পিছনে তাকিয়ে একজন বলল, ‘দেখে চালা। রাস্তা তো নয় সালা—যেন গুটি বসন্তের ছল্লা লেগেছে—।’
কাত হয়ে যাওয়া বাইকটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটা স্টার্ট দিয়ে আরোহী একদলা পিক ফেলল রাস্তায়। চেঁচিয়ে বোধহয় বদনোয়াকে উদ্দেশ করে বলল, ‘বস, সুখারাম হারামির বাচ্চাটা কোথায় সেঁধিয়ে গেল বলো তো! ব্যাটা একেবারে লাপাতা হয়ে গেল দেখছি…।’
সামনের বাইক থেকে বদনোয়া হিংস্র গলায় বলল, ‘লাপাতা হোকে জায়েগা কাঁহা! পাতালে গিয়ে ঢুকলেও শুয়োরের বাচ্চার চুলের গোছা ধরে টেনে তুলে আনব। মদনোয়ার দাম সুদে-আসলে চুকতা করব।’
ওদের বাইকের কাছ থেকে ছ’-সাত ফুট দূরে অন্ধকারে পড়ে থাকা সুখারামের বুক ঢিপঢিপ করছিল। মায়ের জন্য, চোলির জন্য ওর বুক কেঁপে উঠল।
ঠিক তখনই ওদের একজন হেসে বলল, ‘সুখারাম পালালে কী হবে? ওর ঘর-বাড়ি তো আর জায়গা ছেড়ে পালাতে পারবে না! ওর মা আর ফুলটুসি বোনটাই বা কোথায় পালাবে?’
কথাটা শুনে সুখারামের শীত-শীত করে উঠল। ওর মনে হল, ও বিশাল এক বরফের স্ল্যাবের ওপরে শুয়ে আছে।
বাইক তিনটে আবার চলতে শুরু করল। শেষের বাইকটার চাকা আবার জল জমা গর্তে পড়তেই কাদাজল ছিটকে এল সুখার গায়ে। ওর মনের ভেতরে তখন স্টিম রোলার চলছিল।
বাইকগুলো চলে যেতেই মা কালীকে ডাকাডাকি করা থামিয়ে উঠে বসল। এখন ও কী করবে? কী করা উচিত?
মা আর চোলির কথা ভেবে ওর ভয় করতে লাগল। ওর ভেতরে এক অদ্ভুত টানাপোড়েন শুরু হল। ওর ভেতরে একটা সুখারাম বলতে লাগল, ওর এখন অন্ধকারে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা উচিত। কিন্তু একইসঙ্গে আর-একটা সুখারাম বলতে লাগল, ওর এখন বাড়ি যাওয়া উচিত—মা আর চোলির ওকে ভীষণ দরকার।
আকাশে বিদ্যুৎ ঝিকিয়ে উঠল। তারপরই মেঘের বাঘের ডাক।
মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল সুখা। হে মা কালী, আমাকে বলে দাও আমি এখন কী করব। আমি কি মায়ের কাছে যাব?
অমনই আকাশ থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হল। সঙ্গে-সঙ্গে সুখারাম নস্করের মনে হল, এক মা ওকে বলছে আর-এক মায়ের কাছে যেতে। এই বৃষ্টি তারই সংকেত।
উঠে দাঁড়াল সুখা। প্যান্টটা ঠিকঠাক করে পরে নিল। সারা গায়ে কাদাজল লেপটে আছে। বৃষ্টি ওর গা ধুয়ে দিচ্ছে। সেই অবস্থাতেই ও এগিয়ে গেল অন্ধকারের দিকে। উবু হয়ে বসে ওর রানিং শু খুঁজতে লাগল।
একটু পরেই সেগুলো হাতে ঠেকল। রাস্তায় লেপটে বসে জুতো জোড়া তাড়াতাড়ি পরে নিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। মোবাইল ফোন। সাইকেল ভ্যান। ছুট, ছুট, ছুট।
ভ্যান চালাতে-চালাতেই মা-কে ফোন করল।
ফোন ধরল চোলি।
‘দাদাভাই! বল….।’
‘শিগগির মা-কে ফোন দে।’
চোলি ঘাবড়ে গেল। কাঁপা গলায় জিগ্যেস করলে, ‘কেন রে?’
