.
বারো
সেই জগদ্দল পাথরটা সুড়ঙ্গের দরজা থেকে সরাতে ঠান্ডাহিম শীতের বিকেলে আমাদের শরীর প্রায় ঘেমে উঠেছিল। অনেক চেষ্টার পর পাথরটা একপাশে সরানো গেল মাত্র। তবে এবার অন্তত একজন সুড়ঙ্গে ঢোকার মতো ফোঁকর সৃষ্টি হল। কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিকে দেখে নিতে একটা স্তূপে উঠলেন। তারপর নেমে এসে বললেন,–এখন একটাই সমস্যা। ভিতরে ঢুকলে কেষ্টবাবুর কোনও লোক যদি সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকে, সে গুলি ছুঁড়তে পারে। আমরা আত্মরক্ষার সুযোগ পাব না।
বললুম,–ঠিক বলেছেন। আগ্নেয়াস্ত্রের চোরাকারবারি কেষ্ট অধিকারী। কাজেই সুড়ঙ্গে তার লোক আগ্নেয়াস্ত্র হাতে বন্দি হালদারমশাইকে পাহারা দিতেই পারে।
সুরেন বলল,–সার! ওঁকে কেষ্টবাবুর লোকেরা ধরে সুড়ঙ্গে ঢুকিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ওঁকে সুড়ঙ্গের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ওরা গুলি করে মারেনি তো?
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাইকে মেরে ফেলে কেষ্টবাবুর লাভ নেই। বরং ওঁকে বন্দি রেখে আমার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে সেই বত্রিশের ধাঁধামাকা জিনিসটা দাবি করবে। দীপু আর হালদারমশাই দুজনেই কেষ্টবাবুর পাল্লায় পড়েছেন। এতে কেষ্টবাবু আমার ওপর আরও চাপ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে!
সুরেন বলল,–সার! হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে—
কর্নেল তার কথার ওপর বললেন,–হাড়মটমটিয়ার যুগ শেষ সুরেন! তুমি কি বুঝতে পারছ কেষ্টবাবু তার চোরাকারবার নিরাপদে চালিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকদিন হয়তো অনেকবছর ধরে বাঁকা ডাকাতকে কাজে লাগিয়েছিল? তার গলার কাছে আঁটা খুদে জাপানি টেপরেকর্ডারে মটমট শব্দ বাজিয়ে সে এমন একটা অবস্থা তৈরি করেছিল, যাতে ওই জঙ্গলে সন্ধ্যার পর এমনকী দিনের বেলাতেও লোকে ঢুকতে ভয় পায়।
বললুম,–কিন্তু বেলা পড়ে আসছে কর্নেল! কী করা উচিত এখনই ঠিক করা যাক।
সুরেন বলল,–একটা কথা ভাবছি সার! জঙ্গলের মধ্যে সুড়ঙ্গের অন্য দরজাটাও কি কেষ্টবাবুর লোকেরা এমন করে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছে?
কর্নেল বললেন,–সুরেন! একটা কাজ করতে পারবে? এখান থেকে বেরুলে নদী পেরিয়ে উত্তর-পূর্ব কোণে সিধে ফাঁকা মাঠ। দৌড়ে মাঠ পেরিয়ে রায়গড় থানায় যেতে পারবে?
সুরেন বলল–পারব সার!
–তাহলে এই চিঠিটা নিয়ে গিয়ে থানার ও.সি. তপেশবাবু কিংবা ডিউটি অফিসারের কাছে পৌঁছে দাও। তুমি একা এসো না। পুলিশের সঙ্গে আসবে।
বলে কর্নেল তার জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা নোটবই বের করে একটা পাতায় দ্রুত চিঠি লিখে ফেললেন। তারপর নিজের একটা নেমকার্ড সুরেনকে দিলেন। সেই সঙ্গে নোটবইয়ের পাতা ছিঁড়ে চিঠিটাও দিলেন। সুরেন পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ কর্নেল বললেন,–এক মিনিট। গড়ের জঙ্গল থেকে বেরুনোর পথে তোমার বিপদ হতেও পারে। চলো। আমি তোমাকে নদীর ধারে পৌঁছে দিয়ে আসি! জয়ন্ত! তুমি তোমার রিভলভার বের করে হাতে রাখো। আর এক কাজ করো। ওই স্কুপের কাছে ঝোঁপের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। কেউ যেন তোমাকে না দেখতে পায়! সাবধান!
