চিফ ইনস্ট্রাকটর হাতের ইশারায় রূপকথাকে চুপ করতে বলল। তারপর রণজিৎ ও তার দুই সঙ্গীকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আপনারা প্লিজ নিজেদের কাজে চলে যান। আমরা এখানে কোনওরকম হইহল্লা বা জটলা চাইছি না।’
জিপিসি-র ডিসিপ্লিন এমনই যে, অনুরোধ মানে আদেশের চেয়েও কিছু বেশি। রণজিৎ সেটা জানে। হাসান আর পাপুয়াও। তাই চোখের পলকে ওরা তিনজন সরে গেল। বাড়তি যে দু-তিনজন উৎসাহী পার্টিসিপ্যান্ট ছিল তারাও চিফ ইনস্ট্রাকটরের কথা শেষ হওয়ামাত্রই পা চালাল।
যার সঙ্গে জিশানের ধাক্কা লেগেছিল সেই ইনস্ট্রাকটর আর পিস ফোর্সের দুজন গার্ড অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। চিফ ইনস্ট্রাকটরের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
রূপকথা জিশানের তোয়ালেটা কুড়িয়ে নিল। তারপর ওর দিকে হাত বাড়াল। জিশান হাতটা ধরল। শরীরটা বাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল। বাঁ-হাতে কপালের পাশ থেকে রক্ত মুছে নিল।
রক্তে লাল হয়ে যাওয়া হাতের আঙুলগুলো দেখল জিশান। আজ থেকে দেড়-দু-মাস আগে এভাবে রক্ত দেখলে ওর মধ্যে যে-প্রতিক্রিয়া হত আজ তেমন হল না। জিশান একটু অবাক হলেও বুঝল, এটাই হওয়ার ছিল। জিপিসি-তে যারা গেম খেলতে আসে তাদের সবারই এরকম হয়। ধীরে-ধীরে রক্ত-টক্ত সব গা-সওয়া হয়ে যায়।
রূপকথা চিফ ইনস্ট্রাকটরকে আকুল গলায় বলল, ‘স্যার, হি ইজ ব্লিডিং। দ্যাট গডড্যামড গাই হিট হিম সো হার্ড…।’
চিফ ইনস্ট্রাকটর হাতের ইশারায় ওকে আশ্বস্ত করে জিশানের স্মার্ট কার্ড দেখতে চাইল। চার-পাঁচ-সেকেন্ড সেটায় চোখ বুলিয়ে কার্ডটা জিশানকে ফেরত দিল। জিমের চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে কোমর থেকে মোবাইল ফোন বের করে কাউকে ফোনে ধরতে চেষ্টা করল।
পরপর কয়েকবার চেষ্টা করে লাইন ‘বিজি’ পাওয়ায় বিরক্ত হল। তখন চিফ একজন গার্ডকে বলল, ‘একে মেডিক রুমে নিয়ে যাও। চিফ মেডিকের ফোন বিজি। যখনই ফোন করি ফোন বিজি। কার সঙ্গে এত বকবক করে কে জানে!’
‘আমি সঙ্গে যাব, স্যার?’ রূপকথার চোখে অনুনয়। ও তখন জিশানের ডানহাতের ওপরদিকটা আঁকড়ে ধরে আছে। ওর বোধহয় মনে হয়েছে, জিশান হঠাৎ টলে পড়ে যেতে পারে।
চিফ ইনস্ট্রাকটর বেশ কয়েকসেকেন্ড মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাতের ইশারায় দুজন গার্ডকে চলে যেতে বলল।
ওরা রোবটের মতো নির্দেশ পালন করল।
চিফ এবার জিশানের দিকে তাকাল। ওর নজর দেখে বোঝা যাচ্ছিল জিশানের শরীরের কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটা আঁচ করার চেষ্টা করছে।
জরিপের কাজ শেষ হতেই চিফের নজর গেল সামান্য দূরে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইনস্ট্রাকটরের দিকে।
লোকটা মাথা নিচু করল। যেন জিশানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাওয়াটা ওর পক্ষে মর্মান্তিক অপরাধ হয়ে গেছে।
‘এবার দয়া করে ডিউটিতে যাও—।’ ঠান্ডা গলায় চিফ বলল।
লোকটা খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া ইঁদুরের মতো পালাল।
চিফ তাকাল রূপকথার দিকে। রূপকথা আবার বলল, ‘আমাকে এই পেশেন্টের সঙ্গে থাকার পারমিশান দিন, স্যার। প্লিজ…। আমার রিকোয়েস্টটা রাখুন। প্লিজ…।’
‘পেশেন্ট?’ ছোট্ট করে উচ্চারণ করল চিফ, ‘রিকোয়েস্ট? তোমার কত রিকোয়েস্ট রাখব বলো তো, রিমিয়া? তুমি আমার রিকোয়েস্ট রাখো?’
