জিনিয়াকে হতবাক অবস্থায় ফেলে রেখে আমি আবার একতলায় ছুট লাগালাম। আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করছিল। জিনিয়াকে সকাল-সকাল আচ্ছা টাইট দেওয়া গেছে। আমার এই জয়টাকে স্ত্রীর উপেক্ষায় জর্জরিত বিজ্ঞানীদের উৎসর্গ করলাম।
চাঁদনি চকে আমার ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্টস-এর একটা দোকান আছে। দোকানের নাম ‘সুপার ইলেকট্রনিক্স’। দোকানটা মাপে ছোট হলেও বেশ চালু দোকান। আমি আর দুজন ছোকরা অ্যাসিস্ট্যান্ট মিলে দোকান সামলাতে বেশ হিমসিম খাই। দোকানের রোজকার সেল সাত থেকে দশ হাজার টাকা।
অ্যাসিস্ট্যান্টদের মধ্যে একজনের নাম তারক, অন্যজনের নাম সতু। তারক রোগা-পাতলা। একটা চোখ সামান্য লক্ষ্মীট্যারা। সবসময় পানমশলা চিবোচ্ছে, চোয়াল নড়ছে, আর ঘনঘন পিক ফেলছে।
সতুর চেহারা বেশ ভারী। চালচলন গুরুগম্ভীর। খদ্দেরদের সঙ্গে খেঁকিয়ে কথা বলাটা বেশি পছন্দ করে। ওকে সবসময় ‘আঃ, সতু…কেয়ারফুল।’ বলে ডাক দিতে হয়। এ ছাড়া ওর এফ. এম. চ্যানেল শোনার প্রবল বাতিক। ওর জন্যেই আমাকে দোকানে সবসময় রেডিয়ো চালিয়ে রাখতে হয়।
ওদের দোষ যতই থাকুক, একটা গুণ বেশ তারিফ করার মতো। ওরা দুজনেই খুব অনেস্ট। দরকার হলে চেয়ে নেবে, কিন্তু লুকিয়ে ক্যাশবাক্সে হাত ঢোকাবে না।
পরের টেস্টটার জন্যে আমি ‘সুপার ইলেকট্রনিক্স’-কে বেছে নিলাম।
কিন্তু তার আগে থিয়োরিটা শেষবারের মতো খতিয়ে দেখার জন্যে আমি একজন সরল পণ্ডিত মানুষের খোঁজ করে চললাম। কারণ, একটা আউটডোর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করার আগে ব্যাপারটা সম্পর্কে কিছু এক্সপার্ট কমেন্টস দরকার। আর সেই এক্সপার্টকে হতে হবে সরল—যাতে আমার কথায় তিনি সন্দেহ না করে বসেন। এবং পণ্ডিত—যাতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মতামতে কোনও ভেজাল না থাকে।
অনেক খোঁজখবর করে আমার পাড়ার বন্ধু সুবীরের এক জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হল। ভদ্রলোকের নাম মণিমোহন সরখেল। ফিজিক্সের রিটায়ার্ড প্রফেসর। প্রেসিডেন্সির ছাত্র ছিলেন। পরে সেখানেই অধ্যাপক। তারপর আমেরিকায় চলে যান। বহুবছর ক্যালটেক-এ ছিলেন, আর তিনবছর স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে। মানে, সিভি যাকে বলে ব্যাপক ঘ্যাম।
একদিন বিকেলে সুবীর আমাকে প্রফেসর সরখেলের কাছে নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘জেঠু আমার ছোটবেলাকার বন্ধু, দেবু—দেবদত্ত রায়চৌধুরী। ও খুব নামকরা ইয়ে…’ মাঝপথে আটকে গিয়ে সুবীর আমার দিকে তাকাল: ‘কী বলে যেন তুই নিজের পরিচয় দিস?’
আমি লজ্জা পেয়ে গিয়ে চোখ নামিয়ে বললাম, ‘ওই ইনভেন্টর…মানে, বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় মজা করে বলি আর কী!’
