জয়রামবাবু কি নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের চোরাকারবার করেন? মনে এই সন্দেহ দানা বাঁধছিল। তাছাড়া রাত দুপুরে এভাবে দুটো লোকের সঙ্গে ক্যাপসুলের প্যাকেট নিয়ে কথা বলার কী কারণ থাকতে পারে?
সাতপাঁচ ভাবছি এবং ততক্ষণে উত্তেজনার ফলে ক্লান্তিও বোধ করছি, এমন কময় কর্নেল সরে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর কানে কানে বললেন, পেছন-পেছন এস।
এবার পুকুরপাড়ে না গিয়ে সোজা বাঁহাতি এগিয়ে একফালি সরু রাস্তায় পৌঁছুলুম। রাস্তাটা নক্ষত্রের আলোয় সাদা দেখাচ্ছিল। রাস্তার ওপাশে গাছ-পালা ঝোপঝাড় কালো হয়ে আছে। একটুও বাতাস বইছে না। রাস্তাটা ফার্ম এলাকার দক্ষিণ প্রান্তে ঘুরে পশ্চিমে চলেছে। কতক্ষণ পর সেই নালার কাঠের সাঁকোয় গিয়ে কর্নেল বললেন, কিছু বুঝলে?
ভদ্রলোক নিষিদ্ধ ড্রাগের চোরাকারবার করেন মনে হচ্ছে।
ওগুলো মাদক নয়। কর্নেল আস্তে বললেন। ওই ক্যাপসুলের মধ্যে আছে ভয়ঙ্কর ভাইরাস। সাপের বিষের সঙ্গে শেয়ালের ক্ষত থেকে একরকম জীবাণু নিয়ে মিশিয়ে জয়রাম সিঙ্গি ওই মারাত্মক ভাইরাস বা জীবাণু সৃষ্টি করতে পেরেছে। লোকটার বৈজ্ঞানিক প্রতিভা আছে সন্দেহ নেই। কেসময় বিদেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আণবিক জীববিজ্ঞানের গবেষণা করত শুনেছি।
অবাক হয়ে বললুম, ওই ভাইরাস দিয়ে কী করবেন সিঙ্গি মশাই?
কোনও দেশের ফসলের মাঠে কয়েকটা ক্যাপসুল ভেঙে ছড়িয়ে দিলে সব ফসলে রোগ ধরে যাবে। ইচ্ছে করলে দেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা যাবে। মাঠের পর মাঠ যদি ফসলে রোগ ধরে যায়, তাহলে কী সাংঘাতিক অবস্থা হবে বুঝতে পারছ? তাছাড়া জল সংক্রামিত হয়ে মহামারীও হওয়া বিচিত্র নয়। বুঝতেই পারছ, কোনও শত্রুদেশের সরকার এমন সাংঘাতিক অস্ত্রের জন্য প্রচুর টাকা দিতে রাজি হবে।
সর্বনাশ! এর কোনও প্রতিষেধক নেই?
জানি না। থাকলে জয়রাম সিঙ্গির কাছেই তার ফরমুলা থাকতে পারে।
আপনি কেমন করে জানলেন?
বিশ্বস্তসূত্রে। বলে কর্নেল হঠাৎ ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হাত তুললেন। ওই দেখো, জয়ন্ত। সাপের মাথার মণি জ্বলছে ষট্গর্ভ পাহাড়ের গায়ে।
তাকিয়ে দেখি, দূরে উঁচুতে একটা নীল আলোর বিন্দু ঝিকমিক করছে। ওটা নক্ষত্র নয়, তা ঠিকই। কিন্তু ওটা সত্যি যে শঙ্খচূড় সাপের মাথার মণি, তার প্রমাণ কী?
