জোরে-জোরে শ্বাস টানলেন শ্রীধর। জিভের ডগাটা দু-ঠোঁটের ফাঁকে চট করে এপাশ-ওপাশ নাড়লেন। তারপর কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে নতুন তেজে ফিরে এলেন জিশানের কাছে।
‘জিশান, তুমি সত্যি কথা বলছ কি না সেটার জন্যে আমি একটা ছোট্ট এক্সপেরিমেন্ট করব। এই এক্সপেরিমেন্টটা কিউ অ্যান্ড এ-র ডিজাইন। মানে, ওই…’ হাত তুলে দুই বিজ্ঞানীর দিকে দেখালেন শ্রীধর : ‘…আচারিয়া আর চক্রপাণির ইনভেনশান। এই এক্সপেরিমেন্টটার মজা হচ্ছে এতে তোমার কোনও ফিজিক্যাল পেইন হবে না। য়ু ওন্ট বি হার্ট। য়ু উইল রিমেইন ইন গুড হেলথ—অ্যান্ড ইন ওয়ান পিস। কিন্তু…না:, থাক—বলব না। সে তুমি দেখতেই পাবে। এই ”কিন্তু”টাই এক্সপেরিমেন্ট। নাউ গেট রেডি অ্যান্ড বি স্টেডি…।’ মোলায়েম হেসে কথা শেষ করলেন শ্রীধর পাট্টা।
তারপরই চোখের পলকে ঘুরে দাঁড়ালেন, তাকালেন পান্ডাদের দিকে। একজন গার্ডকে ইশারা করে বললেন, ‘ওদের নিয়ে যাও—যার-যার ডিউটি করার জন্যে ছেড়ে দাও। আর ওদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দাও। আমি তোমার বসকে ক্লিয়ারেন্স কোড জানিয়ে দিচ্ছি…।’
পকেট থেকে আবার স্যাটেলাইট ভিডিয়োফোন বের করলেন। অন করে কার সঙ্গে যেন কথা বললেন। তারপর গার্ডদের দিকে ইশারা করে মাথা নাড়তেই ওরা পান্ডা, আনমোলদের রুক্ষভাবে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল।
জিশান লক্ষ করল, ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত পান্ডা জিশানের চোখে তাকিয়ে রইল।
বিজ্ঞানী দুজন জিশানের কাছাকাছি এগিয়ে এলেন। নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় কীসব আলোচনা করতে লাগলেন।
শ্রীধর ফোনে আবার কথা বলছিলেন। সংক্ষিপ্ত এবং তীক্ষ্ণ উচ্চারণে কাউকে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। নির্দেশ দেওয়া শেষ হওয়ার মিনিট তিন-চারেকেরই মধ্যেই ঘরে ছ’জন গার্ড ব্যস্তভাবে ঢুকে পড়ল। তাদের পিছন-পিছন চারজন লোক—তারা একটা বড়সড় ভারী মেটাল টপ কাঠের টেবিলকে শূন্যে ভাসিয়ে বয়ে নিয়ে আসছে।
টেবিলটা ঘরের একপ্রান্তে মাঝামাঝি রাখা হল। টেবিল থেকে ঘরের তিনটে দেওয়ালেরই দূরত্ব অন্তত দশফুট।
চারজন টেবিল-বাহক ঘর ছেড়ে চলে গেল। ছ’জন গার্ড টেবিলটাকে অর্ধচন্দ্রের ঢঙে ঘিরে দাঁড়াল। কোমর থেকে শকার খুলে তরোয়ালের মতো উঁচিয়ে ধরল।
জিশানের মনে হচ্ছিল, কোনও একটা নাটকের শোয়ের জন্য স্টেজ তৈরি করা হচ্ছে, তার ওপরে প্রপস সাজানো হচ্ছে। শুধু কুশীলবদের স্টেজে ঢুকে পড়াটাই বাকি।
এ এবং কিউ তখন নিজেদের মধ্যে বিজ্ঞানের জটিল কোনও বিষয় নিয়ে হাত-মুখ-চোখ নেড়ে গভীর আলোচনা করছেন। এবং মাঝে-মাঝেই হাই তুলছেন।
শ্রীধর পাট্টা ওঁর বাঁ-হাতের নখ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। সেই অবস্থাতেই বললেন, ‘জিশান, এবার তোমাকে টি-শার্টটা খুলে ফেলতে হবে।’
জিশান চমকে উঠে শ্রীধরের দিকে তাকাল। এ কী বলছেন শ্রীধর? গায়ের জামা খুলে ফেলতে হবে?
