আমি মুখ খুলতে না চাইলেও সুবীর ভীষণ চাপাচাপি করতে লাগল।
ওর সঙ্গে বেশিক্ষণ পেরে উঠলাম না। শেষ পর্যন্ত জিনিয়ার কথা একটু-আধটু রেখে-ঢেকে ওকে বললাম।
‘জানিস, জিনিয়া সবসময় আমাকে সন্দেহ করে। সায়েন্টিস্ট হিসেবে আমাকে কোনও পাত্তাই দেয় না।’
সুবীর গম্ভীরভাবে সিগারেট টান দিয়ে বলল, ‘দেবু, আমি সায়েন্সের কিছু বুঝি না, কিন্তু তোর কেরিয়ার তো আমি জানি! তা ছাড়া সেদিন তোর আর জেঠুর কথাবার্তা শুনেছি। আমার জেঠু ভীষণ স্নব টাইপের—বিজ্ঞান নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। হাইফাই সায়েন্টিস্ট হলে যা হয় আর কী! কিন্তু তোর সঙ্গে জেঠু যেভাবে কথা বলেছে তাতে আমি এটুকু বুঝেছি যে, তোর মধ্যে সামথিং হ্যাজ। আমি বিশ্বাস করি, তুই একদিন দুনিয়াকে চমকে দিবি…।’
সুবীরের কথাগুলো আমার কানে সান্ত্বনার মতো শোনাচ্ছিল, কিন্তু একইসঙ্গে এও বুঝতে পারছিলাম, ওর কথাগুলো খুব জেনুইন। ও আমার খুব কাছের বন্ধু।
হঠাৎ আমাকে ছোট্ট একটা ধাক্কা মারল সুবীর। রকের খিস্তি দিয়ে বলল, ‘ওসব ফালতু চিন্তা ছাড় তো! নে একটা সিগারেট ধরা—’ ও জোর করে একটা সিগারেট গুঁজে দিল আমার হাতে।
আমি এমনিতে স্মোক করি না। হয়তো ছ’মাসে ন’মাসে মুড খারাপ হলে একটা সিগারেট টান দিই। যেমন এখন।
সুবীর আমাকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘কাল দোকান থেকে তাড়াতাড়ি ব্যাক কর। কাল আমাদের অফিসে একটা গ্র্যান্ড পার্টি আছে—কোম্পানির দুর্ধর্ষ বিজনেসের জন্যে। তুই আমার সঙ্গে যাবি—আমার গেস্ট হয়ে।’
আমার কিছু ভালো লাগছিল না। টাইম মেশিন নিয়ে অ্যাডভেঞ্চার আপাতত শেষ। তার ওপর জিনিয়ার ম্যানিয়া—সঙ্গে ফাউ হিসেবে উপেক্ষা তো আছেই। অঅর সবশেষ আমার নতুন আবিষ্কারটার কথা সবাইকে জানাতে না পারার অসহ্য যন্ত্রণা।
আমার প্রতিবাদ করতে ভালো লাগছিল না বলেই সুবীরের কথায় রাজি হলাম।
পরদিন ওর সঙ্গে পার্টিতে গেলাম। এবং মরলাম।
সেখানে রঙিন বেলুন, হুইস্কি, মিউজিক, নাচ— কী নেই! প্রথম কুড়িমিনিট কোম্পানির সাফল্য নিয়ে প্যানপ্যানানির পর পার্টির হুল্লোড় শুরু হল। এইসব পার্টিতে যে নিয়মকানুনের খুব একটা বালাই থাকে না, সেটা বুঝতে পারলাম।
আমি বোকার মতো ড্রিংক-এর গ্লাস হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, চারপাশে উদ্দাম নাচ চলছে। মনে হল, দুর, এখানে আমি কেন যে এলাম! মাথা উঁচু করে ভিড়ের মধ্যে সুবীরকে খুঁজতে লাগলাম।
হঠাৎই এক ধাক্কায় আমার হাতের গ্লাসটা ছিটকে পড়ল।
চমকে তাকিয়ে দেখি একটি ছিপছিপে লম্বা মেয়ে কোমরে মোচড় দিয়ে পেছনদিকে ঘুরে আমার চোখে তাকিয়ে আছে।
আমার মনে এই দৃশ্যটা এখনও ফ্রিজ হয়ে আছে।
‘স—রি,’ লম্বা করে টেনে মেয়েটি বলল।