আমাদের মনের কথাটা বুঝি টের পেলেন ধুরন্ধর গোয়েন্দপ্রবর। কাঁধে হাত রেখে মৃদুস্বরে বললেন, ডার্লিং। এই পৃথিবীতেই বহু রহস্যময় জিনিস আছে, যা হঠাৎ চোখে পড়লে মানুষের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। যাকগে, এস। এবার গিয়ে ঘুমোনো যাক…
হায়েনার কান্না
সকালে কর্নেল জয়রামবাবুর সঙ্গে সম্বলপুর গেলেন জিপে চড়ে। মাইল ছয়েক দূরত্ব। আমি বেরোলুম না। রাতে ভাল ঘুম হয়নি। ভাবলুম সকালটা ঘুমিয়ে কাটানো যাবে। কিন্তু মনের ভেতর অস্বস্তি। এই ভয়ঙ্কর লোকের আতিথ্যে আর এক মুহূর্ত কাটাতে ইচ্ছা করছে না। উঠে গিয়ে বারান্দায় বসলুম। সামনে ফার্মের সবুজ শস্যক্ষেত। হঠাৎ দেখি, ভুট্টাক্ষেত থেকে রাতে দেখা সেই বেঁটে মোটা লোকটা বেরিয়ে আসছে। তার হাতে অ্যালসেশিয়ানের চেন। কুকুরটা লাল জিভ বের করে পেছনে-পেছন আসছে। তাহলে রাত সাপঘরে দেখা দুটো লোকই সিঙ্গিমশাইয়ের কর্মচারী। রোগা লোটাকে একপলক দেখেছিলুম সকালে। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছিল।
ডোরাকাটা গেঞ্জি আর জিনসের প্যান্টপরা বেঁটে লোকটা আসতে আসতে থমকে দাঁড়াল। অ্যালসেশিয়ানটা লাফ দিয়ে ঘুরল। লোকটাও ঘুরে কান খাড়া করে কী শুনল। কুকুরটা এবার তাকে টানতে টানতে ফের ভুট্টাক্ষেতের ভেতর নিয়ে গেল। জয়রামবাবু বলেছিলেন, ফার্মের ফসলে মাঝেমাঝে দিনদুপুরে বুনো, শুয়োর, কখনও হরিণের পাল, এমনকী সংরক্ষিত বনজঙ্গল থেকে হাতির দলও এসে হানা দেয়। শেয়ালের ভুট্টা নষ্ট করার কথাও বলছিলেন তাই ভুট্টাক্ষেতের শেষ দিকটায় উঁচু মাচানে পাহারার ব্যবস্থা আছে। মাচানটা গাছের আড়ালে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এবার কানে এল ঢং ঢং ঢং করে ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দ হচ্ছে। ফার্মহাউস থেকে কয়েকজন লোককে দৌড়ে যেতে দেখলুম। তারা চ্যাঁচাতে চাচাতে ভুট্টাক্ষেতে গিয়ে ঢুকল। প্রত্যেকের হাতে লাঠি বল্লম টাঙ্গি। খুব উত্তেজনার ব্যাপার, আমি বারান্দা থেকে নেমে গাছতলায় দাঁড়ালুম। হাতির পাল নিশ্চয় নয়, হরিণ কি শুয়োর হতে পারে।
এমন সময় সেই রোগা লোকটা এল। রাতে লোকটাকে কেমন বদমাশ দেখাচ্ছিল। এখন দেখি, ভারি অমায়িক চেহারা। মুখে বিনয়ের হাসি। বলল, শেয়ালের ফাঁদে কোনও জন্তু পড়েছে। দেখতে যাবেন নাকি স্যার?
ব্যাপারটা দেখতেই হয়। ওর সঙ্গে যেতে যেতে জিগ্যেস করলুম, আপনি কি ফার্মের কর্মচারী?
সে বলল, হা স্যার। আমার নাম রতনকুমার পাত্র। আমি সিঙ্গি সায়েবের ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট।
রতনকুমার আমাকে ভুট্টাক্ষেতে ঢোকাল না। পাশ দিয়ে এগিয়ে নালার ধারে নিয়ে গেল। এখানেও একটা কাঠের সাঁকো আছে। সাঁকোতে একটু থেমে সে চাপা গলায় বলল, আমাকে কর্নেল সায়েব অনেকদিন থেকে চেনেন। তবে এ কথাটা দয়া করে এখানে কাউকে যেন মুখ ফসকে বলবেন না।
খুব অবাক হয়ে গেলুম। তাহলে কি সেই ভয়ঙ্কর ভাইরাস রহস্যের বিশ্বস্ত সূত্র এই লোকটিই?
কাল যেখানে কর্নেল ফাঁদে পড়েছিলেন, সেখান গোল হয়ে লোকগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বল্লম দিয়ে কোনও প্রাণীকে ফাঁদের গর্তে খোঁচাচ্ছে এবং হতভাগ্য প্রাণীটা কোঁ-কে করে আর্তনাদ করে উঠছে। দৃশ্যটা বীভৎস। অ্যালসেশিয়ানটা গর্তের দিকে ঝুঁকে ক্রমাগত গর্জন করছে। বেঁটে লোকটা তাকে আটকে রেখেছে কোনওরকমে। বললুম, থাক। আর যাব না। জন্তুটা কী দেখে আসুন তো রতনবাবু।
