কিন্তু বলধর পাট্টা আগুন নেভালেও ছাই থেকে গিয়েছিল। আর সেই ছাইয়ের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আগুনের কিছু কণা। সেই কণা থেকেই মাঝে-মাঝে জ্বলে উঠত নতুন আগুন। ছোটখাটো অসন্তোষ, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ।
কেন এই অসন্তোষ, বিদ্রোহ, তা বলরাম বুঝতে পারতেন না। তার কারণ, বস্তুতান্ত্রিক চাহিদার বাইরেও যে মানুষের চাহিদা থাকে সেটা তিনি বোঝেননি। তাই শিকারির গুলিতে একটা পাখির মৃত্যু হলে অন্য একজন মানুষ কেন দু:খ পাবে সেটা বলধর বুঝতেন না। বুঝতে পারতেন না, কয়েকটা প্রজাপতি আগুনের আঁচে পুড়ে মরলে কেন মানুষ কষ্ট পাবে। সবসময় ভাবতেন, না, এর কোনও লজিক নেই। তেমনই ভাবতেন সুপারগেমস কর্পোরেশনের ডিজাইন করা মনোহারী সব খেলায় কোনও পার্টিসিপ্যান্ট আহত কিংবা নিহত হলে নিউ সিটির কেউ কেন দু:খ পাবে। অচেনা, অজানা, অনাত্মীয় কোনও মানুষ মারা গেলেও কারও দু:খ পাওয়া উচিত নয়। এইসব ইললজিক্যাল ব্যাপারের কোনও মানে হয় না।
বলধর পাট্টা নিজেকে যথেষ্ট লজিক্যাল মানুষ বলে মনে করতেন। তাই ওঁর যান্ত্রিক লজিকের কাঠামো দিয়ে এইসব ‘আলতু-ফালতু’ ব্যাপারকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন—কিন্তু পারতেন না।
শ্রীধর পাট্টাকে বলধর নিজের জেরক্স কপি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেটা করতে গিয়ে দেখেছিলেন, শ্রীধর যেন আগে থেকেই বলরামের জুতোয় পা গলিয়ে বসে আছেন।
সুতরাং বলধরের কাজটা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। নিজের হাতে তিনি বলতে গেলে দ্বিতীয় বলধর পাট্টা তৈরি করে গিয়েছিলেন। নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, ভাবনা—সবই তিনি শ্রীধরের মধ্যে চারিয়ে দিতে পেরেছিলেন।
তবে শ্রীধর কিন্তু দ্বিতীয় বলধর হননি। বরং বলধরকে বেশ কয়েকগুণ ছাপিয়ে গিয়েছেন। বলধর পাট্টা যদি বেঁচে থাকতেন তা হলে এই ‘বেশ কয়েক গুণ’ বলধরকে দেখে খুশি হতেন। এবং, এটা মনে রাখতে হবে, বলধর পাট্টাকে খুশি করা বেশ শক্ত কাজ ছিল।
বলধর যেভাবে ছোটখাটো বিদ্রোহ বা বিক্ষোভগুলোর মোকাবিলা করতেন, শ্রীধরও একইভাবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। তিনি নিউ সিটির বাসিন্দাদের এটা বোঝাতে চেয়েছেন এইসব বিদ্রোহীরা আসলে টেররিস্ট, সন্ত্রাসবাদী। এরা অকারণে নির্বিচারে নিরীহ মানুষকে খুন করে। সেটা বোঝাতে গিয়ে শ্রীধর পাট্টা বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে গোপনে কোতল করে তার দায় বিদ্রোহীদের ঘাড়ে চাপিয়েছেন। তা ছাড়া সারা শহর জুড়ে গোপন নজরদারির কাজ আরও ব্যাপক, আরও শক্তিশালী করেছেন। কিন্তু তা সত্বেও…।
শ্রীধর চুপচাপ দাঁড়িয়ে কুশিয়া আর নন্দরামকে লক্ষ করছিলেন। তারই মধ্যে কখন যেন স্যাটেলাইট ফোনটা পকেট থেকে বের করে আবার হাতে তুলে নিয়েছেন।
