কাউয়াই দ্বীপের হায়েনাতে পৌঁছে ওরা হঠাৎ প্লেন নামায় একটা পাহাড়ি উপত্যকায়। ওদের মতলব, সোনাটা হাতাবে। মারিয়া কী করবেন? ওদের পাল্লায় পড়েছেন তখন। ওদের কথা না মানলে গুলি করে মারবে। আসলে টিহো নামে পলিনেশীয় পাইলটই ওদের এই কু-মন্ত্রণা দিয়েছিল। ওরা রাত্রিবেলা সোনার বাট চারটে প্যাকেট বয়ে নিয়ে এই খাড়ির কাছে পৌঁছায়। টিহো স্থানীয় লোক বলে এই গুহাগুলোর কথা জানত। ওয়েইকাপালির ভেতর ঢুকে একজায়গায় চারটে প্যাকেট পুঁতে রাখা হয়। তার ওপর দিকে একজায়গায় একটা করচ চিহ্ন খোদাই করে রাখে ওরা।
কিন্তু তারপর সমস্যা দেখা দেয়। ওপর থেকে খাড়াই বেয়ে নামা যতটা সোজা হয়েছিল ওঠা ততটাই কঠিন। মারিয়ার পক্ষে ওঠা তো অসম্ভব। কারণ তাঁর পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নেই। ওরা তিনজনে উঠে যায় একে একে। কিন্তু মারিয়া অনেক চেষ্টা করেও পারেননি। যতবার ওঠেন, গড়াতে-গড়াতে এসে নীচের চাতালে পড়েন। প্রচণ্ডভাবে আহত হন। তখন ওপর থেকে ওরা আশ্বাস দিয়ে বলে, শিগগির নৌকা নিয়ে আসবে। মারিয়াকে নিয়ে যাবে।
আর আসেনি ওরা। কী হয়েছিল, মারিয়া জানেন না। গুহার ধারে জখম অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যান। তারপর যখন জ্ঞান হয়, দেখেন একটা পাদরীর পোশাকপরা লোক তার শুশ্রূষা করছে। ফাদার গ্রিনকট তার নাম। কিন্তু তখনও টের পাননি মারিয়া, কে এই ফাদার গ্রিনকট।
ছত্রিশ বছর ফাদার গ্রিনকটের কাছে বন্দীর মতো জীবন কাটাচ্ছেন মারিয়া। এ ছত্রিশ বছরে কয়েকশ মানুষের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করার কাজ তাকে দিয়েই করিয়েছে শয়তান গ্রিনকট। কিন্তু সজ্ঞানে নয়-অগ্নিদেবী পিলির পোশাক পরিয়ে সেইরকম সাজিয়ে তাঁকে গ্রিনকট একটা ওষুধ খাইয়ে দেয়। তখন নেশার ঘোরে জ্যান্ত মানুষের বুক চিরে হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলেন হতভাগিনী মারিয়া। বুঝতে পারেন না কী সাংঘাতিক পাপ করছেন।
নেশা চলে গেলে যখন সব টের পান, নির্জনে হুহু করে দেন। অনুতাপ করেন।
আজ যখন জ্যোৎস্নাকে ধরে আনল মিনিহুনরা, জ্যোৎস্নার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হয়েছিল মারিয়ার। চালাকি করে ওষুধ মেশানো পানীয়টা নিজের হাতে খাওয়ার ভান করে জামার ভেতর ঢেলে ফেলেছিলেন।
আমাকেও যখন ধরে আনে, তখন ঠিক তাই করেছিলেন। নইলে জ্যোৎস্না ও আমি হৃদয়হীন’ মড়া হয়ে হায়েনাদের পেটে চলে যেতাম। …
.