প্রফেসর সরখেল ভুরু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে গোরিলার ঢঙে আমার দিকে তাকালেন, ‘ইনভেন্টর? অ। তা কী নিয়ে পড়াশোনা করেছ?’
ব্যস, শুরু হল তাঁর হামানছেঁচা জেরা। একেবারে সি. বি. আই.-এর বাবা। আমি কোত্থেকে পাশ করেছি। কতদূর লেখাপড়া করেছি। কী নিয়ে গবেষণা করেছি। কোন-কোন জার্নালে রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছি। ফরেনে গেছি কিনা। এবং, সবশেষে, এ পর্যন্ত আমি কী-কী ইনভেন্ট করেছি।
ওঁর প্রশ্নের ধাক্কায় আমি ক্রমশ কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। নির্বিঘ্নে আমার সব প্রশ্নের উত্তর এই মানুষটার কাছ থেকে বের করতে পারব তো? নাকি এই বৃদ্ধই আমার পেট থেকে সব মতলব টেনে বের করে চারদিকে ছড়িয়ে ছত্রখান করে দেবেন?
আমি বৃদ্ধ বাঘা বিজ্ঞানীটিকে হাঁ করে দেখছিলাম।
ফরসা মোটাসোটা গাবলু চেহারা। মাথায় টাক, তাকে ঘিরে বাউন্ডারি ওয়ালের ঢঙে ধবধবে সাদা চুল। গালে খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। চশমার কাচের ওপরে সাদা ভুরুর ঝালর উঁকি মারছে। দু-দিকের গাল বার্ধক্যের ভারে ঝুলে পড়েছে। গায়ে সাদা ফতুয়া, পায়ে পাজামা।
প্রফেসর সরখেল একটা মোটা বাঁধানো বইয়ের পৃষ্ঠা খুলে হাতে ধরে ছিলেন। আমাকে জেরা করার কাজ শেষ হতে বইটা শব্দ করে সামনের টেবিলে রাখলেন। একটা ‘হুম’ শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে সরাসরি আমার দিকে তাকালেন: ‘বলো, কী বলবে?’
আমি কয়েকবার ঢোক গিলে বললাম, ‘লাস্ট দু-চারবছর ধরে আমি একটা টাইম মেশিন ইনভেন্ট করার কথা ভাবছি। আমার কনসেপ্টগুলো…।’
ধীরে-ধীরে আমার আইডিয়ার নিরীহ অংশগুলো ওঁকে বললাম।
সুবীর একফাঁকে অন্দরে চলে গিয়েছিল। বোধহয় চা-বিস্কুটের বন্দোবস্ত করতে। কারণ, ও ফিরে আসার একটু পরেই এটি অল্পবয়েসি মেয়ে আমাদের তিনজনের জন্যে চা ইত্যাদি টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেল।
আমার সব কথা মন দিয়ে শোনার পর প্রফেসর সরখেল কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন। তারপর চোখ খুলে চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসালেন। চায়ের কাপে শব্দ করে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘তোমার ব্যাপারটা আসলে টেলিট্রান্সপোর্টেশান অফ ম্যাটার। মানে, আই মিন, কোনও একটা জিনিসকে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় পাঠানো। মানে, ম্যাটারকে যেভাবেই হোক এনার্জিতে কনভার্ট করতে হবে। তারপর সেই এনার্জিকে লাইটের ভেলোসিটিতে আর-এক জায়গায় পাঠাতে হবে। সেখানে পৌঁছনোর পর সেই এনার্জিকে, আই মিন, রিকনভার্ট করতে হবে ম্যাটারে। আর পুরো ট্রান্সপোর্টেশানটাই তোমার হবে গিয়ে হাইপারস্পেস দিয়ে…।’
সুবীর অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘জিনিসটা ভ্যানিশ হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসবে?’
