ওঁর পা ফেলার ঢং থেকে আত্মবিশ্বাসের বিকিরণ টের পেলেন ডক্টর। অবাক হয়ে ভাবলেন, মানুষটা কোথা থেকে কোথায় এসে পৌঁছেছে! ওল্ড সিটির আবর্জনায় তেরো বছর কাটিয়ে শ্রীধর হয়তো দাঁত-নখের লড়াইটা শিখেছেন, কিন্তু লেখাপড়া?
উত্তরটা শ্রীধরের নানান থেরাপি সেশান থেকেই পেয়েছেন রঙ্গপ্রকাশ। বলধর পাট্টা ‘হারানো’ ছোট ভাইকে খুঁজে পাওয়ার পর দশবছর ধরে তাকে নিবিড় প্রশিক্ষণ দিয়েছেন—নানান বিষয়ে। তার মধ্যে প্রধান ছিল ইংরেজি শেখা আর ম্যানার্স শেখা। এ দুটো শেখার জন্য শ্রীধরকে দু-বছর ক্যালিফোর্নিয়ায় রেখেছিলেন বলধর। সেখানে ওঁর জন্য স্পেশাল প্রাইভেট কোচিং-এর ব্যবস্থা ছিল।
তারপর এল জাপানের পালা। কিক বক্সিং আর সামুরাই সোর্ড। এই দুটো বিষয়ে শ্রীধরের আগ্রহ আর দক্ষতা বলধর পাট্টাকে অবাক করেছিল। তিন বছর ট্রেনিং-এর পর শ্রীধর যেখানে পৌঁছেছিলেন একজন প্রতিভাবান শিক্ষার্থী সাধারণত দশ বছরে সেখানে পৌঁছোতে পারে।
জাপান থেকে ফেরার পর বাড়িতে থেকেই শ্রীধর লেখাপড়া শিখেছেন আর শরীরচর্চা করে গেছেন। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন লড়াইয়ে শ্রীধর নাম দিয়েছেন। ওঁর সাকসেস রেট ছিল নাইনটি ওয়ান পারসেন্ট।
বলধর লক্ষ করেছিলেন, শ্রীধরের মধ্যে একটা সহজাত পশু-প্রবৃত্তি রয়েছে। সেটা হল, প্রতিপক্ষকে চূর্ণ বিচূর্ণ করা, খতম করা। এই অ্যানিম্যাল ইনস্টিংকট-ই শ্রীধরের মেজর অ্যাসেট।
শ্রীধরের লেখাপড়ার প্রায় পুরোটাই ইন্টারনেটের মাধ্যমে শেখা, অথবা বিদেশ থেকে আনা কাস্টম-বিলট মাইক্রোসিডি কমপিউটারে চালিয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। সবকিছু শেখার ব্যাপারে ওঁর অসাধারণ মেমোরি ওঁকে দুর্দান্তভাবে সাহায্য করেছে। এবং সেই সময়ে শ্রীধর যতগুলো অন-লাইন টেস্ট দিয়েছেন তার সবগুলোতেই দারুণ রেজাল্ট করেছেন।
শ্রীধরকে নিয়ে বলধর পাট্টা খুব গর্ব অনুভব করতেন। একটা সময়ের পরে তিনি শ্রীধরকে সত্যি-সত্যি নিজের ভাই বলে ভাবতে শুরু করেন। মৃত্যুর মুহূর্ত পর্যন্ত ওঁর এই ভাবনা অটুট ছিল।
রঙ্গপ্রকাশ ছোট-ছোট পা ফেলে পায়চারি করছিলেন। কী এক কৌতূহলে তিনি কনফারেন্স রুম ওয়ানের কাচের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
স্বচ্ছ দরজা ভেদ করে রঙ্গপ্রকাশের দৃষ্টি দূরে পৌঁছে গেল।
একটা কাচের ঘর দেখতে পাচ্ছিলেন। সেই ঘরের দরজায় হলোগ্রাম দিয়ে রঙিন ডিজাইন করে লেখা রয়েছে ‘ভিজিটর’।
ঘরের ভেতরে প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন শ্রীধর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, একটা চাপা অস্থিরতা ওঁর ভেতরে কাজ করছে। শরীরের ওজনটা বারবার এক পা থেকে আর-এক পায়ে নিচ্ছেন, থেকে-থেকেই তাকাচ্ছেন স্টেইনলেস স্টিলের প্যাঁচানো সিঁড়ির দিকে।
