বিক্রম তখন মুখে পেশাদার হাসি ফুটিয়ে বলে চলেছেন, ‘রঙ্গিলা আমাদের কোম্পানির সুপারব্রেন। ওর ম্যাজিকে আমাদের সেলস ফিগার এক্সপোনেনশিয়ালি বেড়ে চলেছে…।’
কেন জানি না, বারবার ‘সেলস ফিগার’ কথাটা শুনতে-শুনতে আমার রঙ্গিলার ফিগারের দিকে নজর গেল। সবুজ ছক-কাটা চুড়িদারে ওকে সুন্দর মানিয়েছে। গাঢ় সবুজ ওড়নাটা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই—অনেকটা পাশে সরে আছে। তাই বোঝা গেল, ওর কাঠামো ছিপছিপে হলেও ও বেশ ফলন্ত গাছ। তবে ওর আকর্ষণের মধ্যে কোথায় যেন একটা সাবধানী শাসন রয়েছে।
সবমিলিয়ে যেটা বুঝলাম, রঙ্গিলা শর্মা আর-পাঁচটা মেয়ের মতো নয়।
আমার ধারণা যে কতটা সত্যি সেটা বুঝলাম আরও মাস-দেড়েক পর। কারণ, এর মধ্যে রঙ্গিলার সঙ্গে আমার অল্পবিস্তর বন্ধুত্ব হয়েছে। কাজের ফাঁকে সময় পেলেই আমি ওর ঘরে গিয়ে হাজির হই। নতুন-নতুন বইয়ের পাবলিকেশান প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনা করি। ও চাবুকের মতো সব পরামর্শ দেয়, নানান বুদ্ধি দেয়, ইউনিক সব স্কিমের কথা বলে। তিরিশ বছরের একটা মেয়ের মুখ থেকে এসব শুনে আর কোনও সন্দেহ থাকে না যে, ও এক অদ্ভুত টাইপের জিনিয়াস।
ওর এই রহস্য আমাকে টানতে থাকে। কিন্তু ওর ব্যবহার দেখে সেরকম কোনও টান আমি টের পেতাম না।
রঙ্গিলা কোম্পানির প্রোডাকশন আর ডিস্ট্রিবিউশান ছাড়াও সেলস-এর অনেকটাই দেখাশোনা করে। কোন বই কত প্রিন্ট রান দেওয়া হবে, কোন-কোন বই দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালুরু এইসব মেজর সিটির কোথায়-কোথায় কত কপি করে পাঠাতে হবে, কোন টাইটেল-এর আনসোল্ড কপি রিটার্ন নেওয়া হবে—কোনটার হবে না—সবই রঙ্গিলা শর্মা ঠিক করে দেয়। বলতে গেলে কোম্পানিতে রঙ্গিলাই যেন শেষ কথা।
কানাঘুষোয় শুনলাম, এ নিয়ে বিক্রম ভট্টাচার্যের বেশ ক্ষোভ আছে। কিন্তু ভদ্রলোক কাজপাগল পেশাদার মানুষ। কোম্পানির জন্যে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। কোম্পানিকে বড় করে তেলার পেছনে ওঁর অনেক অবদান আছে। পনেরো বছর ‘ইয়োর বুকস’-এ আছেন। সেখানে রঙ্গিলা শর্মা মাত্র চারবছর।
কিন্তু মামুলি মেধার মানুষ আর জিনিয়াসের মধ্যে এটাই তো ফারাক!
রঙ্গিলা সারাটা দিন ওর কাচের দেওয়াল ঘেরা অফিসে বসে অঙ্ক কষে, ল্যাপটপে ঠকাঠক করে বোতাম টেপে, চোখের চশমাটাকে বারবার ঠেলে নাকের গোড়ায় তোলে। তারপর…সারাদিনের পরিশ্রমের পর হাসিমুখে ঘরের বাইরে বেরোয়। সারকুলেশান ম্যানেজার আশুতোষ শিভালকরের কাছে গিয়ে বলে, ”হান্ড্রেড অ্যান্ড ওয়ান গোস্ট স্টোরিজ” টাইটেলটা মুম্বাই আউটলেটে দু-হাজার কপি পাঠান। আর কবিতা ভার্গবের ”ফেমাস পিপল, ফেমাস ড্রিমস” হায়দ্রাবাদে যত আনসোল্ড কপি আছে—আপনি বলছিলেন বারোশো মতন—ওটা ইমিডিয়েটলি ব্যাঙ্গালুরুতে পাঠিয়ে দিন। ও. কে.?’
