এ-মন্তব্য আমি কল্পনাও করিনি। এতটাই অবাক হয়ে গেলাম যে, আমার মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না।
জিনিয়া আমাকে এখনও সন্দেহ করে? আশ্চর্য! দ্রৌপদীর ব্যাপারটা তা হলে ও ভোলেনি!
বিয়ের বছর-পাঁচেক পর একবার একটা গায়েপড়া মেয়ের সঙ্গে আমার সামান্য ইয়ে হয়েছিল। ওর নাম ছিল দ্রৌপদী। ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট কিনতে প্রায়ই আমার দোকানে আসত। তারপর কথাবার্তায় বুঝতে পারে যে, এ-বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা আছে। তখন দোকানে ওর আসা-যাওয়া বাড়ে। দরকার পড়লেই আমাকে মোবাইলে ফোন করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ও দরকার ছাড়াই ফোন করা শুরু করে।
এরপর একদিন দ্রৌপদীকে একটা সার্কিটের অপারেশান দেখানোর জন্যে আমি বাড়িতে নিয়ে আসি। জিনিয়ার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। জিনিয়া ওকে বন্ধুর মতো মেনে নেয়।
দিন যায়। দ্রৌপদীর সঙ্গে বন্ধুত্বটা আমার বাড়তে থাকে। না, ওটা কখনও প্রেম-টেম-এর দিকে টার্ন নেয়নি। কিন্তু জিনিয়ার কয়েকটা খোঁচা দেওয়া কথায় একদিন বুঝলাম ব্যাপারটা ওর ভালো লাগছে না। ও একটা ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স-এ ভুগছে। তার ওপর বাচ্চা-কাচ্চা হয়নি বলে কমপ্লেক্সটা হাইপারবোলিক এক্সপ্যানশান হয়ে বীভৎস চেহারা নিয়েছে।
আমি ব্যাপারটা বুঝতাম। তাই কখনও পালটা আঘাত না দিয়ে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয়নি।
একদিন জিনিয়া আমাকে আর দ্রৌপদীকে সাউথ সিটি মল থেকে বেরোতে দ্যাখে। ব্যাপারটা একেবারেই নির্দোষ ছিল। দ্রৌপদী একটা হ্যান্ডব্যাগ কেনার জন্যে ওখানে যাচ্ছিল। আর আমার দুটো জিনস কেনার ছিল। তাই চাঁদনি থেকে দুজনে সাউথ সিটি মল-এ গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু এই কাকতালীয় ব্যাপারটা বাড়িতে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। সে-বিস্ফোরণ নাইন/ইলেভেন-এর বিস্ফোরণের চেয়েও মারাত্মক।
আমাকে ক’দিন তুলোধোনা করার পর দ্রৌপদীকেও টেলিফোনে জঘন্য অপমান করেছিল জিনিয়া। সেসময়ে ওকে দেখে আমার মনে হয়নি ওর মধ্যে কোনও শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা রুচি-সভ্যতার ছাপ আছে।
তখন আমার মনে একটা বাজে ইচ্ছা চেপেছিল। কিন্তু নানান অসুবিধের কথা ভেবে ব্যাপারটা মাথা থেকে বের করে দিই। কারণ, তখনও তো আমার টাইম মেশিন তৈরি হয়নি।
এরপর থেকে আমি বরাবর জিনিয়ার অকারণ সন্দেহের আওতায় থেকে গেছি। প্রায় বছরখানেক জিনিয়া নর্মাল ছিল। নাচের রিহার্সাল, নাচের প্রোগ্রাম—এসব নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাতে আমি ভেবেছিলাম, সন্দেহবাতিকটা অবশেষে গেছে। কিন্তু এখন বুঝলাম, ব্যাপারটা সহজে যাওয়ার নয়।
আমি কাতরভাবে বললাম, ‘জিনিয়া, প্লিজ, তুমি ভুল ভাবছ। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো। আমি…।’
‘তুমি যদি ক্লিন হও তা হলে আমাকেই শার্টটা পোড়ানোর দায়িত্ব দিতে পারতে। একা-একা মাঝরাত্তিরে চুপিচুপি…ছিঃ!’
