গুপ্তাসাব, ব্যাপারটা ঠিক খুন নয়–তবে অনেকটা খুনের মতো।
গাড়ির জানলার বাইরে চোখ রেখে বিকেলের কলকাতা দেখতে-দেখতে কথাটা বলল ইনস্পেক্টর রঘুপতি যাদব।
ক্যাডবেরি রঙের মারুতি আটশো শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় ছুঁয়ে এগোচ্ছিল বাগবাজারের দিকে। গাড়ির পিছনের সিটে উদ্বিগ্ন মুখে বসেছিল রঘুপতি। ওর পাশেই বসে অধ্যাপক ডক্টর অশোকচন্দ্র গুপ্ত, সংক্ষেপে এসিজি। তার সরু-সরু আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত ডানহিল সিগারেট।
এমনিতে এসিজির প্রিয় উইলস ফিলটার। কিন্তু রঘুপতি কোথা থেকে যেন এক কার্টন ডানহিল জোগাড় করে এসিজিকে উপহার দিয়েছে একটু আগেই। আর সেই সঙ্গে উপহার দিয়েছে একটা সমস্যা–যেটা ঠিক খুন নয়, খুনের মতো।
সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে প্রাক্তন ছাত্র রঘুপতিকে দেখছিলেন এসিজি।
ছোট করে ছাঁটা চুল, কাঁচা-পাকা চওড়া গোঁফ, ফরসা মুখে সামান্য বসন্তের দাগ। হাতের শিরা এবং পেশি দুশমনদের সাবধান করে দেওয়ার মতো। আর চোয়ালের উদ্ধত রেখা সেখানে জুড়ে দিয়েছে একটা বেপরোয়া ভাব। এ ছাড়াও একটা কিলার ইন্সটিংক্ট যেন আবছাভাবে খুঁজে পাচ্ছিলেন এসিজি।
ছাত্রজীবনের রঘুপতির সঙ্গে আজকের কাজপাগল ইন্সপেক্টর রঘুপতি যাদবের কতটা অমিল, সেটাই ভাবছিলেন ওর প্রাক্তন স্যার অশোকচন্দ্র গুপ্ত।
এ ছাড়া, স্যার, ব্যাপারটার মধ্যে পাখিও আছে– এসিজির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল রঘুপতি, আপকা ফেবারিটপছি। অওর উসকে সাথ এক রুবি কি কাহানি।
মাথার সাদা চুলের গোছায় টান মেরে চোখে জিজ্ঞাসা ফুটিয়ে তুললেন অশোকচন্দ্র ও রুবির কাহিনি? তার মানে?
রুবি–যাকে বাংলায় আপনারা চুনি বলেন। জেমস্টোন। খুব কলি।
ধোঁয়া ছেড়ে হাসলেন এসিজি। বললেন, তোমার টেনশান কমাও রঘুপতি। তখন থেকে যেরকম খাপছাড়াভাবে ইনফরমেশানের টুকরো ছড়িয়ে চলেছ, তাতে আমার মতো থিঙ্কিং মেশিনেরও মস্তক ঘূর্ণিত। তোমাকে তো বহুবার বলেছি, গায়ের জোরের লড়াইয়ে স্পিডটা একটা ফ্যাক্টর, কিন্তু বুদ্ধির লড়াইয়ে নয়। নাউ কাম অন, বেশ রয়েসয়ে গুছিয়ে গল্পটা বলো আমাকে।
একটু আহত হয়ে রঘুপতি বলল, বলছি গুপ্তাসাব, কিন্তু ঘূর্ণিত মানে কী?
