ইলার মাথায় হাত বুলিয়ে বিজন বলল, ভয় পেয়ো না, ইলু সোনা। আমরা দুজনে মিলে এইমাত্র এই শতাব্দীর নিখুঁততম খুন এক্সিকিউট করেছি। ডাক্তার অমিত সান্যালকে হার্ট ফেলিয়োর কেস বলেই রায় দেবে, তাই না?
ইলা বিজনের বুক থেকে মুখ তুলল: তুমি এখন চলে যাও, নয়তো বিপদে পড়বে। আমি এদিকে ডাক্তার ডেকে ব্যাপারটার একটা শেষ ফয়সালা করে ফেলি।
হ্যাঁ, যাচ্ছি।—বলে বিজন সোফায় বসল: এই তিনদিন একটা বন্ধ ফ্ল্যাটে কাটাতে আমার ভীষণ বোর লেগেছে। অবশ্য তুমি যে রান্নাঘরে খাবারের স্টক রেখে যাবে, সেটা জানতাম।
ইলা হাসল: জানো, যখন তুমি শুধু জল খেয়ে পড়ে গিয়ে অভিনয় করতে শুরু করলে, তখন অমিত ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
তা তো পাবেই। তবে আমি একটু ওভারঅ্যাকটিং করে ফেলেছি।
বিজন সেন এবার ওর পকেট থেকে একটি ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশান সার্টিফিকেট বার করে ইলার দিকে এগিয়ে দিল: এই নাও, তোমার হতভাগা প্রথম স্বামীর কাগজখানা ফেরত নাও। কে জানত ছ’বছর আগে যে প্রাণকান্ত সমাদ্দার মারা গেছে, তার সঙ্গে তোমার বিয়ের কাগজখানা এতদিন পরে হঠাৎ কাজে লাগবে! তবে ইলা, আমাদের একসঙ্গে তোলা এই ফটোখানা কিন্তু আমি ফেরত দিচ্ছি না।—বলে বিজন সেটা ইলাকে দেখাল।
রেখে দাও, কোনও ক্ষতি নেই। কিন্তু ওই ফটোটাকে প্রাণকান্ত আর আমার বলে চালাতে কে শিখিয়ে দিয়েছিল, স্যার?
হেসে ইলাকে কাছে টেনে নিল বিজন। ওর গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, অমিত সান্যাল একটি গর্দভ। তোমার নতুন প্রেমিকের খোঁজ ও রাখেনি।
ছলাবউ কলাবউ
সত্যি বলছি স্যার, বউটা আমার যাকে বলে একেবারে স্পেশাল ছিল। ‘ছিল’ মানে পাস্ট টেন্স। আমাদের ভগবান লোকটা বড় মজার। একদিনের মধ্যে আমার ডাগর সোমত্ত বউটাকে প্রেজেন্ট টেন্স থেকে পাস্ট টেন্স করে দিল। কী বললেন? না, স্যার—সত্যি বলছি—আপন গড, ঋতুপর্ণাকে আমি খুন তো দূরের কথা, ছুঁইনি পর্যন্ত। ছুঁইনি মানে ক্ষতি করার জন্যে ছুঁইনি। ওই আদর-টাদর করার সময় ছুঁতে হয়েছে। না ছুঁয়ে আবার আদর করা যায় না কি!
দুঃখের কথা কী জানেন? বউটা স্বর্গলোকে গিয়েও আমাকে রেহাই দিল না। ওর জন্যেই আমাকে আপনাদের এই থানায় আসতে হল—থানা দেখতে হল, আবার শ্মশানও দেখতে হবে। সবই আমার কপাল!
ঋতুপর্ণা ছিল ভারি অদ্ভুত। প্রবল ঋতুমতী। পুরুষগুলো বোধহয় ওর গন্ধ পেত। সবসময় ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করত। তবে ও বেশিরভাগ সময়েই লোকগুলোকে পাত্তা দিত না। অবশ্য ওদের একেবারে বিদেয় করতেও চাইত না। কারণ, ওরা চলে গেলেই তো ঋতুর বাজারদর পড়ে যাবে।
যখন ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হয় তখন আমাদের মা-বাবা আত্মীয়-স্বজন সবাই ভেবেছিল, কোষ্ঠীর ছকের কী দারুণ মিল। বিয়ে তো নয়, যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। বিয়ের পরে-পরেই আমার বিধবা পিসিমা ঋতুকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে বলেছিল, আহা, বউ তো নয়, কলাবউ!