রূপকথা—রিমিয়া—চুপ করে রইল। চিফের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
জিশান চিফকে ভালো করে দেখছিল। এমনিতে লোকটার মুখে শয়তানির ছাপ নেই। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হল ছাপ পড়েছে। হাসলও লোকটা। হাসিতে আশা-প্রত্যাশা।
রূপকথা ঠোঁট কামড়াল : ‘কী রিকোয়েস্ট, বলুন?’
চিফ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর জিশানকে দেখল। মুখে গম্ভীর ভাব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে বলল, ‘পেশেন্টকে নিয়ে এখন যাও—তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব…।’
রূপকথা আর দেরি করল না। জিশানের হাত থেকে গ্লাভস খুলে নিল। তারপর গ্লাভস আর তোয়ালেটা গারমেন্টস বিন-এ ফেলে দিয়ে জিশানকে নিয়ে রওনা হল।
চিফ ওদের চলে যাওয়া দেখছিল। দেখতে-দেখতে মোবাইল ফোন কানে দিল। কারও সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
অ্যানালগ জিমের বাইরে এসে ডানদিকের করিডরে ঘুরল মেয়ে। সামনেই একটা ঘর। ঘরের দরজায় সুন্দর করে লেখা : PHYSICAL REDRESSAL। দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে একজন গার্ড। অল্পবয়েসি ছেলে। রোগা চেহারায় বেমানান মোটা গোঁফ। দুটো তরুণ চোখে চনমনে কৌতূহল।
রূপকথা জিশানকে নিয়ে গার্ডের কাছে গেল। আলতো গলায় বলল, ‘পেশেন্ট।’ একইসঙ্গে ইশারা করল জিশানের রক্তাক্ত বাঁ-গালের দিকে।
গার্ড পকেট থেকে একটা রিমোট বের করল। দরজার দিকে তাক করে রিমোটের বোতাম টিপতেই দরজা খুলে গেল। ওরা ভেতরে ঢুকে পড়ল।
রূপকথা জিশানকে জিগ্যেস করল, ‘কষ্ট হচ্ছে?’
জিশান হাসতে চেষ্টা করল : ‘ততটা নয়।’
একটু চুপ করে থেকে তারপর জিগ্যেস করল, ‘আপনার নাম রিমিয়া?’
ঘুরে তাকাল : ‘হ্যাঁ।’
‘অদ্ভুত নাম। অবশ্য আমি অন্য একটা নাম রেখেছি।’
‘কী নাম?’
ততক্ষণে দুজন মেডিক এবং দুজন নার্স ওদের কাছে চলে এসেছে। জিশানকে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে একটা সুন্দর বিছানায় বসিয়ে দিয়েছে।
জিশান চারপাশটা জরিপ করে দেখছিল। জায়গাটা আসলে নার্সিংহোম হলেও দেখতে একেবারে আলট্রা-টিপটপ, অন্যরকম।
বিশাল মাপের চৌকোনা ঘর। দেওয়ালের রং হালকা নীল। বিছানাগুলো মেঝেতে লুডোর ছকের ঢঙে ছোট-ছোট বর্গাকারে সাজানো। চারটে বিছানা একটা বর্গক্ষেত্র তৈরি করেছে। এরকম পাশাপাশি দুটো বর্গক্ষেত্রের মাঝে গাঢ় নীল রঙের অ্যাক্রিলিকের পার্টিশান।
