এসিজি এক ফাঁকে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছিলেন আবার। চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সেই লোকটা কেমন করে জানল যে, চুনিটা শ্যামসুন্দরলালবাবুর কাছে আছে?
ঠোঁট উলটে রঘুপতি বলল, কে জানে! হয়তো কারও কাছ থেকে ইনফরমেশান পেয়েছে।
যখন শ্যামসুন্দর মারা যান তখন চুনিলাল কোথায় ছিলেন?
বাড়িতেই। কথাটা বলে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে রঘুপতি কী যেন দেখল। তারপর বলল, স্যার, আমরা লালমহলে এসে গেছি।
বাড়ির সামনে ভাঙাচোরা ট্রাম-রাস্তা। কোথাও কোথাও জল জমে আছে। বাড়ির উলটোদিকে দুটো বিশাল মাপের গোডাউন। তার পিছনেই বোধহয় গঙ্গা।
ড্রাইভারকে গাড়ি পার্ক করতে বলে রঘুপতি এসিজিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, আইয়ে স্যার,–ওয়েলকাম টু লালমহল।
এসিজি প্রাক্তন ছাত্রের ভঙ্গি দেখে সামান্য হাসলেন। তারপর মাথার সাদা চুলে হাত চালিয়ে বললেন, চলো, দেখা যাক তোমার চুনিলালবাবুর চুনি উদ্ধার করা যায় কি না।
কলিংবেল টিপতেই বাড়ির দরজায় একজন বয়স্ক পুরুষ এসে হাজির হলেন। দেখে বনেদি বাড়ির পুরাতন ভৃত্য বলেই মনে হল। রঘুপতি নিজের পরিচয় দিতেই দ্রুত আদর-আপ্যায়ন শুরু হয়ে গেল।
বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে রঘুপতি যাদব নীচু গলায় বলল, ব্যাপারটা লালবাজার পর্যন্ত গড়াত না। তবে চুনিলালবাবুর থোড়াবহত আপার লেভেল কানেকশা আছে। সেইজন্যেই..।
কথা বলতে বলতে ওঁরা চৌকো মাপের বিশাল ঠাকুর-দালানে এসে পড়েছিলেন। তার একপাশে চণ্ডীমণ্ডপ। সেখানে প্রতিমা গড়ার কাজ চলছে। এখন শুধু শেষ তুলির টান আর সাজসজ্জা বাকি।
হঠাৎই ওঁদের সামনে এসে দাঁড়ালেন শ্যামলা রঙের একজন ভদ্রলোক। তার ডান হাতের তিন আঙুলে রুপো দিয়ে বাঁধানো তিনটে পাথরের আংটি। প্রকট হেসে তিনি বললেন, আগমনের খবর পেয়েছি । তাই রিসিভ করতে এসেছি। অধমের নাম রঙ্গলাল / চুনিটা বেপাত্তা হয়েছে। গতকাল।
এসিজি অবাক হয়ে লালমহলের রঙ্গলালবাবুকে দেখছিলেন।
পরনে ফতুয়া গোছের পাঞ্জাবি আর ধুতি। মাথার মাঝখানে সিঁথি। তেল-চকচকে কোঁকড়ানো চুল। ছোট-ছোট চোখ। কপালের বাঁ-দিকে একটা ছোট আঁচিল। নাকটা সামান্য বড় মাপের। দাড়ি গোঁফ কামানো। মুখে প্রসাধনের সুবাস। আর সদাসঙ্গী আকৰ্ণবিস্তৃত হাসি।
শ্যামসুন্দরলালবাবু কোন ঘরে মারা গিয়েছিলেন? রঘুপতি জানতে চাইল।
রঙ্গলাল অতিরিক্ত বিনয় প্রকাশ করে বললেন, দোতলায় পাখি ঘরে / ওই ঘরটার ঠিক ওপরে– আঙুল তুলে দূরের কোণে একটা ঘর দেখালেন তিনি।
এসিজি যে কথাটা মনে-মনে ভাবছিলেন সেটাই মুখে প্রকাশ করলেন, আপনি কি সবসময় ছড়া কেটে কথা বলেন?
