আমরা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলুম। কর্নেল ফের বললেন, প্যাকেটটা সঙ্গে নিয়ে কেন যায়নি, একটু ভাবলেই বোঝা যায়। আমার মনে হচ্ছে, পিঁপড়ে-মানুষদের রাজাকে সে সমুদ্রের ধারে তার বেলুনের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। হয়তো বলেছিল, ওখানে গেলেই রাজাকে উপহারটা দেবে। তার মতলব ছিল, ওইভাবে ডেকে নিয়ে গিয়ে মণিটা কেড়ে নিয়ে বেলুনে চড়ে পালাবে। কিন্তু পিঁপড়ে-মানুষেরা বুদ্ধিমান। ওর মতলব টের পেয়েছিল।
আমার বুদ্ধি খেলল এবার। বললুম, উঁহু। তা নয়। বেলুনটা আমরা নিয়ে এসেছিলুম বলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে যখন পিঁপড়ে-মানুষরা কিছু পায়নি, তখন রেগে গিয়ে ওকে বন্দি করেছিল।
কর্নেল সায় দিলে বললেন, মন্দ বলোনি জয়ন্ত। সম্ভবত …
কর্নেলের কথা হঠাৎ বন্ধ হল। উনি কোণের দিকে গুটিয়ে রাখা বেলুনটার দিকে হঠাৎ এগিয়ে গেলেন। তারপর বলে উঠলেন, সর্বনাশ! বেলুনের অবস্থাটা কী করেছে! কুটিকুটি করে রেখে গেছে যে!
আমি ও ডঃ প্রসাদ হুমড়ি খেয়ে দেখতে লাগলুম। বেলুনের ভাজকরা রবারটা আর আস্ত নেই। ঝাঁঝরা হয়ে রয়েছে। তার মানে বেলুনটা আর ওড়ানো যাবে না। দোলনার মতো বাস্কেটটা টিকে আছে। তার মধ্যে বসার আসন, লজেন্সের প্যাকেট, অল্পস্বল্প কলকজা রয়েছে। পিঁপড়ে-মানুষেরা সে সব ছোঁয়নি। লজেন্সের প্যাকেটটা অন্তত নিয়ে পালানো উচিত ছিল। কেন নেয়নি?
ডঃ প্রসাদ একটু হেসে বললেন, আমরা লজেন্সগুলো দিয়ে ওদের সঙ্গে ভাব করব। কী বলেন কর্নেল?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ওই লজেন্সে তীব্র বিষ মেশানো আছে, ডঃ প্রসাদ।
আমরা দুজনে আঁতকে উঠলুম, সে কী! কীভাবে বুঝলেন?
কর্নেল বললেন, ওই দেখ, কত খুদে পিঁপড়ে আর পোকামাকড় মরে পড়ে রয়েছে। তাই দেখে পিঁপড়ে-মানুষেরা প্যকেটটা ছোঁয়নি। এবার আশা করি বুঝতে পারছ, লোকটাকে কেন ওরা অমন
আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে শাস্তি দিচ্ছিল।
ডঃ প্রসাদ বললেন, সর্বনাশ! পিঁপড়ে-মানুষেরা দেখছি ভারি ধূর্ত। আমরা বেরিয়ে গেছি, আর ওরা সেই ফাঁকে এতসব কাণ্ড করেছে। তার মানে, ওরা সারাক্ষণ আমাদের চোখে-চোখে রেখেছে। কিন্তু ওদের আস্তানা থেকে আমরা এতদূরে রয়েছি। আমরা ওদের অস্তানায় পৌঁছনোর আগেই অত তাড়াতাড়ি কীভাবে ওরা এখানে এল এবং ফিরে গেল?
