আমি এইবার আসল কথাটা উচ্চারণ করলাম, মিস্টার সমাদ্দার, মোট তিরিশহাজার আছে, দশহাজার টাকা বোনাস। আমাদের আপনি মুক্তি দিন।
প্রাণকান্ত কাঠ হয়ে বসেই রইল। লম্বা জিভটা বের করে শুকনো ঠোঁটে একবার বুলিয়ে নিল।
ইলা, মিস্টার সমাদ্দারের বোধহয় গলা শুকিয়ে গেছে।
ইলা বুঝল আমার ইঙ্গিত। ও চট করে রান্নাঘরে চলে গেল।
একটু পরে ও যখন জলভরা গ্লাসটা এনে সমাদ্দারের সামনে ধরল, সমাদ্দার স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো যান্ত্রিকভাবে গ্লাসটা নিয়ে পুরো জলটাই খেয়ে নিল। ওর স্বচ্ছ দৃষ্টি তখনও ওই টাকার স্তূপের দিকে।
বিপর্যয় ঘটল কয়েকসেকেন্ড পরেই।
প্রাণকান্ত মেঝেতে উলটে পড়ল। তারপর শুরু হল ওর ছটফটানি। দু-হাতে গলা খামচে ধরে সমাদ্দারের দেহটা ওলটপালট খেতে লাগল।
সেই মুহূর্তে শুরু হল আমার আর ইলার কাজ।
এক: দেওয়াল-ঘড়ির কাঁটা ঠিক করলাম।
দুই: নোটের বান্ডলগুলো আবার সিন্দুকে ঢুকিয়ে চাবি দিয়ে সিন্দুকের দরজা বন্ধ করে দিলাম।
তিন: ইলা রান্নাঘর থেকে আরও কিছুটা মারকিউরিক ক্লোরাইড মেশানো জল নিয়ে এসে টেবিলে রাখা আমার কয়েকটা পাণ্ডুলিপির ওপর সেই জল ছিটিয়ে দিয়ে বাকি জল টেবিলে ঢেলে দিল।
চার: প্রাণকান্তর জল খাওয়া গ্লাসটা রুমালে ধরে টেবিল থেকে তুলে মেঝেয় ফেলে দিলাম। গ্লাসট সশব্দে ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে গেল।
প্রাণকান্তর অবস্থা তখন ভয়ংকর। দু-হাতে ও হাওয়া আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। দেহটা ক্ষণে-ক্ষণেই খিঁচুনি মেরে কেঁপে উঠছে। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে সাদা গ্যাঁজলা। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে।
শেষ মুহূর্তের প্রতীক্ষায় বিষাক্ত প্রাণকান্তকে রেখে আমি আর ইলা চটপট ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে এলাম (তার আগেই নকল চাবিটা প্রাণকান্তর পকেটে গুঁজে দিয়েছি)। দরজায় চাবি দিয়ে সকলের চোখ এড়িয়ে আমরা এগিয়ে চললাম সিঁড়ির দিকে।
আমার উত্তেজিত হৃৎপিণ্ড তখন আতঙ্কে ধুকপুক করছে। উত্তেজনা কমানোর জন্যে পকেট থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে মুখে পুরে দিলাম। নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হল। বেশি বয়েসে এত ঝক্কি পোয়ানো বোধহয় ঠিক হয়নি। সামনের রোববারের কথা ভেবে নাড়িভুঁড়ি যেন উলটে এল। নাঃ, অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রাণকান্তর বরফশীল বিকৃত মৃতদেহটা আমাদেরই আবিষ্কার করতে হবে।
ইলার দিকে একবার তাকালাম। ও কী ভাবছে, কে জানে! কিন্তু ওর মুখে আতঙ্কের লেশমাত্র ছায়াও কাঁপতে দেখলাম না।
রবিবার দিন অফিসের দেওয়াল-ঘড়ির সময় শুধরে যখন বাড়ির কাছে পৌঁছলাম, হাতঘড়িতে (এখন ঘড়ি ঠিক সময় দেখাচ্ছে) তখন রাত আটটা। অফিসে গিয়ে সমর ফেরেনি দেখে আরও নিশ্চিন্ত হয়েছি। কারণ, আমার চেম্বারের দুটো চাবির একটা থাকে আমার কাছে, আর অন্যটি থাকে সমরের কাছে। সুতরাং ঘড়ির কারসাজি যে কেউ ধরে ফেলেছে এমন সম্ভাবনা নেই।
লিফটে উঠতে-উঠতে পাশে দাঁড়ানো ইলার দিকে তাকালাম। কী আশ্চর্য! ওর এতটুকু ভয়ডর নেই? সুখের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে ওর চোখে-মুখে।
ইলা, দরজা কি আমিই খুলব—?—ওকে জিগ্যেস করলাম। মনে ক্ষীণ আশা, যদি ও দরজা খুলতে রাজি হয়।
কেন, তোমার কি ভয় করছে?—ব্যঙ্গের সুরে জানতে চাইল ইলা।
এ কোন নতুন ইলা? একটু অবাক হলাম।
যতই লিফট উঠছে দুদ্দাড় করে বেতালা ছুটে চলেছে হৃৎপিণ্ড। কখনও কি থামবে না এর অশান্ত গতি? নাকি ট্যাবলেট খেয়ে নেব একটা?