শুনে আমি তো স্যার বেশ তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। দুগগাপুজোর সময় কলাবউ দেখে আসছি সেই বাচ্চা-বয়েস থেকে। তা কলাবউ বলতে লালপেড়ে সাদা শাড়ি আর একহাত ঘোমটা—শুধু এইটুকুই বুঝি। কাপড় খুললে তো স্রেফ কলাগাছ! ঋতুর সঙ্গে কলাবউয়ের মিলটা কোথায় কে জানে!
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে-সঙ্গে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছি ঋতুপর্ণা কী জিনিস। সত্যি, আমার পিসিমা জ্যোতিষী ছিলেন, স্যার। ঋতু তো শুধু কলাবউ ছিল না—একেবারে ছলাবউ কলাবউ। এত ছলাকলা জানে—মানে, জানত। ওরও সেই আধহাত ঘোমটা দেওয়ার অভ্যেস ছিল—গুরুজন বা বাইরের লোকের সামনে—ঠিক যেন কলাবউ। কিন্তু ওই ঋতুই আবার আধহাত ঘোমটার নীচে সাতহাত খ্যামটা নাচত। আর কাপড় খুললে কলাবউয়ের মতো শুধু কলাগাছ তো নয়, একজোড়া মোচা তার সঙ্গে ফ্রি।
তবে ওই মোচাই সার—কলাটলা কখনও হয়নি। সে ওর জন্যে, না আমার জন্যে, তা জানি না। আমার কলাবউ নামেই কলাবউ—ফলের বেলায় কাঁচকলা। কিন্তু স্যার তা নিয়ে কোনও দুঃখ ছিল না আমার। শুধু মাথার ভেতরে মাঝে-মাঝে আগুন জ্বলে উঠত। ঋতুর কাণ্ডকারখানা দেখতাম, একা-একা ঘরময় ঘুরে বেড়াতাম, আর মাথার ভেতর দুনিয়াটা চড়চড় করে জ্বলত, পুড়ত।
এই করে স্যার দশটা বচ্ছর কাটল—দশটা বচ্ছর! আমি অফিস যাই, ফিরে আসি। ঋতু ওর বন্ধুবান্ধব নিয়ে থাকে, আমাকে যেন স্পষ্ট করে দেখতেই পায় না। শুধু মাঝে-মাঝে মাঝরাতে কলাগাছে জ্বালা ধরলে আমার হাত ধরে টানাটানি করে, আঁচড়ে-কামড়ে দেয়। শাস্ত্র আমাদের মিথ্যে বলেনি, ইন্সপেক্টরসাহেব। ঋতু ছিল একেবারে হস্তিনী টাইপের। আর হাতির সঙ্গে কলাগাছের রিলেশান তো সব্বাই জানে।
তো একদিন—তা কতদিন হবে? বোধহয় বছরখানেক আগে—ঋতু বাড়ি ফিরল টিপসি হয়ে। আমি দরজা খুলতেই আমাকে ‘ডার্লিং’ বলে একেবারে জাপটে ধরে ‘চকাৎ’ ‘চকাৎ’ করে হাফডজন চুমু খেল। আমার ভীষণ ঘেন্না করছিল, গা রি-রি করছিল। আর মাথার ভেতরে ধুনিটা তখনও জ্বলছিল।
হঠাৎ করে কী যে হয়ে গেল! সেই ধুনিটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আগুনের লাল জিভগুলো লকলকিয়ে উঠল। এক ধাক্কা দিয়ে ছিটকে দিলাম ঋতুকে। সত্যি বলছি, ইচ্ছে করছিল তক্ষুনি গলা টিপে ওকে খতম করে দিই। কিন্তু না। আমি নির্বিরোধী ছাপোষা মানুষ। কাউকে খুন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, স্যার। যদি আমিই ঋতুকে কাল রাতে খুন করেছি বলে আপনি ভেবে থাকেন, তবে সেদিনই তো ওকে আমি খতম করে দিতে পারতাম। সত্যি বলছি স্যার, খুনের কথা শুনলেই আমার গা গুলিয়ে ওঠে। তাই সেদিন ঋতুকে কিচ্ছু বলিনি। বড়লোকের ইংরেজি-জানা ফুরতি-ফারতা বাঁজা বউ পার্টি-ফার্টি করে একটু-আধটু মাল খেয়ে ফিরবে এ আর আশ্চর্য কী!
