রতনকুমার দৌড়ে গিয়ে দেখে এসে বলল, হায়েনা। সিঙ্গিসায়েব এবার হায়েনা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ পাবেন?
হায়েনাটা ওরা মেরে ফেললে কী করে সুযোগ পাবেন?
রতনকুমার হাসল। মারবে না। তবে হায়েনাটার গায়ে দগদগে ঘা করে দেওয়া হবে। তাই এমন করে বল্লম দিয়ে খোঁচাচ্ছে দেখছেন না?
ওই বেঁটে ভদ্রলোক কে বলুন তো?
ওর নাম জগদীশ। এলাকায় সবাই জগাগুণ্ডা বলে। এখন সিঙ্গিসায়েবের ডান হাত।
কথা বলতে বলতে আমরা ফিরে এলুম ফার্মহাউসে। রতনকুমার সাপ ঘরটার দিকে চলে গেল। ওকে যগর্ভ পাহাড়ের সাপ আর আলোটার কথা জিগ্যেস করব ভাবছিলুম। ও এমন হঠাৎ করে চলে গেল যে সে সুযোগই পেলুম না। সাপঘরের দিকে প্রাণ গেলেও যাব না। সাপ দেখলেই আমার গা গুলোয়।
দুর্ভাগা হায়েনাটার জন্য মন খারাপ হয়ে গেল। হায়েনাকে নিরীহ প্রাণী বলা যায়, যদিও তার নামে শিশুচুরির বদনাম রটে। বনে জঙ্গলে বহুবার হায়েনার ডাক শুনেছি। মানুষের পৈশাচিক হাসির মতো কতকটা। কিন্তু এবার হায়েনার কান্না শুনতে পেলুম!….
শঙ্খচূড়ের আবির্ভাব
দুপুরের আগেই কর্নেল ও জয়রামবাবু ফিরে এলেন। প্রচুর আঠা এনেছেন। খাওয়া-দাওয়ার পর কর্নেল, জয়রামবাবু জগদীশ আর রতন সেই পাহাড়ের দিকে রওনা হল। আমিও সঙ্গ ধরলুম। প্রচণ্ড রোদ তখনও। তবে গাছপালার ভেতর দিয়ে যেতে তত কষ্ট হচ্ছিল না। দুটো টিনভর্তি তরল আঠা বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল জগদীশ আর রতন।
পাহাড়টা দূর থেকে যত ন্যাড়া ভেবেছিলুম, ততটা নয়। বেঁটে চ্যাপ্টা পাতাওয়ালা কিছু গাছও আছে। তবে পাহাড়ের গায়ে নানা আকারের সব পাথর। তার আড়ালে শঙ্খচূড় থাকা খুবই সম্ভব। জয়রামবাবু সবার আগে। বারবার সাবধান করে দিচ্ছিলেন। আমি পেছনে। সবসময় মাটিতে এপাশ-ওপাশে নজর রেখে উঠছি।
কিছুটা নিচে দাঁড়িয়ে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে অনেকক্ষণ গুহার মুখটা দেখলেন। তারপর বললেন, আমার সঙ্গে বরং এই ভদ্রলোক আসুন টিন নিয়ে। রতনকে দেখালেন কর্নেল।
জয়রামবাবু কেমন হেসে বললেন, রতন কেন, জগদীশকে নিন আপনি। জগদীশ খুব সাহসী লোক। রতন ভীতু। আর আমিও বারবার শঙ্খচূড়টার তাড়া খেয়েছি, আমার বুক ঢিপঢিপ করছে। ও জয়ন্তবাবু, আপনি বরং এখানেই থাকুন। কাজ নেই মশাই গুহার কাছে গিয়ে। : কর্নেল জগদীশকে সঙ্গে নিয়ে উঠে গেলেন গুহার দিকে। আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। জয়রামবাবু ডাকলেন, এস রতন, আমরা বরং গুহার ওপাশটায় আঠাটা ছড়িয়ে আসি।
একটা উঁচু পাথরে ঝটপট উঠে দাঁড়ালুম। রতন ও জয়রামবাবু বাঁ-পাশ দিয়ে উঠে বড় বড় পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হলেন। কিন্তু কর্নেল ও জগদীশকে দেখতে পাচ্ছিলুম। জগদীশ আঠার টিনটি নামিয়ে রেখেই প্রায় দৌড়ে আমার কাছে চলে এল। কর্নেল আঠাটা ছড়াচ্ছেন না। বাঁ দিকে তাকিয়ে আছেন কেন বুঝতে পারলুম না। একটু পরে হঠাৎ জয়রামবাবুর বিকট চিৎকার শোনা গেল, সাপ! সাপ! পরই কর্নেলকে দেখলুম পকেট থেকে রিভলভার বের করে বাঁদিকে ছুটে গেলেন। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আমি ঠকঠক করে কাঁপতে থাকলুম।