রঙ্গলালবাবু মাথা সামান্য নীচু করে বললেন, আমি একজন স্বভাবকবি । কবিতায় কথা বলা আমার হবি।
রঘুপতি যে এই উত্তর শুনে ঠোঁট টিপে হাসল সেটা বৃদ্ধ গোয়েন্দার চোখ এড়াল না।
পুজো এবার দেরিতে। তাই রোদ্দুর পড়ে আসছে তাড়াতাড়ি। উঠোন থেকেও রোদ সরে যাচ্ছে পুবের দিকে।
মাথার ওপরে কয়েকটা পায়রা ঝটপট করছিল। শানবাঁধানো উঠোনে নানা জায়গায় ওদের অপকীর্তির ছাপ।
ওঁরা তিনজনে উঠোন পেরিয়ে এগোলেন দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে। তখনই কোথা থেকে ছুটে এল বছর ন-দশের একটা ছোট্ট মেয়ে। হাঁফাতে-হাঁফাতে রঙ্গলালবাবুকে লক্ষ্য করে বলল, জেঠু, মেজো-জেঠু বলেছে ওঁদের পাখিঘরে নিয়ে বসাতে।
কথাটা বলেই মেয়েটা ছুট্টে চলে গেল।
রঙ্গলালবাবু বললেন, গজেন্দ্রর ছোট মেয়ে। সবসময়
–চলে ধেয়ে। পাদপূরণ করে হেসে উঠলেন এসিজি।
পুরোনো আমলের শানবাঁধানো চওড়া সিঁড়ি। পালিশ করা মেহগনি কাঠের রেলিং। সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এর দেওয়ালে এক অভিজাত পুরুষের তৈলচিত্র। গিল্ট ফ্রেমে বাঁধানো। কে জানে ইনিই হয়তো স্বর্গীয় রবীন্দ্রলাল গোস্বামী।
এসিজি আর রঘুপতি রঙ্গলালকে অনুসরণ করে উঠছিলেন। রঘুপতি চাপা গলায় ওর প্রাক্তন স্যারকে বলল, অজীব ব্যাপার, গুপ্তাসাব। যাঁর নাম চুনিলাল তিনি চুনি, মানে হিরে-জহরতের বেওসা করেন। যার নাম রঙ্গলাল তিনি সবসময় মজাক করে কথা বলেন। তবে যিনি মারা গেছেন…।
রঘুপতি কথায় বাধা দিয়ে অশোকচন্দ্র গুপ্ত বললেন, শ্যামসুন্দরলাল গোস্বামীর নামটা প্রথম থেকেই আমার পিকিউলিয়ার লাগছিল। এরকম নাম কখনও শুনিনি। তবে শ্যামসুন্দর নামে একরকম মুনিয়া পাখি পশ্চিম বাংলার স্থায়ী বাসিন্দা। বেহালার অক্সফোর্ড মিশনের বাগানে এদের বাসা আমি দেখেছি। মাপে চড়ুই পাখির মতো। মাথা কালো, বুক সাদা, বাকি গাঢ় বাদামি রঙের। ইংরেজি নাম ব্ল্যাক হেডেড মুনিয়া,আর ল্যাটিন নাম লোনচুয়া মলাক্কা। সুতরাং শ্যামসুন্দরলালবাবুর শখটাও তার নামের সঙ্গে মিল রেখে।
তা হলে বাকি রইলেন গজেন্দ্রলালবাবু। তিনি কি হাতির ব্যবসা করেন, নাকি হাতির খোঁজখবর রাখা তার শখ?
সামান্য মজা করে বলা রঘুপতি যাদবের কথাটা বোধহয় রঙ্গলালবাবুর কানে গিয়ে থাকবে। কারণ, হঠাৎই তিন-চার ধাপ ওপর থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি বলে উঠলেন, হস্তী নয়– হস্তীদন্ত / গজেন্দ্রর পয়মন্ত।
এসিজি আর রঘুপতি চোখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। গজেন্দ্রলাল তা হলে হাতির দাঁতের ব্যবসা করেন!
গতকালই একজন মানুষের মৃত্যু ঘটে গেছে এ-বাড়িতে। অথচ রঙ্গলালকে দেখে মোটেই মনে হচ্ছে না তেমন কোনও আঘাত পেয়েছেন। তবে বাড়িটাকে কেমন যেন বেশিরকম চুপচাপ মনে হল। শুধু পায়রার বকবকম ওঁদের কানে আসছিল।