মোমবাতির আলোয় যে-স্নিগ্ধ সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি মানানসই এ-মেয়েটি সেরকম সুন্দর। ওর মোলায়েম মুখ, সরু চোখ, ধনুকের মতো ভুরু, ছোট অথচ পুরু ঠোঁট, কপালের ওপরে নেমে আসা চুলের ঝালর—সব মিলিয়ে এক প্রশান্ত সৌন্দর্য। যেন সন্ধে নেমে আসা ছায়া-মাখা আলোয় দেখা দিঘির জল। যার কাছে সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছ্বলতা হেরে যায়।
একজন বেয়ারা আমার পায়ের কাছে উবু হয়ে বসে কাচের টুকরোগুলো একটা ট্রে-তে তুলে নিচ্ছিল। আশপাশের দু-একজন ছোট-ছোট কথা বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিল। ইতিমধ্যে সুবীর কোথা থেকে যেন ছুটে এসে আমার কাছে হাজির হয়ে গেছে।
ব্যাপারগুলো আমার চোখে পড়ছিল কিন্তু মাথার ভেতরে ঢুকছিল না। কারণ, মাথার ভেতরটা চোখের সামনে স্থির হয়ে থাকা মুখটাকে ঘিরেই ব্যস্ত ছিল।
সাদা টপ। সাদা প্যান্ট। কোমরে মেটালের বেল্ট। গলায় টকটকে লাল ঝকঝকে পাথরের মালা। কানে ছোট-ছোট লাল পাথর।
স্টানিং বিউটি ওকে বলা যায় কি না জানি না, কিন্তু আমি স্টানড হয়ে গেলাম।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ও আমার মুখোমুখি সোজা হয়ে দাঁড়াল। আবার টেনে-টেনে বলল, ‘বাবা বললাম তো—স—রি…।’
এবারে সুবীর পরিস্থিতির দায়িত্ব নিল। ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল। আমি তখন জামা-প্যান্টে চলকে পড়া তরল রুমাল দিয়ে মুছে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
ওর নাম সোনি। সুবীরের কোম্পানির ভিপি-র মেয়ে। ফিন্যান্স নিয়ে এম. বি. এ. করলেও সায়েন্সে প্রচুর ইন্টারেস্ট।
আমার কাঁধে হাত রেখে সুবীর বলল, ‘সোনি, আই প্রেজেন্ট টু ইউ মাই হার্ট-টু-হার্ট ফ্রেন্ড—দ্য গ্রেট ইনভেন্টর—দেবদত্ত রায়চৌধুরী।’
‘হোয়াট আ ইউনিক নেম। কমপোজড অফ ফোর সারনেমস! এরকম আমি কখনও শুনিনি—চার-চারটে পদবি দিয়ে তৈরি একটা নাম: দেব, দত্ত, রায়, চৌধুরী। তার ওপর আবার ইনভেন্টর! গ্রেট। বলুন, কী-কী ইনভেন্ট করেছেন আপনি?’
আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম। কোনও জবাব দিতে পারলাম না।
মিউজিক বাজছিল। কিন্তু সোনি অনেকক্ষণ নাচ বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর কী যে হল! হঠাৎই খেয়াল করলাম, আমরা দুজনে হলঘরের এককোণে একটা লম্বা সোফায় বসে আড্ডা মারছি। আমার নাকে ওর পারফিউমের গন্ধ আসছে।
‘বলুন, আপনি কী-কী ইনভেন্ট করেছেন?’ পুরোনো প্রশ্নটা আবার করল সোনি, ‘সুবীরদা বলল, আপনি নাকি একজন গ্রেট ইনভেন্টর।’
আমি এখন অনেকটা নরমাল হয়েছি। তাই হেসে বললাম, ‘আমার লেটেস্ট ইনভেনশানটা দারুণ।’
