জ্যোৎস্না বলল,–তাই যাও বব। যদি আরও দুডলার বেশি চায় দেরি হবার জন্য। রাজি হয়ে।
বব গুহার মেঝেয় সাবধানে টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে চলে গেল।
বললাম,–জ্যোৎস্না! এই মূর্তিটা নিশ্চয় কোনো দেবতার?
জ্যোৎস্না বলল,–হা। পলিনেশীয় জাতির আদিম যুগের এই দেবতার নাম কন-টিকি।
কন-টিকি? অবাক হয়ে বললাম। এ তো খুব চেনা শব্দ মনে হচ্ছে! হ্যাঁ–বিখ্যাত অভিযাত্রী থর হেয়ারডাল কন-টিকি নামে একটা ভেলায় প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন।
জ্যোৎস্না বলল,–কন-টিকি আসলে সূর্যদেবতা। আদিমযুগে প্রশান্ত মহাসাগরের অসংখ্য দ্বীপে এই সূর্যদেবতার পুজো হত। এখন পলিনেশীয়রা প্রায় সবাই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। তাই আর কন-টিকির পুজো হয় না। হায়েনায় এসে শুনেছি, পলিনেশীয়রা এখনও কেউ কেউ কন-টিকির পুজো করে। তবে এ পুজো মানে নেহাত রোগ বা বিপদ আপদে মানত করা। তাও ওরা লুকিয়ে চুরিয়ে মানত করতে আসে। পাদ্রীরা জানতে পারলে জরিমানা করে যে! কিন্তু জানেন জয়ন্তদা বিদেশিরা মানত দিত এলে পলিনেশীয়রা ভারি খুশি হয়। তবে ভয়ে কেউ এতদূর আসতে পারে না। গুহার দরজার মুখে কিছু ফুল রেখে চলে যায়। কারণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন–ওই সব মড়ার মাথার খুলি হাড় কংকাল! ভূতের ভয়ে এদিকটায় ক্যানো নিয়ে আসতে চায় না। নেহাত টাকার লোভে কেউ আসে।
তুমিও তা হলে এই মূর্তিটার কাছে আসো নি?
মোটেই না। এতদূর আসব, কী দরকার মুখেই যা বিচ্ছিরি গন্ধ।
আমরা ফিসফিস করে কথা বলছিলাম। ইচ্ছে হল, বেদিতে উঠে মূর্তিটাকে ছুঁয়ে দেখি কী দিয়ে তৈরি। তাই বললাম, জ্যোৎস্না! আমি বেদিতে উঠে মূর্তিটা ছুঁয়ে দেখি। ইচ্ছে করলে তুমিও উঠতে পারো। উঠবে নাকি?
জ্যোৎস্নার কোনো সাড়া পেলাম না। তাই ফের ডাকলাম,–জ্যোৎস্না। আসবে নাকি?
তবু কোনো সাড়া নেই। একটু জোরে ডাকলাম,জ্যোৎস্না গেলে কোথায়?
আশ্চর্য জ্যোৎস্না কি অন্ধকারে তামাশা করছে আমার সঙ্গে? এ কি তামাশার সময়?
রাগ করে বললাম,–জ্যোৎস্না! সাড়া দিচ্ছো না কেন?
মেয়েটা ডানপিটে এবং গায়ে জোর আছে। তাই বলে এ ভূতুড়ে গুহায় আমার সঙ্গে এমন ফাজলেমি করা কি উচিত হচ্ছে? আমি হাত বাড়িয়ে ওকে খুঁজলাম। পেলাম না। তখন বেদি থেকে অন্ধের মতো দুহাত বাড়িয়ে কানামাছি খেলতে থাকলাম অন্ধকারে। দেয়ালে ধাক্কা লাগতেই আরও চটে গিয়ে গলা চড়িয়ে বললাম,–হচ্ছেটা কী? জ্যোৎস্না! জ্যোৎস্না?
ঠিক সেই সময় অন্ধকারে দূরে আচমকা বীভৎস একটা চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। হোয়া হোয়া–আআ? হোয়া হোয়া হোয়া–আ-আ। হোয়া হোয়া হোয়া–আ-আ!
