এসিজি কথা বলতে বলতেই ডান চোখের পুঁতিটা খুঁচিয়ে তুলে চিমটে দিয়ে তার ভেতরটা আরও ভালো করে খোঁচাচ্ছিলেন।
হঠাৎই বেরিয়ে পড়ল হারানো চুনিটা। মেঝেতে ঠিকরে পড়ে কয়েকবার লাফিয়ে তারপর থামল।
ঘরের আলোয় ওটার লাল আভা ছড়িয়ে চিকচিক করতে লাগল।
একটা অস্ফুট শব্দ করে চুনিলালবাবু ছুটে এসে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিলেন লাল টুকটুকে পাথরটা। ওটা শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরে ঘরের সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে চোখ বুজে আবেগ থরথর গলায় বললেন, মা তারা ব্রহ্মময়ী!
তারপর পাথরটা শার্টের বুকপকেটে রেখে এসিজির হাত চেপে ধরলেন? মিস্টার গুপ্ত, আপনি দেবদূত হয়ে আজ আমাকে বাঁচালেন–
এসিজি হেসে বললেন, আমি নয়, আপনাকে বাঁচিয়েছেন রঙ্গলালবাবু। উনি ঠিকই বলেছেন। শ্যামসুন্দরলালবাবু মারা যাওয়ার সময় পেলি না গো, পেলি না গো বলেননি, উনি বলেছিলেন গেলিনাগো গেলিনাগো। কথাটা বাংলা নয় কাদাখোঁচা পাখির বৈজ্ঞানিক নাম। এই দেখুন, এই কার্ডে ইংরেজি আর ল্যাটিন নাম–দুটোই আছে।
সকলে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেল কার্ডে লেখা নাম দুটো? Fantail Snipe (gallinago gallinago)
রঘুপতি যাদব এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানাল এসিজিকে : স্যার, য়ু আর এ জিনিয়াস!
অশোকচন্দ্ৰ নতুন একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, সে শুধু তোমার মতে, রঘুপতি। নাও, এবার চলো–
রঙ্গলাল এসিজির সামনে এসে জোড়হাতে করে দাঁড়ালেন। আকর্ণ হেসে ছন্দে বললেন, প্রাচীন গ্রিসে জ্ঞানী ছিলেন অ্যারিস্টটল । আপনি আরও জ্ঞানী স্টুদে ব্যারিস্টটল।
এসিজি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলেন, ব্যারিস্টটল মানে!
ওই ওয়ার্ডটা আমার ইনভেনশান– মাথা নামিয়ে বিনয়ের হাসি হাসলেন রঙ্গলাল ও কবিতার শেষটা মেলানোর জন্যে ব্যারিস্টার আর অ্যারিস্টটলের সন্ধি করেছি।
আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
চেইন রিয়্যাকশন
‘ইয়োর বুকস’ কোম্পানিতে আমি লাস্ট এপ্রিলে জয়েন করেছি—ওদের এডিটোরিয়াল গ্রুপে,অ্যাসোসিয়েট এডিটর হিসেবে। সেখানেই রঙ্গিলা শর্মার সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।
লম্বা, ছিপছিপে, ঝকঝকে মেয়ে রঙ্গিলা। ওর উজ্জ্বল চোখে ক্ষুরধার দৃষ্টি। সে-চোখে নজর পড়লেই মনে হয়, ও সব গোপন কথা জানে। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছিল।
রঙ্গিলার এমনই টান যে, ওকে দেখলেই সবাই বন্ধুত্ব পাতাতে চায়। কিন্তু অনেকেই ওর দিকে পা বাড়াতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। কারণ, ওর ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধি।