‘ও:, শিগগির মা-কে দে—।’
এক সেকেন্ড পরেই মায়ের গলা পাওয়া গেল।
‘কী হয়েছে, সুখা?’
‘মা, তুই আর চোলি এক্ষুনি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যা—।’
‘সে কী! কেন?’
‘মা, বদনোয়ার গ্যাং আমাকে পাগলের মতো খুঁজছে। আমাকে হাতে না পেয়ে ওরা ঘরে গিয়ে তোদের অ্যাটাক করার কথা ভাবছে— তোকে আর চোলিকে। আমি নিজের কানে শুনেছি…।’
‘কিন্তু এখন আমরা কোথায় পালাব? পালিয়ে কোথায় যাব?’ হতভম্ব গলায় মা বলল।
‘যেখানে হোক যা—’ অধৈর্য গলায় বলল সুখারাম, ‘গিন্টিদের ঘরে কি আর কারও ঘরে গিয়ে লুকিয়ে থাক। আমি ভ্যান নিয়ে এখুনি আসছি…।’
ফোনের লাইন কেটে দিল। পাগলের মতো সাইকেল ভ্যানের প্যাডেল ঘোরাতে লাগল। বৃষ্টি, খানা-খন্দ—কিছুই ও টের পাচ্ছিল না।
মনে পড়ল, কয়েক ঘণ্টা আগে চোলি ওকে কাঁদতে-কাঁদতে জিগ্যেস করেছিল, ‘তুই কোথায় যাচ্ছিস?’
উত্তরে সুখা বলেছিল, ‘জানি না। জানলেও বলতাম না। বদনোয়ার গ্যাং…।’
তখন ও একরকম টরচারের কথা ভেবেছিল—আর এখন অন্যরকম।
সাইকেল ভ্যানটা বস্তির কাছাকাছি চলে এসেছিল। এখানটায় রাবিশের চাপান দেওয়া কাঁচা রাস্তা। তার একপাশে সরু নালা মতন। নালার ঢাল বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে নামছে।
একপাশে দুটো ভাঙাচোরা ঘর চোখে পড়ল। যারা থাকত তারা মাসকয়েক আগে আস্তানা ছেড়ে চলে গেছে। তাদের ফেলে যাওয়া ঘরের বাঁশ, চাটাই, ছেঁড়া পলিথিন—যে যা পেরেছে হাতিয়ে নিয়েছে। এখন ঘর দুটো যে-অবস্থায় পড়ে আছে তাকে ঘরের ‘কঙ্কাল’ বললেও অনেকটা বাড়িয়ে বলা হয়। সুখারাম ওর সাইকেল ভ্যানটা সেই দুটো ঘরের একটার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। তারপর গাড়ি থেকে নেমে খুব সাবধানে ওর ঘরের দিকে পা বাড়াল।
বস্তির গলিপথে অন্য অনেক কিছুর মতোই আলোরও অভাব। তাই বৃষ্টি যে পড়ছে সেটা দেখা যাচ্ছিল না, তবে বস্তির ঘরগুলোর চাল থেকে হালকা শব্দ উঠছিল, আর গায়েও টের পাওয়া যাচ্ছিল।
ধীরে-ধীরে এগোতে-এগোতে সুখারাম হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। না, তখনও ও কিছু দেখতে পায়নি—কিন্তু শুনতে পেয়েছে।
কারা যেন চিৎকার করছে। এবং সে-চিৎকারের যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তার বেশিরভাগটাই নোংরা গালিগালাজ।
ব্যাপারটা যে কী হচ্ছে সেটা আঁচ করতে পারল। তাই একটু তাড়াতাড়ি পা চালাল।
ওদের ঘরে পৌঁছনোর বাঁকটার মুখে একটা ফুটপাঁচেক চওড়া খাঁজ আছে। সেখানে ভাঙাচোরা ইটের টুকরো আর নানান আবর্জনা। তার একপাশে সাইকেল আর সাইকেল ভ্যানের বাতিল টায়ার-টিউব, সিট কভার ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। সুখা জানে, ওজনদরে বিক্রি হয় এমন কোনও মেটাল পাটর্স সেখানে নেই। শীতের সময় ওইসব টায়ার-টিউব টেনে নিয়ে বস্তির লোকরা ধুনি জ্বালিয়ে শীত তাড়ায়।