একটু পরেই কালো য়ুনিফর্ম পরা তিনজন লোক সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। কাচের দেওয়ালে পেরিয়ে শ্রীধর পাট্টাকে দেখতে পেল। সুতরাং লক্ষ্য স্থির করে তিনজনে দম দেওয়া খেলনা পুতুলের মতো ‘ভিজিটর’ লেখা ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল।
শ্রীধরের কাছে পৌঁছে ওরা মিলিটারি কায়দায় স্যালুট ঠুকল।
শ্রীধর একচিলতে হেসে ওদের অভিবাদন ফিরিয়ে দিলেন।
তিনজনের মধ্যে যার বয়েস একটু বেশি সে-ই বোধহয় সিকিওরিটি চিফ—কারণ, তার য়ুনিফর্মের বুকের কাছে লাল ও নীল রঙের দুটো কাপড়ের স্ট্রিপ, আর তার ওপরে চারটে করে মেটাল স্টার।
বছর চল্লিশের মানুষটার লম্বাটে মুখ যেন তামাটে পাথরে খোদাই করা। চোখ দুটো ছোট-ছোট। দু-গাল এমন বসে গেছে যে, হঠাৎ করে প্রেত বলে মনে হয়।
মাথার টুপিতে আঙুল ছুঁইয়ে চিফ বলল, ‘স্যার, এই যে—এরা দুজন—কুশিয়া চতুর্বেদী আর নন্দরাম সরখেল। ওরা একটা টেররিস্ট গ্রুপের কিছু টপ সিক্রেট ইনফরমেশান লাকিলি জানতে পেরেছে।… সেই…সেই ইয়েগুলো আপনাকে জানাতে চায়। ফার্স্ট হ্যান্ড…।’
শ্রীধর কুশিয়া আর নন্দরামকে দেখলেন। শুধু দেখলেন না, ঠান্ডা দৃষ্টিতে মেপেও নিলেন। বয়েস খুব বেশি হলে চব্বিশ কি পঁচিশ। দুজনেরই মুখে একটা ‘খোকা-খোকা’ ভাব। নিষ্পাপ চোখ, তেলতেলে মুখ, চওড়া গোঁফ।
সব মিলিয়ে মুখ দুটোয় বেশ মিল আছে।
বেশ কয়েক সেকেন্ড পর শ্রীধর চিফের দিকে তাকালেন। তারপর হাতের ইশারায় চিফকে ডিসমিস করে দিলেন, বললেন, ‘আপনি এবার আসতে পারেন…।’
ঘরের এক কোণে একটা বড় সোফা রাখা ছিল। সেটার দিকে ইশারা করে কুশিয়া আর নন্দরামকে বসতে বললেন শ্রীধর। ওরা বাধ্য ছাত্রের মতো ‘স্যার’-এর কথা শুনল। সোফার কাছে গিয়ে পাশাপাশি বসে পড়ল দুজনে।
নিউ সিটির টেররিস্ট গ্রুপ সত্যিই বেশ চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রীধরের খুব ছোটবেলায় পিস ফোর্সের যে-বিদ্রোহ হয়েছিল বলধর পাট্টা তার আগুন নেভাতে পেরেছিলেন। বলধর জানতেন, যদি একটা মানুষের জীবনযাপনের সব আরাম তাকে উপহার দেওয়া যায় তা হলে সে আর বিদ্রোহ করবে না। তাই নিউ সিটির মানুষের রোজকার জীবনের যা-যা বস্তুতান্ত্রিক চাহিদা, যদি নিখুঁতভাবে তার নিয়মিত জোগান দেওয়া যায়, তা হলে কারও আর কোনও ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকবে না।
সেই পথই ধরেছিলেন বলধর। পিস ফোর্সের গার্ডÇদের কোনও অভাব রাখেননি, কিন্তু একইসঙ্গে তাদের ওপরে গোপন নজরদারির তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