পালানোর চেষ্টা
মারিয়ার সঙ্গে জ্যোৎস্না ঠাকমা সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছে। কথায় কথায় গ্র্যান্ডমা বলে ডাকছে। ঠামার ঘরে আধুনিক যুগের আরামের সবরকম ব্যবস্থা আছে। জ্যোৎস্না দেখলাম ইতিমধ্যে ঘরের ভেতর কোথায় কী আছে, সব জেনে ফেলেছে। সে কফি বানাল নিজের হাতে। ঠাকমাকেও খাওয়াল। ঘড়িতে তখন বিকেল চারটে বেজেছে। জ্যোৎস্না আগেই দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে নিয়েছে মারিয়ার সঙ্গে। খেয়ে মারিয়া ফাদার গ্রিনকটের আদেশ পালন করতে গিয়েছিলেন–অর্থাৎ কি না আমার হৃৎপিণ্ড ওপড়াতে।
দু-দুটো পলিনেশীয় কলা খেয়ে আমার তখনও পেট ফুলে রয়েছে। অমন সাংঘাতিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল, তাতেও কলা দুটো পেটে হজম হয়নি। কী সাংঘাতিক এসব কলা।
আমরা তাড়াহুড়ো করছি না। কারণ মারিয়া ঠাকমা বলেছেন, গ্রিনকট কারুর হৃদপিণ্ড ওপড়ানোর দিন চব্বিশ ঘণ্টা তার যন্ত্র-ঘরে কাটায়। মিনিহুনের পাল তার সঙ্গে থাকে। কাজেই সামনের রাতটা পর্যন্ত আমরা নিশ্চিন্ত। কিন্তু তার মধ্যেই আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। ঠাণ্ডা মাথায় খুঁজে বের করতে হবে বাইরে যাওয়ার পথ।
মাঝে মাঝে দমেও যাচ্ছি। ছত্রিশ বছর ধরে মারিয়া যখন বেরুনোর পথ খুঁজে পাননি, তখন মাত্র চৌদ্দ ঘণ্টা সময় হাতে নিয়ে আমরা কি পথটা খুঁজে পাব?
জ্যোৎস্না বলল,–আচ্ছা ঠাকমা। বাইরের লোকেরা হৃৎপিণ্ড কিনতে আসে বললে, তুমি কি লক্ষ করোনি, কোন পথে তারা যায়?
মারিয়া বললেন,–গ্রিনকট তাদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কিন্তু তখন আমার তাদের ধারে কাছে যাবার উপায় থাকে না। একদল মিনিহুন গ্রিনকটের ঘরের দরজায় পাহারা দেয়। তবে আড়ি পেতে শুনে যা বুঝেছি, মনে হয়েছে যে পূর্বদিকের কোনো একটা হ্রদে তারা মোটরবোট রেখে অপেক্ষা করে। তারপর গ্রিনকট সেখানে হাজির হয়। তাদের চোখ বেঁধে ফেলে মিনিহুনগুলো। ওই অবস্থায় কোনো সুড়ঙ্গপথে এই পাতালপুরীতে নিয়ে আসে।
শুনে লাফিয়ে উঠলাম।… ঠাকমা! আমি লেকটা দেখেছি। ওই সুড়ঙ্গপথেই আমি ঢুকেছিলাম পাতালপুরীতে।
মারিয়া বললেন,–কিন্তু সেটা খুঁজে বের করতে পারবে কি?
বললাম,–অগ্নিদেবী পিলির মূর্তি যেখানে আছে, সেখানে আমাকে বন্দী করেছিল মিনিহুনরা। মূর্তিটা কোথায় আছে আপনি জানেন?
মারিয়া বললেন,–জানি। কিন্তু মূর্তির ওধারে অজস্র সুড়ঙ্গপথ। আমি সব পথেই বাইরে যাবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। বেশির ভাগ সুড়ঙ্গপথই হঠাৎ শেষ হয়েছে। কোনোটার শেষে গভীর গর্ত এবং গর্তে জল ফুঁসছে।
আমি স্মরণ করার চেষ্টা করছিলাম, মূর্তি পর্যন্ত আসার সময় কতবার কোনদিকে বাঁক নিয়েছি। বললাম,–আর দেরি না করে বরং মূর্তিটার কাছে চলুন। আমার মনে পড়েছে, একটা জায়গায় বাঁদিকে ঘুরেছিলাম। বাকিটা সিধে নাক বরাবর এসেছিলাম। চলুন, চেষ্টা করে দেখি।