জগদীশ এক লাফে নিচে নামল। তারপর প্রায় গড়াতে গড়াতে পাহাড় বেয়ে নামতে থাকল।
এবার যা দেখলুম, চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না। গুহার ভেতর থেকে একদঙ্গল পুলিশ বেরিয়ে এল। তারা বন্দুক পিস্তল উঁচিয়ে বাঁদিকে দৌড়ে গেল।
এতো দেখছি ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়ালের মতো ব্যপার। ছিল শঙ্খচূড় সাপ, হয়ে গেল পুলিশ।
আর দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব। ভয় পাওয়াও চলে না। হাঁপাতে হাঁপাতে গুহার কাছে উঠে গেলুম। ডাইনে ঘুরে দেখি তাজ্জব ব্যাপার। জয়রাম সিঙ্গির হাতে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের দল নেমে যাচ্ছে পাহাড় থেকে।
কর্নেল আমাকেই খুঁজছিলেন সম্ভবত। দেখতে পেয়ে ইশারায় ডাকলেন। কাছে গিয়ে বললুম, এ কি ভেলকির খেলা কর্নেল!
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আর একটু দেরি হলে রতন বেচারাকে বাঁচাতে পারতুম না! সিঙ্গি ওর গায়ে সাপের বিষের ইনজেকশান দিতে যাচ্ছিল।
কর্নেল নামতে থাকলেন পাহাড় থেকে। বললুম, কী সাংঘাতিক লোক!
কর্নেল বললেন, সিঙ্গি টের পেয়েছিল রতন আমাকে চিঠি লিখে সব জানিয়েছে। অতি-চালাক এবং শয়তান কি না! তাই শঙ্খচূড় ফাঁদ পেতেছিল। আমার উপস্থিতিতেই রতনকে খুন করত এবং আমাকে বোকা বানাত। ওর সিরিঞ্জে জোড়া সুচ আছে। বিষাক্ত সাপের দাঁতের চিহ্ন এবং পোস্টমর্টেমে রক্তে সাপের বিষও পাওয়া যেত। আসলে নৃশংস জ্বর জয়রাম সিঙ্গি এভাবে আমার ওপরও প্রতিশোধ নিতে মতলব করেছিল। তাই আমাকে একটা মিথ্যা শঙ্খচূড় সাপ ধরার অনুরোধ করে এসেছিল কলকাতা গিয়ে। হ্যাঁ, সাপের মাথার মণিটা আসলে একটা নীল ক্ষুদে বার্। কাল সকালে পাখি দেখতে বেরিয়ে ওটা আবিষ্কার করেছিলুম।
ফার্মহাউসে ফিরে দেখি, পুলিশে ছয়লাপ। সাপঘরে তল্লাশি করে সেই ক্যাপসুলগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আশংকর শর্মার জিপে আমরা সম্বলপুর রওনা হলুম। পথে হঠাৎ শেয়ালের ফাঁদটার কথা মনে পড়ল। জিগ্যেস করলুম, শেয়ালের ফাঁদে পড়ার পর আপনার অত হাসির কারণ কী কর্নেল?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, কেউ কেউ আমাকে আড়ালে বুড়োঘুঘু বলে ডাকে। শেয়ালের ফাঁদে পড়ার পর মনে হয়েছিল এবার কি তাহলে পুরনো খেতাব বাদ দিয়ে বুড়ো শিয়াল বলে ডাকবে? তবে শেয়াল খেতাব মন্দ না। শেয়াল অতিশয় ধূর্ত প্রাণী। এই ভেবেই হাসি এসে গিয়েছিল। বলে কর্নেল কালকের মতো আবার হাসিতে ফেটে পড়লেন।