একটু অপেক্ষা করার পর শ্রীধর বললেন, ‘কী বলবে বলো…।’
কুশিয়া তখন বলতে শুরু করল, ‘স্যার…মার্শাল, স্যার…কী হয়েছে বলছি।’ কয়েকবার ঢোঁক গিলল কুশিয়া। তারপর : ‘মার্শাল, স্যার, ডি, জি আর এম জোনে টেররিস্ট গ্রুপের বেশ কয়েকজন লোক আছে। ওদের কাছে আর্মসও আছে। আমি আর নন্দরাম…’ নন্দরামের দিকে তাকাল কুশিয়া : ‘গতকাল ওই তিনটে জোনে সিক্রেট প্যাট্রলে ছিলাম। ঘুরতে-ঘুরতে আমরা এম জোনের টুয়েলভ কমা সেভেন্টি এইট কো-অর্ডিনেটে যাই। সেখানে একটা শপিং মলে ঢুকি। আমরা…আমরা ফুড প্লাজায় একটা টেবিলে বসে…আমরা খাবারের অর্ডার দেব বলে ভাবছিলাম। তখন পাশের টেবিলে বসা দুজন লোকের কথা আমাদের কানে এল…।’ নন্দরামের দিকে তাকিয়ে কুশিয়া বলল, ‘এবার তুমি বলো…।’
নন্দরাম সোফায় বসার পর থেকেই উসখুস করছিল। এখন একটু নড়েচড়ে বসে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘স্যার, ওদের কথার পয়েন্টসগুলো আমি লিখে এনেছি। কয়েকটা ফোন নাম্বারও টুকেছি। ডি আর জি জোনে ওদের কনট্যাক্ট আছে। এই দেখুন…’ বলে প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল নন্দরাম।
তার পরের ঘটনাগুলো শ্রীধর যেন স্লো মোশানে দেখতে পেলেন।
নন্দরাম ওর পকেট থেকে পয়েন্টস লেখা কাগজ বের করার বদলে একটা ০.২২ ক্যালিবারের হ্যান্ডগান বের করে নিয়েছে, এবং লেসার পয়েন্টার লাগানো ছোট্ট পিস্তলটা ধীরে-ধীরে উঁচিয়ে ধরছে শ্রীধরের দিকে।
‘ওয়ালথার টি-পি-এইচ স্টেইনলেস’ ডাবল অ্যাকশন হ্যান্ডগান। ম্যাট ফিনিশ স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। ওজন মাত্র ৩৯৫ গ্রাম। ছ’রাউন্ড গুলি ছোড়া যায়। পিস্তলের হাতলটা কালো রঙের সিনথেটিক মেটিরিয়াল।
চেহারায় ছোটখাটো কিন্তু বেশ কাজের এই হ্যান্ডগান দিব্যি প্যান্টের পকেটে এঁটে যায়।
কুশিয়াও কিন্তু বসে ছিল না। নন্দরামকে অনুকরণ করে সে-ও একটা ওয়ালথার টি-পি-এইচ স্টেইনলেস পকেট থেকে বের করে নিয়েছে এবং সেটা তাক করছে শ্রীধরের দিকে।
‘আমরাই সেই টেররিস্ট, মার্শাল, স্যার—।’ কুশিয়া দাঁতে দাঁত চেপে চাপা গলায় বলল।
•
এরকম সংকটের মুহূর্ত শ্রীধর পাট্টার জীবনে অনেক এসেছে। তিনি যখন চোদ্দো বছরের পিলটু তখন থেকেই। সুতরাং শ্রীধরকে কেউ চমকে দিতে পারে না, ওঁর কাছে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে কিছু নেই। আসলে সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হওয়াটা যে কত বড় ‘যোগ্যতা’ শ্রীধর পাট্টা তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
নন্দরাম এবং কুশিয়া যতই সিকিওরিটি ফোর্সের সদস্য হোক ওরা কখনওই শ্রীধর পাট্টার কাছে সন্দেহের ওপরে ছিল না—বরং বলা যায়, সন্দেহের অনেকটা নীচে। আসলে শ্রীধরের কাছে—একমাত্র তিনি নিজে ছাড়া—আর কেউই সন্দেহের ওপরে নয়।