‘ও. কে.।’ শিভালকরের মুখ দেখে বোঝা যায় যে, তিনি খুশি হননি। কিন্তু ‘ইয়োর বুকস’-এ এসব ব্যাপারে রঙ্গিলা শর্মাই শেষ কথা।
আর আমি এটাও জানি, শেষ পর্যন্ত রঙ্গিলাই জিতবে। খুব কম সময়ের মধ্যেই মুম্বই আর ব্যাঙ্গালুরুর পাঠকরা ওই বই দুটোকে শুষে নেবে।
একদিন আমি শিভালকরের ঘরে ছিলাম। আমাদের নতুন তিনটে টাইটেল কেমন বাজার পাচ্ছে সে-সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। কথা শেষ করে উঠতে যাব হঠাৎই রঙ্গিলা ঘরে এসে ওর চমকে দেওয়া তিনটে সিদ্ধান্ত জানিয়ে গেল।
শিভালকর ব্যাজার মুখে ‘থ্যাংকু ইউ’ বলল।
রঙ্গিলা ঘরের বাইরে বেরোতেই আমিও বেরিয়ে এলাম। অফিসের করিডরে ওর পাশাপাশি হাঁটতে-হাঁটতে বললাম, ‘আপনি কি ম্যাজিক জানেন?’
ছোট্ট হেসে একঝলক তাকাল আমার দিকে: ‘ম্যাজিক নয়। ম্যাথামেটিক্স। ম্যাথামেটিক্স অফ ইভেন্ট স্পেকুলেশান।’
‘ইভেন্ট স্পেকুলেশান?’
‘হ্যাঁ। টাইম অ্যান্ড স্পেসে দুটো ইভেন্টকে একই কো-অর্ডিনেটে রাখতে পারলে আপনি যা চান তাই হবে। মানে, একটা ছেলে আর একটা মেয়ের দেখা হতে পারে। দুটো গাড়ির অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। একজন পাঠক একটা বই কিনে ফেলতে পারে…ব্যস…সিম্পল।’
‘এর নাম সিম্পল?’
কথা বলতে-বলতে আমরা রঙ্গিলার চেম্বারে চলে এলাম।
ও চেয়ারে বসল। আমাকেও বসতে বলল। চোখ থেকে চশমাটা খুলে সরাসরি তাকাল আমার দিকে: ‘দেখুন, ব্যাপারটা হয়তো আপনার কাছে সিম্পল নয়, তবে আমাকে লাস্ট পাঁচবছর অনেক কমপ্লেক্স ক্যালকুলেশান করতে হয়েছে—তারপর ব্যাপারটা আমার কাছে সিম্পল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা অন্য কাউকে এক্সপ্লেইন করে বোঝানো বেশ কঠিন। তবে এর এসেন্স হল, ওই যে বললাম, ম্যাথামেটিক্স অফ ইভেন্ট স্পেকুলেশান…।’
‘এসব তো সায়েন্স ফিকশানের মতো শোনাচ্ছে।’
‘মতো কেন? এটা সত্যি-সত্যি সায়েন্স ফিকশান।’ ও মুচকি হেসে বলল।
বুঝলাম, এর বেশি ও খুলে বলবে না। আর বলবেই বা কেন? এটা তো ওর স্পেশাল সিক্রেট।
কিন্তু আমার কৌতূহল বেড়েই চলল। রঙ্গিলার মন্ত্রগুপ্তিটা কী? এমন নয় যে, সেটা জেনে আমি আমার প্রমোশনের কাজে লাগাব। তবে কৌতূহলটা সবসময় আমাকে খোঁচাতে লাগল।
কিছুদিন পর আবার একটা ঘটনা ঘটল। রঙ্গিলার সেই সুপারম্যাথের ম্যাজিক। ঠিক জায়গায় ঠিক বইটা ঠিক সময়ে পাঠানো। আমরা প্রায় চারহাজার কপির বোনাস সেল পেলাম। ‘ইয়োর বুকস’-এর সি অ্যান্ড এম-ডি আমেরিকা থেকে রঙ্গিলাকে স্পেশাল ‘কনগ্র্যোচুলেশানস’ নোট পাঠালেন। আমরাও ওকে অভিনন্দন জানালাম। ওর ছোট্ট হাসি দেখে বুঝলাম, এসব সাবাশি নেওয়া ওর অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।
