ডঃ প্রসাদ উত্তেজিতভাবে ফিসফিস করে বললেন, নেকুর! নেকুর!
নেকুর তাহলে পিঁপড়ে-মানুষদের কাছে পোষ মেনেছে! আবাক হয়ে নেকুর দেখতে থাকলুম। জন্তুটা জিমকে যেন আদর করছে। জিম তেমনি নিঃসাড়।
জিমের চারপাশে ঘুরে নেকুরটা খেলা করতে থাকল। সবাই এবার ভিড় করে খেলা দেখছিল। ঢিবিঘরগুলো থেকে ছোটবড় সব পিঁপড়ে-মানুষ ভিড় জমিয়েছে ততক্ষণে। এইসময় কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, সাবধানে নেমে এস তোমরা। ঢিবিঘরগুলোর পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকো। তারপর কী করতে হবে, বলে দেবখন।
সাবধানে তিনজনে পাথরের টুকরো আর খাঁজের অড়ালে নিচে নেমে গেলুম। বুঝলাম এই সমতল বিশাল গর্তমতো জায়গাটা কোনও যুগের আগ্নেয়গিরির ক্রেটার। ঢিবিঘরের পেছনে ঝোপের আড়ালে তিনজনে বসে পড়লুম।
তারপর দেখি, কখন ওদের অজান্তে বেলুনের লোকটা দড়ির বাঁধন খুলে ফেলেছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাক করে বেমক্কা রিভলভার থেকে গুলি ছুড়ল পরপর দুবার।
পলকের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে গেল। পিঁপড়ে মানুষেরা পিলপিল করে এদিকে ওদিকে ক্রেটারের কিনারায় ঢালু পাড়া বেয়ে উঠল এবং পালিয়ে গেল। রাজা ও রানি যেন হতভম্ব! স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটা বেদির ওপর লাফ দিয়ে উঠল এবং রাজার মুকুট ধরে টানাটানি শুরু করল।
নেকুরটা জিমকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল। এবার আকমকা গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল নোকটার ওপর। রিভলভার ছিটকে পড়ল নীচে। নেকুরটা ওর গলা কামড়ে ধরেছে! লোকটা বিকট আর্তনাদ করে হাত-পা ছুড়ছে।
কর্নেল বলে উঠলেন—চলে এস সবাই!
আমরা যেই দৌড়ে গেছি, রাজা-রানি তীরের মতো ছুটল উল্টোদিকে। বেদির কাছাকাছি পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে নেকুরটাও দৌড়ে পালিয়ে গেল। কর্নেল বেলুনের লোকটার কাছে হাঁটু দুমড়ে বসলেন। ওর গলাটা ফাঁক হয়ে গেছে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। ওকে বাঁচানোর উপায় ছিল না। এক মিনিটের মধ্যে হাত-পা খিচিয়ে ওর দেহটা শক্ত হয়ে গেল। সেই বীভৎস দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলুম।
জিম আমাকে দেখে এতক্ষণে ওঠার চেষ্টা করল। পারল না। ওকে দুহাতে বুকের কাছে তুলে নিলুম। ওর শরীর থরথর করে কাঁপছিল।
কর্নেল লোকটার পকেট হাতড়ে একটা নোটবই পেলেন। চিনা ভাষায় কী সব লেখা আছে। নোটবইটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে কর্নেল বললেন, আসুন ডঃ প্রসাদ, আমরা এখান থেকে কেটে পড়ি। বেচারি পিঁপড়ে-মানুষদের বিব্রত করে লাভ কী? ওদের কচি বাচ্চারা নিশ্চয় ঘরে আছে। ওরা না ফিরলে না খেয়ে মারা পড়বে।
ঠিক তাই। ঢিবিঘরের দরজায় খুদে পিঁপড়ে-মানুষেরা উঁকি দিচ্ছিল। দেখে মায়া হয়। আমরা চলে এলে ওদের মা-বাবা ফিরে এসে খেতে দেবে। এ-বেলা হয়তো বেলুনের লোকটার মাংস দিয়েই পিঁপড়েপুরীতে বড়রকমের একটা ভোজ হবে।
পাঁচ
তাঁবুতে ফিরে দেখি আরেক কাণ্ড। ষষ্ঠীচরণ বন্দী। কিচেন-তাঁবুর ভেতর তার ক্যাম্পখাটে ওকে কারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। যা দিয়ে বেঁধেছে, তা শক্ত ঘাসের দড়ি। ও ফ্যালফ্যাল করে তাকচ্ছে। মুখে কথা নেই।
কর্নেল একটা ছুরি দিয়ে বাঁধন কেটে ওকে মুক্ত করলেন। তখন ষষ্ঠীচরণ উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল এবং জব্বর একটা হাই তুলল।
বললুম, ব্যাপার কী ষষ্ঠী?