অনেকগুলো রাক্ষুসে মানুষের চিৎকার যেন। বিদেশি ফিল্মে জংলিদের চিৎকারের মতো। হোয়া হোয়া হোয়া-আ-আ! হোয়া হোয়া হোয়া–আ-আ।
অমানুষিক চিৎকার করতে করতে কারা এগিয়ে আসছে এদিকে।
মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলাম না। অন্ধকারে অন্ধের মতো দৌড়তে চেষ্টা করলাম। কোনদিকে দরজা–কোনপথে এসেছি, তা ঠিক করতে পারলাম না। বার বার আছাড় খেলাম। জান্তব চিৎকারটা খুব কাছে বলে মনে হল। তারপর যেই পা ফেলেছি, হড়াৎ করে একটা গর্তে পড়ে গেলাম।
পড়লাম একেবারে কনকনে ঠাণ্ডা জলে। জলে পড়ায় আঘাত লাগল না। কিন্তু কী তীব্র স্রোত! আমাকে টেনে নিয়ে চলল খড়ের খুটোর মতো।
কতক্ষণ অসহায় ভেসে থাকার পর একখানে স্রোতটা হঠাৎ কমে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার তো! তারপর জলটা আমাকে উল্টোদিকে ঠেলতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম সমুদ্রের জল গুহার তলার সুড়ঙ্গে একবার করে প্রচণ্ড বেগে এগিয়ে আসছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই এরকম দুমুখো টান জলে। হাত বাড়িয়ে শক্ত কিছু খুঁজলাম। হাতে দেয়াল ঠেকল। কিন্তু জলের ধাক্কায় মসৃণ দেয়াল ধরার উপায় নেই। আবার এক হ্যাঁচকা টানে স্রোতের মুখে ভাসলাম। হাত দুটো অসহায়ভাবে ওপরে বাড়াতেই ছাদে ঠেকল। তারপর ছাদটা, ঢালু হয়ে জলে ডুবেছে টের পেলাম। সর্বনাশ! এবার জলের তলায় দম আটকে মারা পড়তে হবে যে! কিন্তু না ডুবে উপায় নেই। মাথা ভেঙে যাবে।
প্রচণ্ড বেগে জল আমাকে টেনে নিয়ে চলল। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আঃ বাতাস! মাথা তোলার জন্য একটুখানি আকাশ।
বুক ফেটে যাবে বুঝি। জলের টান যেন গভীর পাতালে নিয়ে চলেছে। একসময় আর সহ্য করতে পারলাম না। নিঃশ্বাস নেবার জন্য ঠেলে মাথা তুললাম। মাথায় কিন্তু ছাদের ধাক্কা লাগল না। আঃ। আবার একটুকরো আকাশ পেয়েছি। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকলাম। এখানে স্রোতটা কমেছে। জলটা ঘুরপাক খাচ্ছে। বাঁদিকে একটু সরলে আবার তীব্র স্রোত পেলাম। তারপর সামনেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ক্রমশ।
একটা ফাটল দিয়ে রোদ্র ঢুকেছে। বরফগলা জলে শরীর নিঃসাড়। কিন্তু রোদ্দুর দেখে বাঁচার তাগিদ জোরালো হয়ে উঠেছে। ফাটলের কাছে পৌঁছতেই আঁকড়ে ধরলাম একটা পাথরের খাঁজ।
ফাটলটা প্রায় হাত দেড়েক চওড়া। অনেক কষ্টে সেখান দিয়ে ওপরে উঠতে থাকলাম। …
.
অগ্নিদেবী পিলির ভক্তবৃন্দ
চারদিক খুঁটিয়ে দেখে বুঝতে পেরেছি আমার অবস্থা হয়েছে রবিনসন ক্রুশোর মতো। যেখানে বসে আছি, তার নীচে হ্রদ। হ্রদের একটা দিক সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত। বাকি তিনদিকে পাহাড়। খাড়া দেওয়ালের মতো পাহাড়। হ্রদের জলে হাজার-হাজার পাখি ভেসে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের সঙ্গে একটা চওড়া নালা দিয়ে হ্রদের যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে জলটা প্রচণ্ড ফুঁসছে। কিন্তু হ্রদের ভেতর তত ঢেউ নেই। মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে আসছে। জলে বসছে। আবার তুমুল চেঁচামেচি করতে করতে উড়ে যাচ্ছে।
