই অবস্থা। রোজ কম্পিউটারে ইলেকট্রনিক নিউজপেপার দেখলেই বোঝা যায় আইন-শৃঙ্খলা কী বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে।
ক্রাইম ডট কম দেখতে-দেখতে এসব কথাই ভাবছিল রাজরীতা।
শত্রুজিৎ অফিসে গেছে। ও ক্যালকাটা স্পেস রিসার্চ সেন্টার-এ অ্যাভিয়েশন ইঞ্জিনিয়ার। ওদের একমাত্র ছেলে মনোরম পাশের ঘরে কম্পিউটার টার্মিনালে বসে স্কুলের ক্লাস করছে। ওদের লার্নিং নেটওয়ার্ক-এ একসঙ্গে প্রায় দুশো ছেলে বাড়িতে বসেই ক্লাস করতে পারে। মাঝে-মাঝে শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার জন্য ওদের স্কুলে যেতে হয়।
ফুটবল-মাঠের মতো এই বিশাল ফ্ল্যাটে রাজরীতার সময় কাটে টিভি দেখে, কম্পিউটার গেমস খেলে, অথবা সেলফোনে শত্রুজিতের সঙ্গে কথা বলে। বিকেলবেলা ও মনোরমকে নিয়ে কাছেই মিলেনিয়াম পার্ক-এ বেড়াতে যায়। তার জন্য ওর আর্মার্ড কার রয়েছে। আর রয়েছে ঝুমকি ওদের প্রাইভেট সিকিওরিটি গার্ড। গতমাসেই ওকে আলটিমেট সিকিওরিটি কোম্পানি থেকে ভাড়া করে নিয়ে এসেছে শত্রুজিৎ। পরিস্থিতি ক্রমশ যেদিকে যাচ্ছে তাতে কোনওরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থাই আর যথেষ্ট নয়।
টিভিতে খবর থামিয়ে বিজ্ঞাপন চলছিল।
আলফা ট্যুর নামে একটা কোম্পানি মাত্র এক লক্ষ টাকায় চাঁদে দু-দিনের জন্য বেড়িয়ে নিয়ে আসবে। এনার্জি পাউডার রোজ এক চামচ খেলেই ক্লান্তি আর অবসাদ ভয়ে পালাবে। স্পিড শু মের মোটর লাগানো জুতো পায়ে দিলে বিনা পরিশ্রমে গাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছোটা যাবে। শনির উপগ্রহ টাইটানে একটা অ্যাডভেঞ্চারের ব্যবস্থা…।
হঠাৎই ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠেছে। তারপর…।
কী হয়েছে, মাম্মি? অচেনা লোকদুটোকে একপলক দেখে নিয়ে মনোরম অবাক হয়ে মা কে জিগ্যেস করল।
কিচ্ছু হয়নি, খোকা। তোমার মায়ের সঙ্গে আমরা একটু জরুরি কথা বলছি। তুমি যাও– তোমার ঘরে চলে যাও।
কথাগুলো বলতে-বলতে ভিকি মনোরমের কাছে এগিয়ে গিয়েছিল। কখন যে ও বন্দুকটা লুকিয়ে ফেলেছে রাজরীতা খেয়াল করেনি।
আলতো করে মনোরমের পিঠে হাত দিয়ে ওকে ওর পড়ার ঘরের দিকে নিয়ে যেতে লাগল ভিকি।
কী করছিলে তুমি?