কর্নেল বললেন, সেটা একটা রহস্য বটে। আমার মনে হচ্ছে এখানে কোথাও একটা সিধে পথ আছে, মাটির তলায়-তলায়। অর্থাৎ পিঁপড়ে-মানুষদের বসতি এখান থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে মাইলটাক দূরে। ওদিকটা জঙ্গল আর পাহাড়ে বড় দুর্গম দেখাচ্ছে।
এই সময় হঠাৎ জিম একটা চাপা-গরগর আওয়াজ করল। আগের আতঙ্ক মেশানো আওয়াজ। তারপর এক বিচিত্র দৃশ্য দেখলুম।
আমাদের সামনে খোলামেলা ঘাসের মাঠে আচম্বিতে পিলপিল করে কালো রঙের পিঁপড়ে-মানুষ যেন মাটি খুঁড়ে বেরুল। অসংখ্য জায়গা থেকে অসংখ্য পিঁপড়ে মানুষ আর তাদের
সঙ্গে সেই নেকুরের পাল।
বুঝলুম অজস্র গর্ত ছিল। ঘাসের আড়ালে। ওগুলো সুড়ঙ্গপথ। সেখান দিয়ে বেরিয়ে গোটা মাঠ জুড়ে একটা মোটা কালো রেখার মতো দাঁড়িয়ে আছে ওরা সামনে একটা করে নেকুর নিয়ে একজন করে পিঁপড়ে-মানুষ। নিশ্চয় ওরা সেনাবাহিনী।
তারপর দীর্ঘ সেই কালো রেখা অর্ধবৃত্তাকার হয়ে এগিয়ে আসতে থাকল আমাদের দিকে। কতক্ষণ হতবাক হয়েছিলুম কে জানে! হঠাৎ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, সমুদ্রের কাছে চলো সবাই! সমুদ্রের কাছে! তারপর দৌড়ে তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলেন।
কখন ষষ্ঠীচরণ রান্না ফেলে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলে উঠল, ওরে বাবা!
আমি রুদ্ধশ্বাসে বললুম, রাইফেল এনে গুলি ছুড়ি কর্নেল!
কর্নেল তাঁবুর ভেতর থেকে শুনতে পেয়ে বললেন, না জয়ন্ত; গুলি করে ওদের শেষ করে যাবে না। সারা দ্বীপের মাটির তলায়-তলায় দুর্গের মতো কোটি কোটি পিঁপড়ে-মানুষ রয়েছে মনে হচ্ছে; এস, সবাই সমুদ্রের দিকে পালাই।
আমরা চারজনে সব কিছু ফেলে পুবে সমুদ্রের দিকে দৌড়ে চললুম। কর্নেল শুধু বেতার যন্ত্রটা সঙ্গে নিয়েছেন দেখা গেল।
যখন বিচে পৌঁছলুম, তখন আমাদের দম আটকানো অবস্থা। বুঝতে পারছিলুম না, এখানে কীভাবে ওদের হাত থেকে বাঁচব। এদিকে সমুদ্র অনেকটা শান্ত! কর্নেল সোজা জলে নেমে গিয়ে ডাকলেন, এস জয়ন্ত। আসুন ডঃ প্রসাদ। আমরা এখন নিরাপদ।
ষষ্ঠীচরণ কর্নেলের দিকেই জলে নেমেছে। ঢেউয়ের ঝাঁপটায় কোমর অব্দি ভিজে যাচ্ছে। ওদের। আমি ডঃ প্রসাদও ওদের কাছে গেলুম। বললুম, কর্নেল! আমরা এখানে কীভাবে নিরাপদ? ওই তো ওরা এগিয়ে আসছে।
কর্নেল বেতার যন্ত্রের চাবি ঘুরিয়ে কোন বেতার ধরে রেখেছিলেন। বললেন, ওরা জলকে বড় ভয় পায়।
জিমকে আমি দুহাতে বুকের কাছে ধরে রেখেছি। সে থরথর করে কাঁপছে। বিচের ওধারে উঁচু ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে নেমে আসছে পালে পালে নেকুর। বীভৎস তাদের মুখভঙ্গি। জিভ লকলক করছে। পিঁপড়ে-মানুষেরা তিড়িং-বিড়িং করে নাচতে নাচতে আসছে ওদের পেছন-পেছন!
বিচের বালিতে এসে ওরা থমকে দাঁড়াল।
কর্নেল বেতার যন্ত্রে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন। শুনলুম উনি বললেন, হা-হা, ভেগা আইল্যান্ড। শীগগির হেলিকপ্টার নিয়ে আসুন। আমরা বিপন্ন।
ষষ্ঠীচরণ চোখ বুজে ঠকঠক করে কাঁপছে একহাঁটু জলে। জিম আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে। ডঃ প্রসাদ বিড়বিড় করে বলেছেন, আহা! ক্যামেরাটা আনলে কত ভাল হত! কেউ কি বিশ্বাস করবে আমাদের কথা?
