‘আজ কেমন আছেন?’
‘ভালো—।’ ফর্মের নানান খোপে টিক মারতে-মারতে জিশান বলল।
‘এক্সারসাইজের মুড আছে তো?’
‘কেন থাকবে না?’
‘না, অনেক সময় দেখি সামনে কোনও টাফ কমপিটিশান থাকলে পার্টিসিপ্যান্টদের মুড অফ হয়ে যায়। মেঘ করলে আকাশের যা অবস্থা হয়…।’ কথা শেষ করে হাসল।
জিশান চমকে চোখ তুলে দেখল ওকে। মেয়েটা কবি-টবি নাকি?
ওল্ড সিটিতে কবিতা লেখা কবে উঠে গেছে। অন্তত পত্র-পত্রিকাগুলো উঠে গেছে। কিন্তু কিছু-কিছু মানুষ এখনও পথে-ঘাটে কবিতা আবৃত্তি করে বেড়ায়, গান গেয়ে বেড়ায়। সবাই তাদের পাগল বলে। কিন্তু জিশানের মনে হয় ওই পাগলগুলো মরা শহরটাকে বাঁচিয়ে তুলতে চাইছে, ফুল-পাখি ফিরিয়ে আনতে চাইছে, ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোকে জাগিয়ে তুলছে চাইছে।
চাইছে অনেকেই। জিশান আর মিনিও চাইছে। তাই ওরা কবিতা ভালোবাসে। ওরা চায় কোনও এক অলৌকিক ম্যাজিকে ওল্ড সিটিটা কবিতা হয়ে যাক। এই চাওয়ায় কোনও ভুল নেই। কিন্তু পাওয়া বোধহয় এখনও অনেক দূরে।
নিউ সিটিতে কবিতা নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ নয়। তবে শ্রীধর পাট্টা আর তাঁর তৈরি ভয়ংকর সব নিয়মকানুন দেখলে মনে হয় কবিতা বোধহয় নিষিদ্ধর চেয়েও কিছু বেশি।
জিশান নিচু গলায় বলল, ‘মুড অফ হলে তো চলবে না। ট্রেনিং-এর নিয়মে নড়চড় হওয়ার জো নেই।’
‘সেটা ঠিক। তবে…’ মাথার চুলে হাত চালাল মেয়ে : ‘তবে আমরাও তো মানুষ…।’
‘দেখে তো মনে হয় না।’
‘তার মানে!’ রাগ ঢুকে পড়ল গলায় : ‘আমি কি জিমের ওইসব যন্ত্র নাকি?’
‘হতেই পারে—।’ ঠোঁট উলটে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেছিল জিশান। তারপর একটু হেসে সরে এসেছিল টেবিলের কাছ থেকে।
দূর থেকে ও লক্ষ করেছিল মেয়েটি তখনও অখুশি চোখে জিশানের দিকে তাকিয়ে আছে।
দু-দিন আগে জিমে ঢোকার সময় মেয়েটি জিশানকে বলেছিল, ‘আপনার নাম তো জিশান…।’
‘হ্যাঁ—কেন?’
‘কনগ্র্যাচুলেশানস। আপনি কাল স্নেক লেক কমপিটিশানে জিতেছেন।’
জিতেছি এবং মৃত্যুর দিকে আরও এক পা এগিয়ে গেছি হয়তো। মনে-মনে ভাবল জিশান। কিন্তু মুখে বলল, ‘থ্যাংকস।’
জিশান ওর নাম জিগ্যেস করল না। শিবপদর কথা মনে পড়ে গেল। নাম জেনে কী লাভ! ঝামেলা বাড়বে।
‘অল দ্য বেস্ট উইশেস ফর ইয়োর নেক্সট গেম—।’
‘কেন? হঠাৎ আমাকে উইশ করছেন কেন?’ ভুরু কুঁচকে মেয়েটির দিকে তাকিয়েছিল জিশান।
চকচকে সাদা আলো ওর মিষ্টি মুখে একটা অদ্ভুত আভা তৈরি করেছে। মনে হচ্ছে, এই মুখটা যিনিই তৈরি করে থাকুন তিনি প্রচুর সময় এবং ভালোবাসা দিয়ে তৈরি করেছেন। এই শহরে এরকম প্রাকৃতিক অলীক সৌন্দর্য বেমানান। এখানকার যত সৌন্দর্য সব কৃত্রিম—মানুষের তৈরি। আর প্রতিটি সুন্দরের পিছনে বুদ্ধি, যুক্তি, পরিশ্রম, আর উদ্দেশ্য রয়েছে। যেমন, নেকরোসিটির নীল আলো জ্বলা মোমবাতির আড়ালে রয়েছে মানুষের মৃতদেহের ভাগাড়।
মেয়েটি হেসে বলল, ‘আমি সবাইকেই উইশ করি। আমি চাই সবার ভালো হোক। সবাই জিতুক—।’
জিশানের মধ্যে তর্ক করার সাধ জেগে উঠল। বহুদিন ও কারও সঙ্গে প্রাণ ভরে তর্ক করেনি। তাই ও ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, ‘এই ইমপসিবল উইশের কোনও মানে নেই। একটা গেম-এ সবাই কখনও জিততে পারে?’