পাবলিশিং ওয়ার্ল্ডে রঙ্গিলা শর্মার নাম সবাই জানে। ও এক অদ্ভুত জাদু জানে—অঙ্কের জাদু। আড়ালে অনেকে বলে, ও সুপারন্যাচারাল ম্যাথামেটিক্যাল জিনিয়াস। তবে ম্যাথ বলতে আমরা যা বুঝি তা নয়। রঙ্গিলার ব্যাপারটা সুপারম্যাথ। এই অঙ্কই বই বিক্রির জাদু ওর হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। সিম্পলি ওর জন্যেই ‘ইয়োর বুকস’ অন্য সব পাবলিশিং কোম্পানিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। পাবলিশিং-এর দুনিয়ায় রঙ্গিলা শর্মা এককথায় এক ইউনিক আইকন।
‘ইয়োর বুকস’-এ চাকরির সুযোগ পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। অন্তত আমার কাছে। এর আগে ছোটামোটা ফিলিম ম্যাগাজিনে সাব-এডিটরের কাজ করেছি। একটা ক্রাইম ম্যাগে সহ-সম্পাদকও ছিলাম। হঠাৎ করে কী খেয়ালে ‘ইয়োর বুকস’-এর ইন্টারভিউটা দিয়েছিলাম—লাক ফ্যাক্টর—চাকরিটা গেঁথে গেল। স্বপ্নের চাকরি। কারণ, কোম্পানিটা মাপে বাড়ছে—ওপরে ওঠার স্কোপ অনেক।
‘ইয়োর বুকস’ লাস্ট দশবছরে যে-ক’টা পেপার-ব্যাক সিরিজ বের করেছে তার সবক’টাই সুপারহিট। কোনওটা ক্লাসিক, কোনওটা ছোটদের, কোনওটা ক্রাইম থ্রিলার, কোনওটা আবার সায়েন্স ফিকশন অ্যাডভেঞ্চার। এই সবক’টা সিরিজ সাকসেসফুল হওয়ার মূলে রঙ্গিলা—আর ওর সুপারম্যাথ। আর তার রেজাল্ট: ‘ইয়োর বুকস’-এর টার্নওভার অন্যান্য পাবলিশিং হাউসকে ঈর্ষার নীল করে দেয়—গাঢ় নীল।
‘ইয়োর বুকস’-এ জয়েন করার পর তৃতীয় দিনেই রঙ্গিলার মুখোমুখি হলাম।
মাঝারি একটা কাচের ঘরে ওর অফিস। টেবিলে তিনটে টেলিফোন, একটা ল্যাপটপ, হাফডজন নানা রঙের পেন, আর দু-থাক ফাইল।
একতাড়া কম্পিউটার প্রিন্ট-আউটের ওপরে ঝুঁকে ছিল ও। ওপরের হেডিং দেখে বুঝলাম, ওগুলো সেলস ফিগার। পরে জেনেছি, সেলস ফিগারেই রঙ্গিলার একমাত্র ইন্টারেস্ট। কারণ, সেলস ফিগারই ওর সুপারম্যাথ অ্যাপ্লিকেশানের র’ ডেটা।
আমাকে ওর ঘরে নিয়ে গেছেন বিক্রম ভট্টাচার্য, কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমাদের দেখেই ও মুখ তুলে তাকাল। ছোট-ছোট লেন্সের শৌখিন চশমাটা চোখ থেকে নামাল। তারপর উঠে দাঁড়াল।
‘আমাদের প্রোডাকশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশান ম্যানেজার—রঙ্গিলা শর্মা।’ বিক্রম আলাপ করিয়ে দিলেন: ‘মিস শর্মা, আমাদের নতুন অ্যাসোসিয়েট এডিটর প্রীতম চৌধুরী।’
চট করে ও হাত বাড়িয়ে দিল। আমরা হাত ঝাঁকালাম। আমি বললাম, ‘আপনার নাম অনেক শুনেছি…।’
‘তাই?’ ও হাসল—ছোট্ট চাপা হাসি। অনেকটা পিঠ চাপড়ানো গোছের।
আমি ওকে দেখছিলাম। চাউনি, শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর ঢং, গলার স্বর—সবকিছু থেকেই ক্ষমতার অদৃশ্য তরঙ্গ ঠিকরে বেরোচ্ছে। এই তিরিশ বছর বয়েসেই ‘ইয়োর বুকস’-এর প্রোডাকশন অ্যান্ড ড্রিস্ট্রিবিউশান ম্যানেজার! হয়তো আর কয়েক বছরের মধ্যেই ও এক্সিকিউটিভ ডায়রেক্টর হয়ে ভিপি-তে পৌঁছে যাবে।