হো-হো করে হেসে উঠলেন বৃদ্ধ হুনুর। ছোট হয়ে আসা সিগারেটের টুকরোটা গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে বললেন, সে তোমাকে পরে বলে দেব। এখন শুরু করো তোমার রুবিকি কাহানি
ওঁদের গাড়ি তখন বাগবাজারে বাটার দোকানের কাছে বাঁ-দিকে বাঁক নিচ্ছে।
রঘুপতি যাদব একটু গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করল। ওর ভুরু কুঁচকে গেল, চোখ সামান্য ছোট হয়ে এল।
ওর পাশে বসা খদ্দরের ঢোলা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা বৃদ্ধ মানুষটি তখন আনমনাভাবে মাথার সাদা চুলের গোছায় টান মারছেন, আর বাগবাজার বাটার মোড়ে পুজোর কেনাকাটার ভিড় দেখছেন। কিন্তু তার কান ও মস্তিষ্কের মনোযোগ পুরোপুরি রঘুপতির দিকে। রঘুপতির কাছ থেকে সংক্ষেপে যা জানা গেল, তা হল এই
বাড়িটার নাম লালমহল। বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটের কাছাকাছি দুমহলা পুরোনো বাড়ি। বাড়ির দালানে বিশাল বিশাল ডোরাকাটা থাম। থামের মাথায় কার্নিশের খাঁজে গোলা পায়রার বাস। বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে এখনও ছোট মাপের দুর্গাপুজো হয়।
বাড়িটার রং লাল। অন্তত এককালে তাই ছিল। কালের প্রকোপে সেই লাল কোথাও গোলাপি, কোথাও বা বর্ণহীন হয়ে পড়েছে। বাড়ির সদর দরজায় রং-চটা শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা রায়বাহাদুর রবীন্দ্রলাল গোস্বামী।
রবীন্দ্রলাল অন্তত চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে ইহলোক ছেড়েছেন। তবে তাঁর চার ছেলে এখনও বহাল তবিয়তে লালমহল-এ বাস করেন।
বড় ছেলে শ্যামসুন্দরলাল গতকাল মারা গেছেন। তিনি সবসময় পাখি নিয়ে মেতে থাকেন– মানে, থাকতেন। বাড়ির অনেকটা অংশ খাঁচায়-খাঁচায় ছয়লাপ।
মেজো ছেলে চুনিলাল মণিরত্নের ব্যবসা করেন। দেবদেবীভক্ত ধর্মভীরু মানুষ। অন্য ভাইদের মতো সংসার-ধর্ম করেননি।
সেজ রঙ্গলাল হিসেব মতো বেকার। তবে শোনা গেছে তিনি নাকি টুকটাক সাপ্লাইয়ের কাজ করেন।
আর সকলের ছোট গজেন্দ্রলাল এখনও ঠিক কোনও ব্যবসায় থিতু হয়ে বসতে পারেননি।
ঘটনাটা ঘটেছে গতকাল, দুপুর দুটো নাগাদ।
শ্যামসুন্দরলালের কাছে একটা ফোন এসেছিল। কে ফোন করেছিল সেটা জানা যায়নি। টেলিফোনে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে বলতেই তিনি আচমকা হার্টফেল করে মারা যান।
তার চিৎকারে বাড়ির অনেকে ছুটে আসেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
ব্যাপারটার এমনিতে কোনও জটিলতা ছিল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক মৃত্যু। তা ছাড়া শ্যামসুন্দরলালের বয়েসও হয়েছিল প্রায় বাষট্টি।
কিন্তু গোলমাল বাঁধালেন চুনিলালবাবু। তিনি বললেন যে, প্রায় দু-লাখ টাকা দামের একটা টকটকে লাল চুনি তিনি তাঁর বড়দার কাছে রাখতে দিয়েছিলেন।
সেটার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সেইজন্যই গুপ্তাবকে জরুরি তলব করেছে রঘুপতি। খুঁজে বের করতে হবে চুনিবাবুর চুনি।
রঘুপতির কথা শেষ হতে-না-হতেই এসিজি প্রশ্ন করলেন, শ্যামসুন্দরলালের মারা যাওয়ার ব্যাপারটাকে তুমি খুনের মতো বলছ কেন?
বলছি কি আর সাধে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রঘুপতি। তারপর বলল, ওই হতচ্ছাড়া জেবরাতের জন্যে কদিন ধরেই কোন এক আদমি শ্যামসুন্দরবাবুকে থ্রেট করছিল। তাতে উনি ভয়ও পেয়েছিলেন, আবার খুব এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল, উনি এভাবে মারা না গেলে হয়তো ওই আন্নােন পারসনের হাতে খুন হয়ে যেতেন…।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved