টাইম স্কেলে আমার মেশিনটা সরাসরি পেছনদিকে যেতে পারে না। মানে, অতীতে যাওয়ার ব্যাপারে ওটার কিছু রেসট্রিকশান আছে। যেমন, ধরা যাক, আমি পাস্ট-এ যেতে চাই। যদি আমি পাঁচবছর আগের একটা সময়ে কোনও পারটিকুলার লোকেশানে হাজির হতে চাই, তা হলে সেই সময়ে আমি সেখানে ঠিক যে-অবস্থায় ছিলাম সেই অবস্থায় তৈরি হয়ে মেশিনটা অপারেট করলে তবেই মেশিনটা আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে। মানে, আমার সবকিছুই সেই পাঁচবছর আগেকার মতো হুবহু এক হতে হবে—এমনকী পোশাক-আশাকও। যাকে বলে জেরক্স কপি। তা না হলে মেশিনটা এলসিডি প্যানেলে ‘মিসম্যাচ ফেলিয়োর’ এরার মেসেজ দেখিয়ে দেবে।
সোজা কথায়, একমাত্র বয়েসটাকে মেশিনটা মিসম্যাচ এরার বলে ধরে না। বাকিগুলোকে ধরে।
এই সমস্যাটির কারণ হল স্পেস-টাইম। অর্থাৎ, অতীতকে কখনও কেউ পালটাতে পারে না। একই বস্তু একই সময়ে দু-জায়গায় থাকতে পারে না।
‘আ সিঙ্গল অবজেক্ট ক্যান নট ফিজিক্যালি একজিস্ট অ্যাট টু ডিফারেন্ট প্লেসেস অ্যাট দ্য সেম টাইম। দ্য অবজেক্ট, ইফ সাবজেক্টেড টু টাইম ট্রাভেল ইন দ্য পাস্ট, উইল অলওয়েজ রিপ্লে ইটস রোল—অফ কোর্স ইগনোরিং দ্য এজিং ফ্যাক্টর—ফ্ললেসলি। আদারওয়াইজ ইট উইল অলওয়েজ কাম আপ উইথ দ্য এরার মেসেজ ”মিসম্যাচ ফেলিয়োর”।’
মেশিনটা তৈরি এবং আবিষ্কারের ধাপগুলো নিয়ে আমি যেবিশাল থিসিস তৈরি করেছি, তারই একটা অংশ আপনাদের মুখস্থ শোনালাম। আমি এর নাম দিয়েছি টাইম মেশিনের ‘একজিস্টেন্স প্যারাডক্স’।
মেশিনটা নিয়ে আমার কয়েকটা ‘স্পেশাল’ কাজ সারা হয়ে গেলেই আমি এই আবিষ্কারটার কথা রীতিমতো ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সারা পৃথিবীকে জানাব। তখন আমার থিসিসটাও পাবলিশ করে সারা পৃথিবীর সায়েন্টিস্টদের চমকে দেব। এবং ভারতমাতার মুখ উজ্জ্বল করব।
‘অতীত’ নিয়ে মেশিনটার এই প্রবলেম থাকলেও ‘ভবিষ্যৎ’ বেশ উজ্জ্বল। যদি মেশিনটার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমি নিজে ভবিষ্যতে চলে যাই তা হলে ‘বর্তমান’ থেকে আমি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাব এবং আমার ডায়াল সেট করা জায়গায় আমার ‘আবির্ভাব’ ঘটবে। সেখানে যতক্ষণ খুশি আমি থাকতে পারি—কিন্তু সেই সময়টুকু মেশিনটার কাছে আমাকে দেখা যাবে না। আবার যখন আমি ফিরে আসব তখন আমাকে মেশিনটার প্ল্যাটফর্মের ওপরে হঠাৎ করে ‘আর্বিভূত’ হতে দেখা যাবে।
সোজা কথায়, সময়ের একমুখী গতিকে কিছুতেই থামানো যাবে না, বদলানো যাবে না।
এই ‘একজিস্টেন্স প্যারাডক্স’ নিয়ে আগের বিজ্ঞানীরা ভাবেননি।
ভাগ্যিস ভাবেননি! ভাবলে আমার কপালে এই কৃতিত্ব আর জুটত না।
