মুখে এতরকম ‘কারুকাজ’ থাকা সত্বেও পান্ডাকে জিশানের চিনতে ততটা সময় লাগেনি। কারণ, মানুষটা চঞ্চলভাবে এপাশ-ওপাশ তাকাচ্ছিল। জিশানকে লক্ষ করামাত্রই ও জিশানের দিকে অনেকক্ষণ স্থির নজরে তাকিয়ে থেকেছে। তারপর ঠোঁট জোর করে টেনে লম্বা করে সামান্য হাসি ফুটিয়ে তোলারও চেষ্টা করেছে।
আশ্চর্য মানুষ বটে! সামনে খোদ শ্রীধর পাট্টা হাজির—তবুও কোনও ভয়ডর নেই।
ওরা তিনজন ছাড়াও একজন আহত যুবক ওদের সঙ্গে ছিল। জিশান তাকে চিনতে পারল না।
হঠাৎই পান্ডা খসে পড়ে গেল মেঝেতে।
সঙ্গে-সঙ্গে দুজন গার্ড ঝুঁকে পড়ে ওকে ঝটকা মেরে টেনে তুলল। আবার দাঁড় করিয়ে দিল।
পান্ডা দাঁড়িয়ে রইল বটে, কিন্তু ওর দেহটা সামান্য নড়তে লাগল।
অন্য সময় হলে জিশান ভাবত পান্ডা নেশা করেছে। কিন্তু এখন ওর মনে হল, পিস ফোর্সের গার্ডরা পান্ডাকে অসম্ভব মারধোর করেছে। তাই ও ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না।
‘জিশান—!’ হঠাৎই চেঁচিয়ে ডেকে উঠলেন শ্রীধর পাট্টা।
ডাকটা শোনামাত্রই গার্ডরা কেমন যেন অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে চলে গেল। কিন্তু জিশান শুধু স্লো মোশানে চোখ ফেরাল টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মার্শালের দিকে।
‘জিশান, কাল রাতে তুমি ক্যাম্পাস ছেড়ে বাইরে বেরিয়েছিলে, তাই না?’
প্রশ্নটা শুনে জিশানের হঠাৎই মনে হল, শ্রীধর এখনও এই প্রশ্নটার সুনিশ্চিত উত্তর পাননি। এই চারজন মানুষের ওপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়ে শ্রীধর যদি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতেন তা হলে জিশানকে আর এই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতেন না। সুতরাং জিশান বুঝতে পারল ওর উত্তর কী হওয়া উচিত।
একইসঙ্গে ও ভেবে দেখল, শ্রীধর কতটা খবর পেয়েছেন বা পাননি তার ওপরে ওর উত্তরটা নির্ভর করছে না। ও যদি বলে, হ্যাঁ, ও কাল রাতে জিপিসি ছেড়ে বেরিয়েছিল তা হলে আনমোল, পান্ডাদের ওপরে টরচার আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। বরং উলটো উত্তরটাই সঠিক উত্তর: না, ও ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরোয়নি। শ্রীধরের নলেজ বেসের স্টেটাসের সঙ্গে এই উত্তরটার নড়চড় হওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই।
জিশান জবাব দিল, ‘না, আমি ক্যাম্পাস থেকে বেরোইনি।’
ঘরের সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে মিহি গলায় হেসে উঠলেন শ্রীধর। তারপর মুখ নামিয়ে তাকালেন জিশানের দিকে। ভুরু উঁচিয়ে ব্যঙ্গের সুরে জিগ্যেস করলেন, ‘তাই? বেরোওনি? লক্ষ্মীছেলে হয়ে ছিলে? ঘুমু-ঘুমু করছিলে?’
