অনেকদিন ভেবেছি কি করে বই লেখা যায়। লিখে-লিখে আর ভেবে পারি না। কী যে মুসকিল এই বই লেখা। একটু কঠিন করে লিখতে হবে কিনতু। গলপের বই তো নয় আর। পড়ার বই। সব্বাই বলে গলপের বইয়ের চেয়ে পড়ার বই কঠিন হয় তাই।
আমি গোটা বইটা একা লিখবো না কিনতু। সব বইতে দেখি একেকজন একেকটা পড়ার কঠিন গলপো (ওটাকে কি বলে ঠিক জানি না) লিখেছে। আমিও তাই। সেইরকোম আমি একটা লিখবো। অননোগুলো পাপিয়া, সুমি, কণিকে দিয়ে লেখাবো। তারপর একসংগে বই করে বুটুকে দেবো। আর না পড়তে পারলে বাবার বেতটা নিয়ে মারবো। বাবার মতোন জোরে মারবো না, কিনতু অলপো আস্তে মারবো যাতে ব্যথা লাগবে না মোটেই, কিনতু ভয় পাবে।
নমিতাকে দিয়েও বই লেখাতাম। কিনতু না। ওর সংগে আমার দারুণ ঝগড়া হয়ে গ্যাচে। ঝগড়া হোত না, কিনতু ও-ই আমাকে কালো বলেচে। আর কেউ কিনতু বলেনি। আমাকে মা বলেছিল, যে যাই তাকে তাই বললে খারাপ হোলে রেগে যায়। যেমান ভিকু খোঁড়াকে ল্যাংড়া বললে রেগে গিয়ে আমাদের মারতে আসে। বাবাকে একদিন মা মাতাল বলেছিল। তাই শুনে বাবার কি রাগ। মারতে আসে আর কি মাকে। আমি শুয়ে শুয়ে চোখ পিটপিট করে দেখচিলুম। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলুম। মাতাল মানে আমি জানি, বুটু জানে না। জানবে কি, ও বাবাকে শুধু বা বলে। আর কাঠের যে ঘোড়াটা মামু দিয়েচিল ওটাকে বলে ঘোরা। আমি ঘোড়া বলি কিনতু। বুটু তো বলবেই। বাচচা তো।
মাতাল মানে আমি পাপিয়াকে জিগগেস করেছিলাম। ও জানে না। আমার মনে হয় বেতাল বলে যে ছোটদের বই আচে (গলপের বই কিনতু) মাতাল মনে হয় তাই। শুধু ব এর জায়গায় ম। মানে বেটাছেলের জায়গায় মেয়েছেলে। তাই বোধহয় ব এর জায়গায় ম। মাতাল মানে বোধহয় তাহোলে মেয়ে বেতাল। কিনতু মা যে বাবাকে মাতাল বোললো বাবা কি মেয়ে? কে জানে!
তাই রাগ হোয়েচিলো আমার যখন নমিতা আমাকে কালো বলেছিল খেলবার সময় মাঠে। ওদের মসতো গাড়ি আছে। ভালো জামা পরা লোক চালায়। কিরকম সব মেশিন লাগিয়েছে আবার গাড়ির ভেতরে। তাতে গান হয়, পাখা ঘোরে। নমিতা ঐ গাড়ি চোড়ে ইসকুলে আসে। আমাদের সংগে খেললে ওর মা বকে, কিনতু তবু ও খেলে। দারুণ স্টাইল করে থাকে সবসময় সিনেমার পোসটারে দেখা সব মেয়েদের মতোন। আমি কিনতু বেশি সাজি না মা মারবে বলে।
যাগগে, যেকথা বলছিলুম। নীলাদি বোলতো যার মা ফরসা, বাবা ফরসা হয় সেও ফরসা হয়। নমিতার বাবা সবাই ফরসা, আমার কিনতু নয়। বাবা ফরসা খালি, মা কিনতু কালো, ফরসা নয়। মাঝে মাঝে তাই ভাবি ইশ মাও যদি ফরসা হোতো। নমিতা সবসময় আমাকে কালি বলে ডাকে, তাতে কিনতু আমি রাগি না। কালি তো ঠাকুরের নাম। কিনতু আমায় কালো বলেছিলো বলেই রাগ হয়েছিলো আমার।