জিনিয়ার কাছ থেকে বরফের মতো ‘উষ্ণ’ অভ্যর্থনা পেয়ে আমি কিন্তু মোটেই দমে গেলাম না। বরং একটা জেদ চেপে গেল মনে। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে চলে গেলাম একতলার গ্যারাজে—মানে, আমার ল্যাবরেটরিতে। আমার ‘মহান’ আবিষ্কারের দিকে তাকিয়ে আমার আবেগ এবং ইগো একেবারে উথলে উঠল।
ওই তো নীল রঙের বাক্সটা! আমার বিলাভেড ইনভেনশান! ওর কেরামতি দেখিয়ে আমি কি জিনিয়াকে চমকে দিতে পারি না? ওর তাচ্ছিল্য আর উপেক্ষার মুখের মতো জবাব দিতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি।
একটা আওয়ারা বেড়াল প্রায় বছরতিনেক ধরে আমাদের বাড়িতে ঘোরাঘুরি করে। জিনিয়া সবসময় ওকে খেতে-টেতে দেয়, লালনপালন করে। আমিও ওকে মাঝে-মাঝে আদর-টাদর করি। তার কারণ, আমার ডিফারেন্ট এক্সপেরিমেন্টের ও-ই হচ্ছে একমাত্র অ্যাভেইলেবল ‘গিনিপিগ’। তাই ওকে আমি ‘গিনিপিগ’ বলেই ডাকি। জিনিয়ার মতে ব্যাপারটা ‘বৈজ্ঞানিক আহ্লাদ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। জিনিয়া ওকে আদুরে নাম দিয়েছে ‘মিন্টি’।
এদিক-ওদিক সামান্য খোঁজাখুঁজি করতেই গিনিপিগকে পেয়ে গেলাম। পাঁউরুটির টুকরো দেখিয়ে ‘আ-আ-তু-তু’ করে ওকে গ্যারাজে নিয়ে এলাম। তারপর টাইম মেশিনের প্ল্যাটফর্মটা ভাঁজ খুলে পেতে দিলাম। গিনিপিগকে তার ওপরে দাঁড় করিয়ে মেশিনের সুইচ অন করে দিলাম। গিনিপিগ ‘মিঁউ-মিঁউ’ করতে লাগল।
আমি ডায়াল সেট করলাম, কিবোর্ডে ঠকাঠক বোতাম ঠুকলাম, নব ঘোরালাম, এবং ঠকাস করে ‘এন্টার’ বাটন টিপে দিলাম।
চোখের পলকে—বিশ্বাস করুন—চোখের পলকে গিনিপিগ উধাও হয়ে গেল। ওর ‘মিঁউ-মিঁউ’-র সুইচ কেউ যেন আচমকা অফ করে দিল।
সঙ্গে-সঙ্গে দোতলা থেকে জিনিয়ার চিৎকার শুনতে পেলাম। গিনিপিগকে হঠাৎ শূন্য থেকে হাজির হতে দেখে ও ভয়ে চিৎকার করে উঠেছে।
আমি দুদ্দাড় করে দোতলায় ছুটলাম।
ড্রইং-ডাইনিং-এ ঢুকে দেখি জিনিয়ার টিভি দেখা মাথায় উঠেছে। ও সোফা ছেড়ে উঠে ঝুঁকে পড়েছে আহ্লাদী গিনিপগের ওপরে। অবাক হয়ে কাতর গলায় বলছে, ‘ও মা, মিন্টিসোনা! তুই এখানে কী করে এলি?’
আমি বেশ গর্বের সঙ্গে বললাম, ‘আমি পাঠিয়েছি—।’
‘কী? এইটুকু বেড়ালকে তুমি একতলা থেকে দোতলায় ছুড়ে দিলে!’
আমি তাড়াতাড়ি হাত-পা নেড়ে ওকে আশ্বাস দিয়ে বলে উঠলাম, ‘না, না—ছুড়িনি, ছুড়িনি। আমার টাইম মেশিন ওকে এখানে পাঠিয়েছে। এক্ষুনি ও আবার চলেও যাবে—নীচের গ্যারাজে…।’
‘তুমি ওকে…তুমি ওকে…।’ জিনিয়া রেগে-টেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।
কিন্তু তার আগেই গিনিপিগ ভ্যানিশ হয়ে গেল। আমি ওকে দু-মিনিটের জন্যে ফিউচারে পাঠিয়েছিলাম।