জিশান চুপ করে রইল। ভাবতে চেষ্টা করল, এরপর শ্রীধর কোন পদক্ষেপ নেবেন।
শ্রীধর পাট্টা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। ঘাড় ঘুরিয়ে জিশানের দিকে একবার দেখলেন, তারপর তাকালেন পান্ডাদের দিকে। চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন, ‘এই চারটে লক্ষ্মীছাড়া জানোয়ারও একই কথা বলছে। অথচ এদের একজনের ছবি ই-ল্যান্ডের ক্লোজড সার্কিট টিভির ফুটেজে ধরা পড়েছে। তা ছাড়া কাল রাতে গেস্টহাউস বিল্ডিং-এর চারটে সারভেইল্যান্স জোন কী কারণে যেন সাডেনলি ডি-অ্যাক্টিভেটেড হয়ে গিয়েছিল। ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। আপনারা কী বলেন, এ এবং কিউ?’ মনসুখ চক্রপাণি আর গণপত আচারিয়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে শেষ প্রশ্নটা করলেন শ্রীধর পাট্টা।
ওঁরা দুজনে একইসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘অফ কোর্স গোলমেলে—সাসপিশাস।’
সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন শ্রীধর। পান্ডাদের দিকে বেশ কয়েক পা এগিয়ে গেলেন। জিশানের দিকে একবার ফিরে তাকালেন। তারপর আবার এগোলেন। একেবারে পান্ডার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। এবং কোনওরকম ভূমিকা ছাড়াই পান্ডার গালে সপাটে এক থাপ্পড় কষালেন।
বিকট শব্দ হল। পান্ডা ছিটকে পড়ে গেল মার্বেলের মেঝেতে। কিন্তু ওর মুখ থেকে কোনও যন্ত্রণার শব্দ বেরোল না।
শ্রীধরের হাতে বোধহয় রক্ত-টক্ত লেগে গিয়েছিল। তাই সামনে দাঁড়ানো একজন গার্ডের য়ুনিফর্মে হাতটা ঘষে-ঘষে মুছলেন। বললেন, ‘এক্ষুনি গিয়ে য়ুনিফর্মটা পালটে নাও—।’
সঙ্গে-সঙ্গে অ্যাবাউট টার্ন করে গার্ড চলে গেল।
পান্ডা তখনও মেঝেতে পড়ে ছিল। গালে আলতো করে হাত বোলাচ্ছিল। আর ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে ছিল শ্রীধরের দিকে। শুধু শ্রীধরেরই দিকে।
শ্রীধর সেই ঠান্ডা দৃষ্টি সহ্য করতে পারলেন না। একটা নোংরা গালাগাল দিয়ে বুটের এক লাথি কষিয়ে দিলেন পান্ডার পাঁজরে।
সংঘর্ষের শব্দ হল। পান্ডার শরীরটা ভাঁজ খেয়ে গেল আঘাতে। কিন্তু না—এত সত্বেও ওর মুখ থেকে কোনও শব্দ বেরোল না। কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটাকে খানিকটা সোজা করে ও আবার তাকিয়ে রইল শ্রীধরের দিকে।
সেই অভিব্যক্তিহীন ঠান্ডা দৃষ্টির সামনে পড়লে কেমন যেন অস্বস্তি হয়। জিশান দেখল, শ্রীধর পাট্টা চোখ সরিয়ে নিলেন পান্ডার দিক থেকে।
এই ছোটখাটো দুর্বল মাতাল মানুষটার কী অবিচল নি:শব্দ প্রতিরোধ! ওর দৃষ্টিতে জিশান যেন একইসঙ্গে দেখতে পেল ঘৃণা আর প্রতিবাদ।
সত্যি, জিশানকে ওরা কীভাবে আগলে রেখেছে! দু-হাতের তালুর আড়ালে নিশ্চিন্তে স্থির হয়ে থাকা জ্বলন্ত প্রদীপের শিখার মতো। হাত দুটো আঘাতে-আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও তাদের আড়ালে প্রদীপের শিখা অবিচল, অমলিন।
মনে-মনে পান্ডাদের সেলাম জানাল জিশান। মানুষগুলো এত সয়েছে ওর জন্য! এত!
শ্রীধর পকেট থেকে ছোট্ট শিশি বের করলেন। ওপরদিকে মুখ তুলে হাঁ করলেন। তারপর শিশি থেকে তিন ফোঁটা তরল মুখের ভেতর ঢেলে দিলেন।