আমি কি ইচ্ছে করে কালো হয়েছি? আমি মাকে জিগগেস করেছিলুম, আমি কালো কেন, ফরসা নই কেন। মা হেসে বলেছিলো, ভগোবান যে রং দেন সে রংই ভালো।
মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে অনেক সাবান মেখেচি কিনতু ফরসা হইনি। শুধু শীতকালে একটু অল্প ফরসা হই কারণ সাবান মাখলে গাটা কিরকম সাদা সাদা খড়ির মতোন হয়। পাপিয়া সুমি, কণি–ওরা খড়ি উঠলে জল দিয়ে ধুয়ে দেয় কিনতু আমি দিই না। যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ রেখে দিই। মাকে ডেকে দেখাই। আয়নায় বার বার দেখি। আসলে আমার গায়ের রংটাই কালো।
কিনতু একটা কথা ভাবলে অবাক লাগে। আমাদের অমলকাকুর কথা। অমলকাকু আমার মতোন কালো ছিল কিনতু একদিন দেখি অমলকাকুর ঠোঁট দুটো সাহেবদের মতোন সাদা। আর সব কিনতু তেমনি কালো, সাদা নয়। মাকে আমি জিগগেস করেছিলুম, মা বলেচে ওটা একটা অসুখ। কিনতু অনেকদিনের মধ্যেই অমলকাকুর হাত পা সব সাদা হয়ে গেল। সাহেবদের মতোন। আমার কিনতু ইচ্ছে করছিলো ওরকম হয়ে যেতে। ঠিক মেমদের মতোন। কিনতু আমার হোলো না।
বুটু কিনতু আমার চেয়ে ফরসা, কিনতু বাবার চেয়ে কালো। মা বলে বড়ো হলে ও নাকি আমার মতোই কালো হয়ে যাবে। পাপিয়া, সুমি, কণি, ওরা ফরসা নয় কিনতু অলপো কালো। আমাকে একদিন কণি বলেছিলো ইস, তুই অলপের জননো ফরসা হতে পারলি না। তোর মা যদি ফরসা হোতো তবে তুইও ফরসা হোতি। তাহোলে আর তোর বিয়ের জননো কষ্টো হোতো না।–তখোন থেকেই আমি ভাবচি কি করে ফরসা হওয়া যায়। আবার ভাবি এখোন মা যদি ফরসা হয় তবে কি আমিও হবো। মনে হয় হবো। তাহোলে প্রথমে মাকে ফরসা করা দরকার কিনতু কি করে হবে। মাকে রোজ বলি সাবান মাখতে, মা হাসে। ভেবে ভেবে বুঝতে পারি না কি করে উপায় হবে। ধুর ছাই।
*
পড়ার বইতে যেমন চ্যাপটা (এক, দুই এমনি) থাকে আমার লেখারও তেমনি থাকবে কিনতু এক দুই নমবোর না দিয়ে তারার ছোবি দেবো। বুটু তারা ভালোবাসে।
কণিকে, সুমিকে আর পাপিয়াকে বলেছি পড়ার বই লেখার কথা। ওরা তো হেসেই খুন। লিখবে কি, খালি হাসছে। কিন্তু বলেছে লিখবে। সবগুলো হোলে চাদুমিয়াকে দিয়ে একসঙ্গে বাঁধিয়ে বই করে বুটুকে দেবো।
কাল রাতে বোতল ভেঙে বাবার হাত কেটে গেছে। তাই বাবা কি অসোব্য সব কথা বলছিলো মাকে। আমি ছুটে গিয়ে বুটুর কান চেপে ধরেছিলুম। যদি ও শোনে তাই। আমি তো বড় হয়েছি, সব বুঝি, বুটু ছোট তো তাই। বাবার হাত দিয়ে দরদর কোরে রকতো পড়চিলো৷ কিরকম করে যেন বাবার ফরসা হাতটা আরো অনেক ফরসা হয়ে যাচচিলো। ঘরে রকতো আর বিচচিরি গনধো ভরতি। বোতলের মধ্যে জল ছিলো, সব পড়ে গ্যাচে মাটিতে, তার গন্ধ বোধহয়। বাবা কি তাহলে নরদমার জল খায় যে ওতে এমোন বাজে গনধো।