শ্রীধর হাসলেন, ছন্দবাণীতে বললেন, ‘খোলো, খোলো। এবার তোমার শো হবে সোলো—।’
শ্রীধর যে অধৈর্য হয়ে পড়েছেন সেটা বোঝা গেল ওঁর কথা বলার ভঙ্গিতে। কারণ জিশানকে লক্ষ্য করে শব্দগুলো উচ্চারণ করার সময় তিনি ডানহাতের দু-আঙুলে টুসকি দেওয়ার চটাচট শব্দ করলেন।
জিশান অবাক চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে পোলো নেক টি-শার্টটা খুলতে শুরু করল।
শ্রীধর এবার বিজ্ঞানী দুজনের দিকে তাকালেন। ভুরু উঁচিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনারা দুজন কি তৈরি?’
‘ইয়েস, স্যার।’ চটপট জবাব দিলেন চক্রপাণি। আচারিয়ার দিকে তাকালেন। এবং ঘুম তাড়াতে আঙুল দিয়ে দু-চোখ রগড়ে নিলেন।
আচারিয়া সাদা-কালো চেকশার্ট পরেছিলেন। সঙ্গে চকোলেট রঙের ঢোলা ট্রাউজার্স। তারই পকেটে ব্যস্তভাবে হাত ঢোকাতে-ঢোকাতে বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার, আমরা তৈরি—।’
জিশানের খারাপ লাগল। বাবার কথা মনে পড়ল। শ্রীধর পাট্টার মতে নিউ সিটির এক নম্বর এবং দু-নম্বর সায়েন্টিস্ট যথাক্রমে একনম্বর এবং দু-নম্বর চাকরের মতো আচরণ করছে! শিক্ষা-দীক্ষা বিজ্ঞান এঁদের মধ্যে মর্যাদাবোধ তৈরি করতে পারেনি।
গণপত আচারিয়া পকেট থেকে একটা কৌটো বের করে নিলেন। তারপর সেটা উঁচিয়ে ধরে শ্রীধরকে দেখালেন। জিশানও সেটা দেখল।
দুই কি আড়াই ইঞ্চি ব্যাসের একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের কৌটো। উচ্চতায় ইঞ্চি চারেক হবে। কৌটোর ভেতরে চকচকে অথচ স্বচ্ছ একটা তরল। আলো পড়ে ধাতুর মতো ঝিকমিক করছে। অথচ পারদ নয়—তার তুলনায় ঘনত্ব অনেক কম। কোনও তরলের এরকম রং জিশান আগে কখনও দেখেনি।
ওর টি-শার্ট খোলা হয়ে গিয়েছিল। সেটা মেঝেতে ফেলে দিল। খালি গায়ে দাঁড়িয়ে শীতাতপের প্রভাবে ওর শীত করতে লাগল।
জিশান অপেক্ষা করতে লাগল। শ্রীধরের এর পরের নির্দেশ কী হবে কে জানে! ওর কর্ডের প্যান্টটার ভাগ্যেও কি টি-শার্টের পরিণতি লেখা আছে?
•
সেটা বোঝা গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই।
শ্রীধর পাট্টা জিশানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জিশানের শরীর পরখ করছিলেন। ফরসা, সুঠাম দেহ। বুকের মাঝখানটা সামান্য লোমশ। কিন্তু তার জন্য উদ্ধত পেশিগুলো দেখতে কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে, এ-দেহ অনেক লড়াই দেবে।
শ্রীধরের মনে-মনে নেওয়া ‘পরীক্ষা’য় জিশান বোধহয় পাশ করল। কারণ, শ্রীধর ছোট্ট করে সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন এবং হাসলেন।