লিফট থামতে দুজনে করিডরে পা রাখলাম। পকেট হাতড়ে ফ্ল্যাটের চাবি বের করে বাগিয়ে ধরলাম। করিডরের আলো সোজা গিয়ে পড়েছে আমাদের ফ্ল্যাটের দরজায়।
চাবি ঢোকাতে গিয়ে অবাধ্য ডানহাত বারকয়েক কেঁপে গেল। আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে ইলা। দরজায় ওর ছায়া এসে পড়েছে।
কী হল, খোলো?—পেছন থেকে ইলার অধৈর্য স্বর ভেসে এল। কোনওরকমে চাবি ঘোরালাম। খট করে লকটা সরে গেল।
হাতের চাপে ধীরে-ধীরে খুলতে শুরু করল সেগুন কাঠের বার্নিশ করা দরজা।
ভেতরটা কালো অন্ধকার।
দরজা যতই খুলছে, করিডরের আলোর ফলা ততই চওড়া হচ্ছে ঘরের ভেতরে।
দরজা পুরোটা খুলতেই যে-দৃশ্য দেখলাম তাতে…।
অন্ধকার ঘরের আলোছায়ায় পড়ে রয়েছে প্রাণকান্ত। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে ওর দেহটা। দু-চোখ বিস্ফারিত। ধীরে-ধীরে ও উঠে দাঁড়াল। দু-হাতের দশ আঙুল শকুনের নখের মতো বাঁকিয়ে ঘৃণাভরে কুটিল চোখ নিয়ে টলতে-টলতে ও এগিয়ে আসতে লাগল আমার দিকে। নিষ্ফল আক্রোশে হাওয়া আঁকড়ে ধরছে ওর হাত। জীবন্ত শীতল মৃতদেহের মতো অনিশ্চিত পদক্ষেপে ও এগিয়ে আসছে। এগিয়ে আসছে রক্তপিপাসায়। কাছে—আরও কাছে…।
বুকের খাঁচায় হৃৎপিণ্ডটা ভীষণভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। লাফিয়ে উঠল গলা দিয়ে। মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছেয় শেষবারের মতো উন্মাদ হয়ে এসে আঘাত করল টাকরয়।
সেই মুহূর্তে পেছন থেকে এক প্রচণ্ড ধাক্কা দিল কেউ। হুমড়ি খেয়ে ছিটকে গেলাম প্রাণকান্তর আওতায়। ওর বাঁকানো নখসুদ্ধ দশ আঙুল আঁকড়ে ধরল আমার গলা…।
পুরো ব্যাপারটার একটা যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা ভেবে ওঠার আগেই আমার রক্তাক্ত হৃৎপিণ্ডটা যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসে বাইরে ছিটকে পড়ল। তারপর নিশ্চল হয়ে পড়ে রইল মেঝেতে।
অন্ধকার ঘরের ভেতর অমিত সান্যালের প্রাণহীন দেহটা লুটিয়ে পড়তেই ইলা ঘরের দরজা বন্ধ করে আলো জ্বেলে দিল। তারপর কাছে এগিয়ে গিয়ে প্রাণকান্তর প্রসারিত হাতের বাঁধনে ধরা দিল: বিজন—বিজন!
