জ্যোৎস্না বলল,–ঠাকমা। যা নেবার গুছিয়ে একটা পোঁটলা করে নিন।
মারিয়া করুণ হেসে বললেন,–নেবার কিছু নেই। আমার জিনিসপত্র এবং পরিচিতিপত্র আর যা ছিল–সবই সেই প্লেনে রেখে এসেছিলাম।
আমি বললাম,–একটা আলো-টালো থাকলে বড় ভালো হত।
মারিয়া বললেন,–পাতালপুরীর যেসব আলো দেখছ, তা ফাদার গ্রিনকটের পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র থেকে অদ্ভুত কৌশলে প্রতিফলিত করা হয়েছে একটুকরো সামুদ্রিক পাথরে। এ পাথর পাতালপুরীর যেখানে রাখবে অদৃশ্য আলো এসে প্রতিফলিত হবে তার ওপর।
জ্যোত্সা বলল,–লোকটা তাহলে প্রতিভাবান বিজ্ঞানী।
বললাম,–একটুকরো সেই পাথর পেলে ভালো হত তা হলে।
মারিয়া হাসলেন। … পাতালপুরীর বাইরে কিন্তু পাথরের ওপর প্রতিফলন ঘটবে না। কাজেই আমাদের অন্ধকারেই এগুতে হবে।
আমরা আর দেরি করলাম না। বেরিয়ে পড়লাম। মারিয়া ঠাকমা এ-ঘর ও-ঘর করে অনেক করিডোর পেরিয়ে নিয়ে চললেন। একখানে থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললেন,–সাবধান। সামনে যন্ত্রঘর। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হবে। কারণ ওটার দেয়ালের ওপরটা কাঁচের। আমাদের দেখতে পাবে ওরা।
আগে মারিয়া, তারপর জ্যোৎস্না শেষে আমি নিঃশব্দে হামাগুড়ি দিলাম। শেষ প্রান্তে গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড কৌতূহল হল, ভেতরে কী ঘটছে দেখে নিতে।
সাবধানে মুখটা তুললাম। ভেতরে উজ্জ্বল আলো দেখলাম। প্রকাণ্ড হলঘরের একদিকে গোল একটা মঞ্চ। মঞ্চে মিনিহুনেরা ভিড় করে বসে আছে। আর মঞ্চটা আস্তে-আস্তে ঘুরছে। ওদের ওপর একটা প্রচণ্ড লাল আলো এসে পড়ছে। ওদের লাল দেখাচ্ছে। ওরা যেন ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে।
সারা ঘরে আজব সব যন্ত্র, বড় বড় কাঁচের পাত্র। কোনোটাতে বাষ্প উঠছে।
তারপর দেখতে পেলাম ফাদার গ্রিনকটকে।
হলুদ রঙের অদ্ভুদ একটা পোশাক পরা লম্বা চওড়া দৈত্যের মতো এক বুড়ো দাঁড়িয়ে আছে একটা যন্ত্রের সামনে। চাবি টিপছে আর কী সব বলছে। তার মাথায় হলুদ টুপিও আছে। মুখে সাদা গোঁফ দাড়ি। কিন্তু কী মিঠে অমায়িক মুখের ভাব! হাসি লেগেই আছে।
জ্যোৎস্নার টানে ঝটপট মাথা নামিয়ে সরে গেলাম। কাঁচের দেয়াল শেষ হলে নীল আলোয় ভরা একটা করিডোর দেখা গেল। করিডোর পেরিয়ে ডাইনে একটা ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখি সেই ঘর–যেখানে আমাকে মিনিহুনরা ডাব ও কলা খাইয়েছিল।
এখনও সেগুলো পড়ে আছে। বুদ্ধি করে কলার কাঁদি দুটো নিলাম। ইশারায় জ্যোৎস্নাকে ডাবের কাদিটা নিতে বললাম। মারিয়া ঠাকমা একটু হাসলেন শুধু।
এ ঘর থেকে বেরিয়ে আবার একটা করিডোর। তারপর দরজা খুলতেই দেখি ঘন অন্ধকার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়া ফিসফিস করে বললেন, বাইরে থেকে এই দরজাটা খোলা যায় না। কিন্তু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা যায়।
আমার পকেটে লাইটার আছে। কিন্তু মারিয়া ঠাকমা লাইটার জ্বালতে নিষেধ করলেন। অন্ধকারে অনেকটা পথ গিয়ে তারপর মারিয়া ফিসফিস করে বললেন,–অগ্নিদেবী পিলির মূর্তিটা এখানেই কোথাও আছে।
লাইটার জ্বালালাম। সামনে বেদীর ওপর সেই হিংস্র দেবীমূর্তি। তার চোখ থেকে হিংসা ঠিকরে বেরুচ্ছে যেন। লাইটার নিভিয়ে বললাম,–এবার আমি আগে যাব। ঠামা, আপনারা আমার পেছনে আসুন।…
.