কর্নেল সুরেনকে নদীর ধারে পৌঁছে দিতে গেলেন। আমি কর্নেলের কথামতো রিভলভার হাতে নিয়ে সেই ঝোঁপের আড়ালে ওত পেতে বসলুম। অস্বীকার করব না, অজানা আতঙ্কে আমি একটু আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলুম। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, কেষ্টবাবুর অনুচররা আচমকা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হালদারমশাইয়ের মতো বন্দি করবে। রিভলভার তো হালদারমশাইয়ের কাছেও ছিল!
কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। কর্নেলকে ফিরতে দেখে ঝোঁপ থেকে বেরিয়ে এলুম। কর্নেল একটু হেসে বললেন,–আশা করি, তোমাকে ভূতেরা ঢিল ছোড়েনি?
বললুম,–না। আপনাকে ছুঁড়েছিল নাকি?
–ফেরার পথে ছুঁড়েছিল।
–সর্বনাশ! তাহলে কেষ্টবাবুর লোকেরা এখনও কাছাকাছি কোথাও আছে!
–আছে। বোকামি করে নিজেরাই সেটা জানিয়ে দিল।
–ভাগ্যিস ওরা গুলি ছোড়েনি!
কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, আমাকে আড়াল থেকে গুলি করে মারলে কেষ্টবাবু সেই মোগলাই রত্নকোষ আর পাবে না, তা ভালোই বোঝে। যাই হোক, পুলিশ না আসা পর্যন্ত আমরা সামনেকার এই স্কুপে উঁচুতে বসে থাকি। সাবধানে উঠবে। পা পিছলে পড়ে গেলে হাড় ভেঙে যেতে পারে।
দুজনে একটা নগ্ন উঁচু ধ্বংসস্তূপে উঠে বসলুম। নিরেট পাথরে ঠাসা এই ধ্বংসাবশেষে কোনও উদ্ভিদ গজাতে পারেনি। দিনের আলো ম্লান হয়ে এসেছে। দূরে কুয়াশা ঘনিয়েছে। চারদিকে এতক্ষণে পাখিদের দিনশেষের কল-কাকলি শোনা যাচ্ছিল।
কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখছিলেন। ঘড়ি দেখলুম, চারটে বাজে। এত শিগগির এখানে শীতের দিন ফুরিয়ে যায় কেন? একটু পরে বুঝতে পারলুম, কুয়াশার জন্যই রোদ্দুর এত ম্লান হয়ে গেছে। আধঘণ্টা পরে কর্নেল বাইনোকুলারে পূর্বদিক দেখতে দেখতে বললেন,–বাঃ! তপেশবাবুরা এসে গেছেন! এসো, নেমে পড়া যাক।
আমরা সবে স্কুপ থেকে নেমেছি, হঠাৎ দেখি, সুড়ঙ্গের দরজার ফোকর দিয়ে লাল ধুলো মাখা চুল আর একটা মুখ উঁকি দিচ্ছে। কর্নেল ছুটে গিয়ে বললেন,–হালদারমশাই! আপনাকে কেষ্টবাবুর লোকেরা ছেড়ে দিল তাহলে?
হালদারমশাইয়ের মুখে টেপ আঁটা আছে। কর্নেল টেপ টেনে খুলতেই উনি উঁহু হু হু করে উঠলেন যন্ত্রণায়। তারপর বললেন, আমার হাত দুইখান পিছনে বাঁধা আছে। আমারে উঠাইয়া লন।
ওঁকে কর্নেল এবং আমি দুদিক থেকে ধরে টেনে বের করলুম। কর্নেল কিটব্যাগ থেকে ছুরি বের করে হাতের বাঁধন কেটে দিলেন। গোয়েন্দাপ্রবরের সারা শরীরে লাল ধুলোকাদা মাখা। একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন,–সবখানে হালারা আমারে বান্ধে ক্যান? আচমকা আমার উপর ঝাঁপ দিয়া-ওঃ!