জিনিয়া প্রবল চিৎকার করে কথা বলছিল। এখুনি আশেপাশের বাড়ির লোক না জেগে ওঠে!
‘জিনি, প্লিজ—আস্তে…আস্তে। পাড়ার লোকজন এবার জেগে উঠবে। প্লিজ।’ ওর কাছে এগিয়ে গেলাম আমি: ‘শোনো। তোমাকে সবটা খুলে বলছি। আমার এই নতুন এক্সপেরিমেন্টটা হল, কোনও জিনিসকে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই থেকে জিনিসটাকে আবার তৈরি করা। রিকনস্ট্রাকশন। বুঝলে? তারই ফার্স্ট স্টেপ হিসেবে এই শার্ট…মানে…।’
সে-রাতে ওকে ঠান্ডা করতে আমার প্রাণ বেরিয়ে গিয়েছিল। ওকে বলেছিলাম, যেহেতু ও আমার বিজ্ঞান-টিজ্ঞান করার ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করে না তাই ওকে লুকিয়ে মাঝরাতে শার্টটা পোড়াচ্ছিলাম।
অনেক ইনিয়েবিনিয়ে ঘ্যানঘেনিয়ে ওকে শান্ত করলাম। একেবারে শেষে কান্নাভাঙা গলায় বলেছি, ‘আমার জীবনে শুধু বিজ্ঞান আর তুমি—এ ছাড়া আর কী আছে বলো? রোজ-রোজ দোকানে যেতে আমার একটুও ভালো লাগে না…।’
যাই হোক, অনেক কষ্টে জিনিয়ার রোষ থেকে বাঁচলাম। কিন্তু পুরোনো বাজে ইচ্ছেটা আবার মাথা চাড়া দিল। এখন তো আর কোনও প্রবলেম নেই! আমার হাতে টাইম মেশিন আছে।
কিন্তু মনকে বোঝালাম। তোমার হাতে ক্ষমতা থাকলে তাকে সামলে রেখে ব্যবহার করতে হয়। সামান্য টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া পর্যন্ত ঠিক আছে—তার চেয়ে বেশি আর এগিয়ো না। নিজের ওপরে কাবু রাখো। ক্ষমতার অপব্যবহার কোরো না। লাগাম—লাগাম! লাগামের কথা কখনও ভুলবে না।
অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে এসব কথা ভেবেছিলাম। মনে-মনে অনেক ভালো-ভালো শপথ নিয়েছিলাম।
কিন্তু সেগুলো যে সাতদিন পরেই চটকে চচ্চড়ি হয়ে যাবে সেটা তখন বুঝতে পারিনি।
কী করেই-বা বুঝব? তখন তো সোনির সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি!
আলাপটা করিয়ে দিয়েছিল সুবীর। ফলে এক অর্থে বলা যেতে পারে আমার অপকর্মের জন্যে সুবীরই দায়ী। ওই যে বলেছি, একটা ঘটনা থেকে আর-একটা ঘটনা যে কীভাবে গড়ায় সেটা কেউ জানে না। ফলে আমার মেন্টাল কন্ডিশান, সুবীরের সঙ্গে দেখা হওয়া, ওর অফিসের পার্টিতে আমার যাওয়া সোনির সঙ্গে পরিচয়, তারপর…।
নাঃ, ব্যাপারটা শুরু থেকেই বলি।
একদিন রাতে খুব ‘মুড অফ’ অবস্থায় সুবীরের সঙ্গে আড্ডা মারছিলাম।
হঠাৎই ও বলল, ‘তোর কী হয়েছে বল তো?’
‘কিছু হয়নি। নিজেকে জাস্ট ফালতু লাগছে…।’
সুবীর সিগারেট খাচ্ছিল। সেটাতে লম্বা টান দিয়ে বলল, ‘বস, বলো তো, কেসটা কী?’