কম্পিউটারে ইন্টারঅ্যাকটিভ লার্নিং সেশানে বসেছিলাম।
বাঃ, চমৎকার। গুড বয়। যাও, পড়াশোনা করো গিয়ে। এক্ষুনি আমাদের কথা শেষ হয়ে যাবে।
মনোরমকে পড়ার ঘরে ঢুকিয়ে ওর ঘরের দরজাটা লক করে দিল ভিকি।
আর সঙ্গে-সঙ্গে নিকি চটপট পরচুল, চশমা আর গোঁফ খুলে রেখে রাজরীতাকে পিছন থেকে হ্যাংলার মতো জড়িয়ে ধরল। ওর ঘাড়ে গলায় মুখ ঘষতে লাগল পাগলের মতো।
রাজরীতা ধস্তাধস্তি করছিল। ভয় আর ঘেন্না ওকে কাবু করে দিতে চাইছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও লড়াই করতে পারছিল।
ভিকি ছুটে এল ওদের কাছে। দুপাশে দু-হাত ছড়িয়ে ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, তুমি একা শেষ কোরো না/আমার জন্যে একটু রেখো। সোনা-দানা আর যা আছে/তন্নতন্ন খুঁজে দেখো।
ছড়া কাটতে কাটতেই রাজরীতাকে টপ করে চুমু খেল ভিকি। তারপর ওকে দু-হাতের দশ আঙুলে আদর করতে শুরু করল।
রাজরীতার পিছনে দাঁড়িয়ে নিকি ওর পিঠে-কোমরে যত্রতত্র মুখ ঘষছিল। ওর দু-হাত বেপরোয়াভাবে যেখানে-সেখানে হামলে বেড়াচ্ছিল।
ভিকির ছড়া কাটার উত্তরে ও কোনওরকমে জড়ানো গলায় বলল, আগে মাম্মি-সোনাকে তন্নতন্ন করে সার্চ করি, পরে মেটাল-সোনা খুঁজে দেখব।
নিকি আর ভিকি জানে, এখানকার সব ফ্ল্যাটের দেওয়াল সাউন্ডপ্রুফ। সুতরাং রাজরীতা চিৎকার করলেও কোনও ক্ষতি নেই। পাশের ঘরে ওর ছেলেও সে চিৎকার শুনতে পাবে না। এর নাম প্রাইভেসি!
টিভিতে একটা গানবাজনার প্রোগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাজনার বাজখাঁই জগঝম্পে কানে তালা লাগার জোগাড়। কিন্তু নিকি আর ভিকির তাতে সুবিধেই হচ্ছিল।
মানুষের আদিম প্রবৃত্তির বশে এবার চিৎকার করে উঠল রাজরীতা।
ওর পরনের পোশাক এর মধ্যেই ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। মাথার চুল এলোমেলো। বড়-বড় শ্বাস পড়ছে। চোখে শুধুই আতঙ্ক।
ওর চিৎকার কেউ শুনতে পেল বলে মনে হল না।
হঠাৎই ওর ঝুমকির কথা মনে পড়ল।
মহাশূন্যে ভেসে যেতে-যেতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো ও ঝুমকির নাম ধরে গলা ফাটিয়ে ডেকে উঠল।
তার দু-চার সেকেন্ডের মধ্যেই একটা বেডরুমের দরজা খুলে ঝুমকি এ-ঘরে উঁকি মারল।
বছর আঠারো কুড়ির মিষ্টি মেয়ে। রোগা, ফরসা। যৌবন চোখে পড়ার মতো। খোলা চুল কী এক শ্যাম্পুর কল্যাণে লম্বা টান-টান হয়ে ঝুলছে। কপালের ওপরেও চুলের পরদা নেমে এসেছে। পরনে আকাশ-নীল চুড়িদার।
আঙুল দিয়ে চোখ ঘষছিল ঝুমকি। বোধহয় ঘুমোচ্ছিল রাজরীতার ডাকে ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে। সাউন্ডপ্রুফ দেওয়াল ওর শোনার ক্ষমতাকে কাবু করতে পারেনি। ওকে ভাড়া দেওয়ার সময় আলটিমেট সিকিওরিটি কোম্পানি ওর এই দারুণ ক্ষমতার কথা জানিয়েছিল। সেইসঙ্গে জানিয়েছিল ওর আরও সব অদ্ভুত-অদ্ভুত ক্ষমতার কথা।