ষষ্ঠীচরণ বলল, খুব ঘুম পেয়েছিল স্যার!
তার জবাব শুনে অবাক হয়ে বললুম, কিন্তু তোমায় এমন করে বেঁধেছিল কারা?
এতক্ষণে ষষ্ঠীচরণের যেন খেয়াল হল। কাটা দড়িগুলো দেখে নিয়ে বলল, তাহলে আমাকে সত্যি সত্যি বেঁধেছিল ব্যাটাচ্ছেলেরা? আমি ভাবছি, স্বপ্ন দেখছিলুন। ওরে বাবা! এ কী বিদঘুটে জায়গায় এসে পড়েছি।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, তুমি নিশ্চয় আরাম করে খাটে শুয়েছিলে?
ষষ্ঠীচরণ জিভ কেটে বলল, অন্যায় হয়ে গেছে স্যার। মাফ করে দিন। আপনারা যাওয়ার পর ঢুলুনি পেয়েছিল। ভাবলুম একটু শুয়ে নিই। রাত্তিরে তরাসে ঘুম হয় না কিনা!
কর্নেল বললেন, ভাগ্যিস, তোমাকে পিঁপড়ে-মানুষেরা ধরাধরি করে জিমের মতো বয়ে নিয়ে যায়নি! তাহলে আজ দুপুরের খাওয়া-দাওয়া আর জুটত না আমাদের।
ষষ্ঠীচরণ ভয় পেয়ে বলল, ওরে বাবা! তারপর সে ব্যস্তভাবে উনুন ধরাতে গেল।
আমরা কর্নেলের তাঁবুতে গেলুম। ডঃ প্রসাদ বললেন, লোকটার নোটবইয়ে নিশ্চয় সব কথা লেখা আছে। চিনা ভাষা জানলে ভাল হত। কিন্তু …
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, আমি অল্পস্বল্প জানি চিনাভাষা। দেখি, কী লেখা আছে।
কর্নেল মিনিট দশেক ধরে নোটবইটা নিয়ে মেতে রইলেন। আমরা দুজনে চুপচাপ কৌতুহল নিয়ে বসে রইলুম। তারপর কর্নেল বললেন, লোকটার নাম সান ওয়ানসু। হংকং-এ বাড়ি। কীভাবে ভেগা দ্বীপের পিঁপড়ে-মানুষদের কথা জেনেছিল, লেখা নেই। তবে এটুকু লেখা আছে, মোট তিনবার এসেছে এর আগে। পিঁপড়ে-মানুষদের রাজার মুকুটে যে বহুমূল্য মণি দেখেছি, আমরা, সান ওয়ান-সু ওটা হাতাতে চেয়েছিল।
ডঃ প্রসাদ বললেন, ওদের সঙ্গে ভাব করল কীভাবে, লেখা নেই?
কর্নেল বললেন, আছে। প্রথমবার এসে ওদের গতিবিধি জেনে গিয়েছিল আড়াল থেকে। দ্বিতীয়বার সঙ্গে এনেছিল একটা প্রকাণ্ড কেক।
বললুম, কেক দিয়ে পিঁপড়ে-মানুষদের সঙ্গে ভাব করেছিল? ভারি বুদ্ধিমান তো।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। তৃতীয়বার সঙ্গে এনেছিল এক বস্তা চিনি।
বললুম, কিন্তু এবার তার সঙ্গে কিছু ছিল না। আমি দেখছি!
কর্নেল হাসলেন। বললেন, এই চতুর্থবার সে যা এনেছিল, তা বেলুনের বাস্কেটে এখন আছে। ওই যে দেখছ প্যাকেট বাঁধা জিনিসটা, ওটা লজেঞ্জুস।