টিহোর চেলা তুয়া
প্রায় তিনঘণ্টা অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে ঘোরাঘুরি করছি। কিন্তু বেরুবার পথ পাচ্ছি না। ঘড়িতে সাতটা বাজে। বুঝতে পারছি, বাইরে অন্ধকার রাত। তাই কোনো ফাটলে বাইরের আকাশ দেখা গেলেও আমরা চিনতে পারব না–বিশেষ করে আকাশে যদি মেঘ থাকে। তা হলেও কি বারোঘণ্টা আমাদের এখানে কাটানো উচিত হবে? বাইরের পৃথিবীতে আলো ফুটলে কোনো ফাটলে তার আভাস নিশ্চয় পাব। কিন্তু ততক্ষণে শয়তান গ্রিনকট কি চুপ করে বসে থাকবে?
মারিয়া বললেন,–পথ খুঁজে বের না করতে পারলে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত। গ্রিনকট খুব নিষ্ঠুর। সে আমাদের ক্ষমা করবে না। তিনজনের হৃৎপিণ্ড নিজেই ওপড়াবে।
জ্যোৎস্না বলল,–এবার আমি চেষ্টা করি। তোমরা আমার পেছনে এসো।
সে সামনে গেল। তারপর পেছনে মারিয়া, শেষে আমি। কয়েক পা গেছি, হঠাৎ আমার ডানহাতের কলার কাঁদিতে হ্যাঁচকা টান পড়ল। থমকে দাঁড়ালাম। কিন্তু আর কিছু ঘটল না। ভাবলাম অন্ধকারে পাথরে ধাক্কা লেগেছিল।
কিন্তু আবার একটু পরে, ফের হ্যাঁচকা টান পড়ল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আরে আরে এ কী!
মারিয়া, জ্যোৎস্না বলে উঠলেন, কী কী?
কে কলার কাঁদি ধরে টানল যেন। পরপর দুবার।
জ্যোৎস্না বলল,ভূতে টানছে। অত ভয় যদি, ঠাকমাকে পেছনে যেতে দাও।
রাগ করে বললাম,–ভূতটুত আমি মানিনে। চলো, এবার টান পড়লে দেখছি কী ব্যাপার।
আবার কিছুদূরে যাওয়ার পর ফের সেইরকম হ্যাঁচকা টান। সঙ্গে সঙ্গে কাদিদুটো নামিয়ে রেখে লাইটার জ্বালালাম। জ্যোৎস্না ও মারিয়া থমকে দাঁড়িয়েছে। আলো কমে প্রায় শেষ হয়ে আসছে লাইটারের মাথায়। তবু দেখতে ভুল হল না–আমার পেছনে দাঁড়িয়ে একটা মিনিহুন গপগপ করে কলা গিলছে।
মারিয়া প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন হঠাৎ,–তুয়া! তুয়া!
জ্যোৎস্না বলল,–তুয়া কি ঠাকমা?
মারিয়া কান করলেন না জ্যোৎস্নার কথায়। লাইটারের গ্যাস আর নেই। ঘন অন্ধকার সুড়ঙ্গের ভেতর মারিয়ার মিঠে গলা শোনা গেল,তুয়া। এ্যাদ্দিন তুই কোথায় ছিলি?