‘না, পারে না।’ মাথা ঝাঁকাল মেয়ে : ‘জানি—এটা অবাস্তব। কিন্তু তাই বলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না? যদি এমন হত, কমপিটিটাররা সবাই মিলে সুপারগেমস কর্পোরেশনের এগেইনস্টে রুখে দাঁড়াত, ওদের ডেডলি গেমগুলো চিরকালের জন্যে ধ্বংস করে দিত, তা হলে কী ফ্যানট্যাসটিক হত! তখন কি বলা যেত না যে, গেমটায় সবাই ফার্স্ট হয়েছে! বলুন?’
জিশান কোনও কথা বলতে পারল না। হাঁ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। এ কী রূপকথা শোনাচ্ছে সোনার মেয়েটা?
গার্ডের কথা মনে পড়ে গেল। স্নেক লেক কমপিটিশানের আগে যে ওকে স্নেক রিপেলান্ট অয়েলের একটা পাউচ দিয়েছিল। বলেছিল, ‘…আমরা সব ভেড়া হয়ে গেছি। আমরা সব হেরে যাওয়া পাবলিক, জিশান…। তুমি জিতলে আমার মনে হবে আমিই জিতেছি…। মনে রেখো, আমাকে জেতানো চাই…।’
জিশানকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতে দেখে মেয়েটা বলল, ‘আমি ভীষণ স্বপ্ন দেখি, জিশান। এখানকার কেউই—এমনকী নিউ সিটির মার্শালও আমার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করতে পারবে না। রিয়েল লাইফে যদি নাও পারি রূপকথায় অন্তত মানুষের মতো বাঁচব। তাই আমি সবাই জিতেছে এমন স্বপ্ন দেখি। আপনিও স্বপ্ন দেখুন, জিশান। স্বপ্ন দেখার অসুখটা খারাপ না। আমি বলছি, রূপকথার মধ্যেই মানুষের আসল জীবন লুকিয়ে আছে। আমরা দেখতে চাই না, তাই দেখতে পাই না…।’
সেদিন থেকে জিশান মনে-মনে ওর নাম দিয়েছিল রূপকথা। কসাইয়ের দেশে ও রূপকথা বিক্রি করতে চাইছে। ওর সাহস তো কম নয়!
জিশানের সঙ্গে ইনস্ট্রাকটরের সংঘর্ষের ঘটনাটা রূপকথা দেখতে পেয়েছিল।
কারণ, ওর হাতে তখন কোনও কাজ ছিল না। তাই টেবিলে বসে ও এমনিই জিমের পার্টিসিপ্যান্টদের দিকে তাকিয়েছিল। ও জানে, এরা ক্রমশ সংখ্যায় কমছে। আরও কমবে।
সোলো জিম থেকে জিশানকে ও বেরোতে দেখেছিল। সংঘর্ষটাও ভালো করে খেয়াল করেছিল। তাই জটলা এবং হইচই দেখে ও জিশানের কাছে ছুটে এল। ততক্ষণে চিফ ইনস্ট্রাকটরও সেখানে চলে এসেছে।
রূপকথা উত্তেজিতভাবে তাকে বলল, ‘স্যার, আমি সব দেখেছি। ব্যাপারটা পিয়োরলি অ্যাকসিডেন্ট। যেভাবে ওরা বলছে…’ রণজিৎ পাত্রের দিকে আঙুল দেখাল : ‘সেটা ঠিক নয়। আমি…।’
