বব ফিসফিস করে বলল,–জ্যোৎস্না টর্চ দাও। আমি একটু এগিয়ে দেখে আসি ব্যাপারটা কী?
জ্যোৎস্না টর্চ দিয়ে বলল,–বেশি দূরে যেও না। আর সাবধান, দরকার না হলে টর্চ জ্বেলো না।
বব অন্ধকারে এগিয়ে গেল। আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। নাকে রুমাল চেপেই রেখেছি–সরালে দুর্গন্ধে নাড়িভুড়ি উগরে আসছে।
ববের ফেরার নাম নেই। আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি ক্রমশ। সেই কথাবার্তার আওয়াজ কিন্তু সমানে শোনা যাচ্ছে।
কতক্ষণ পরে বব অন্ধকার থেকে ছিটকে এসে পড়ল। ব্যস্তভাবে বলল, কোকো পাম হোটেলের বেলক্যাপ্টন সেই টিহোব্যাটাকে দেখলাম মনে হল। তার সঙ্গে জনাতিনেক লোক আছে। গুহার ভেতরটা বাঁদিকে ঘুরে গেছে, তাই ওদের আলো আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তাছাড়া বাঁকের মুখে প্রকাণ্ড বেদীতে একটা মূর্তি আছে। ওরা মূর্তির পেছনে গজ-ফিতে দিয়ে মেঝেয় মাপছে। কিন্তু তার চেয়ে অবাক কাণ্ড, টিহোর কাঁধে সম্ভবত একটা মিনিহুন বসে আছে দেখলাম। কালো কুচকুচে বাঁদরের মতো। দেখবে এসো।
অন্ধকারে ববের পেছনে দেয়াল ধরে-ধরে আমরা এগোলাম। অনেকটা এগিয়ে বব ফিসফিস করে বলল,–এবার বাঁদিকে।
বাঁদিকে ঘুরতেই প্রথমে চোখে পড়ল দূরে আলোর ঝলক। একটা মার্কারি ল্যাম্প জ্বলছে। ছায়ার মতো কয়েকটা লোক কীসব করছে টরছে। সামনের বেদির ওপর একটা বিশাল মূর্তি। তার পাশ দিয়ে গেছে করিডোরের মতো গুহা-পথ। আমরা বেদির পেছনে গিয়ে উঁকি মেরে ওদের ব্যাপার-স্যাপার দেখতে থাকলাম।
.
হোয়া–হোয়া–হোয়া আ-আ!
ওরা চারজনে ফিতে ধরে একবার মেঝে, একবার দেয়ালের এপাশ-ওপাশ মাপামাপি করছে আর চাপা গলায় কী সব কথাবার্তা বলছে। জ্যোৎস্নার পক্ষে বোঝা সম্ভব। কিন্তু আমাদের মুখ খোলা বিপজ্জনক। ওরা টের পেয়ে যাবে।
একটু পরে একজন বেঁটে মোটাসোটা লোক এদিকে ঘুরে মার্কারি বাতির কাছে এল। বাতিটা কীসের ওপর বসানো। নিশ্চয় ব্যাটারির বাক্সে। খুব জোগাড়যন্ত্র করে গুহায় ঢুকেছে তা হলে।
বব আমাকে খুঁচিয়ে দিল। বুঝলাম এই তাহলে রাজবংশীয় টিহো। গায়ের রঙটা ঘোর বাদামি। পেল্লায় গোঁফ মুখে। নাকটা প্রকাণ্ড এবং একটু থ্যাবড়া। মাথায় কাঁচাপাকা ছোট চুল। কিন্তু গোঁফ একেবারে সাদা।
সে আলোর সামনে ঝুঁকে (ও হরি! এ যে আমার সেই সিগারেট কেস!) সিগারেট কেসের ভেতরটা পড়বার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বুদ্ধি আছে বটে। একটা আতসকাঁচও এনেছে। আতসকাঁচের সাহায্যে পড়ার চেষ্টা করছে।
রাগে আমার ভেতরটা গরগর করতে থাকল। আমার বাল্যবন্ধুর উপহার দেওয়া ওই সিগারেটকেসটা আমার কতকালের সঙ্গী। সবসময় ওটা ব্যবহার করতাম না। কদাচিৎ ইচ্ছে হলে তবে এবার আমেরিকা বেড়াতে আসার সময় কী খেয়ালে ওটা সঙ্গে এনেছিলাম।
নাকি জনখুড়ো যা বলেছেন তাই ঠিক? নিয়তি আমাকে টেনে এনেছে এখানে। সিগারেটকেসটা যেখানকার জিনিস, সেখানে ফিরে আসতে চেয়েছিল যেন।
এইসব কথা ভেবেও আমার কেমন একটা অস্বস্তি হতে থাকল। তাই ভাবলাম, চুলোয় যাক। সিগারেটকেস যার হাতে পৌঁছানোর কথা, পৌঁছে গেছে। তবে শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা দেখে যাওয়া যাক। আমার এই বিদঘুঁটে স্বভাব-রহস্যভেদী এক বুড়ো ঘুঘুর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে স্বভাবটা বাগে পেয়েছে, যেখানে রহস্যের গন্ধ পাই নাক গলাতে ইচ্ছে করে।
টিহো সিগারেটকেসের ভেতরটা আতসকাঁচের সাহায্যে ফের দেখে নিয়ে সঙ্গীদের কিছু বলল। তখনই চোখে পড়ল সেই আজব কদর্য প্রাণীটাকে।
প্রাণীটা ব্যাটারিবাকসেতে হেলান দিয়ে কলা খাচ্ছিল। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে প্রচুর কলা ফলে। এই হাওয়াই দ্বীপে কাল লিহিউ বিমানঘাঁটি থেকে আসতে আসতে অজস্র কলাবাগান দেখেছি। একেকটা কলা প্রায় দেড় ফুট পর্যন্ত লম্বা এবং গাঢ় হলুদ রঙ। এসব কলা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে প্রচুর বিক্রি হয়। কাজেই এর মধুর স্বাদের সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়ে গেছে। বানরজাতীয় জীবটি যদি সত্যি সেই মেনেহিউন বা মিনিহুন হয়, তা হলে বলতে হবে কলাই তার প্রধান খাদ্য। কারণ তার সামনে প্রায় এক কঁদি কলা রয়েছে।
একটা লোক মার্কারি বাতি ও ব্যাটারি যন্ত্রটা তুলে কাঁধে নিল। তখন খুদে প্রাণীটা দুপায়ে উঠে দাঁড়াল। তার এক হাতে কলার কাদি। কালো হাতটায় দাগড়া দাগড়া পেশীর ওপর আলো ঠিকরোচ্ছে। তার মুখটা স্পষ্ট নজরে পড়ল। অবিকল মানুষের মতো। কিন্তু আকারে একটা বড় সাইজের মোসাম্বি লেবুর মতো গোলাকার। কান দুটো বেশ বড়। গায়ে একটুও লোম নেই। সব মিলিয়ে আস্ত একটি মানুষ-চামচিকে বলা যায়–শুধু ডানার বদলে দুটো হাত আছে।
ওরা এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকে একটা ফাটলে ঢুকে গেল। ক্রমশ আলোর ছটাও মিলিয়ে গেল। আবার গাঢ় অন্ধকারে ভরে গেল ওয়েইকাপালি গুহা। জ্যোৎস্না ফিসফিস করে বলল,–ওরা সঠিক জায়গাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওয়েইকানালেয়া গুহার যে সুড়ঙ্গ পথ এগুহায় এসেছে, সেটাই খুঁজতে গেল ওরা। শুনেছি দুই গুহার মধ্যেকার এ সুড়ঙ্গ পথ আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি।
বব উঠে দাঁড়িয়ে বলল,–চলো। ওদের পেছন পেছন যাই।
জ্যোৎস্না বলল,–আমি একাট কথা ভাবছি। আমাদের বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে না? মাঝির যদি রাগ করে ক্যানো নিয়ে চলে যায়, খুব বিপদে পড়ে যাব।
বব বলল,–তা হলে তোমরা এখানে অপেক্ষা করো। আমি ঝটপট ওদের বলে আসি, মানত দিতে আমাদের একটু দেরি হবে। প্রার্থনা করব কিনা? তিনজনের প্রার্থনা একটু লম্বা চওড়া হবেই।
