চিঠিটা খুলে দেখলুম লেখা আছে :
‘বাবা,
চট্টরাজসায়েবের ক্যাম্প থেকে চুরি যাওয়া জিনিসটা নাকি কোন কনের্লসায়েবের কাছে আছে। তাঁকে এই চিঠি দেখিয়ে বলবেন, ওটা যেন তিনি আজই রাত দশটায় হাড়মটমটিয়ায় জঙ্গলে সেই ডোবার পাড়ে রেখে আসেন। পুলিশকে জানালে আমাকে এরা মেরে ফেলবে। জিনিসটা পেলে আমাকে এরা ছেড়ে দেবে। না পেলে আজ রাত একটায় আমাকে এরা মেরে ফেলবে। ইতি,
দীপু’
হালদারমশাই আমার মুখের কাছে মুখে এনে চিঠিটা পড়ছিলেন। তার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ কানে ঝাঁপটা মারছিল। তিনি এবার সরে বসে উত্তেজিতভাবে বললেন,–কর্নেলস্যারেরে এখনই খবর দেওয়া দরকার।
কুমুদবাবু ভাঙা গলায় বললেন,–কর্নেলসায়েব কোথায় গেছেন?
বললুম,–ওঁর যা বাতিক! গড়ের জঙ্গলে পরগাছা আনতে গেছেন! আপনি ততক্ষণ অপেক্ষা করুন।
আমরা বারান্দায় গিয়ে বসলুম। একটু পরে হালদারমশাই বললেন,–গড়ের জঙ্গল কোথায়? আমারে দেখাইয়া দিলে কর্নেলস্যারেরে খবর দিতাম! জয়ন্তবাবু চেনেন না? কুমুদবাবু, আপনি নিশ্চয়ই চেনেন?
কুমুদবাবু বললেন, আমার যা অবস্থা, অনেক কষ্টে এসেছি। এখান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তর কোণে। নদীর ওপারে। নদীতে অবশ্য তত জল নেই।
আমারে দেখাইয়া দ্যান।–বলে গোয়েন্দাপ্রবর উঠে দাঁড়ালেন।
আমি সত্যি বলতে কী, চিঠিটা পড়ার পর নার্ভাস হয়ে পড়েছিলুম। কুমুদবাবু বারান্দা থেকে নেমে হালদারমশাইকে দূরে গড়ের জঙ্গল অর্থাৎ ধ্বংসস্তূপে গজিয়ে ওঠে জঙ্গলটা দেখিয়ে দিলেন। হালদারমশাই আমার কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
নাখুলালকে ডেকে কুমুদবাবুর জন্য চা আনতে বললুম। নাখুলাল কুমুদবাবুকে ‘নমস্তে করে চলে গেল।
কর্নেল সুরেন আর ডনের সঙ্গে যখন ফিরে এলেন, তখন প্রায় বারোটা বাজে। দেখলুম, একটুকরো মোটা ডালে লালরঙের ঝলমলে ফুল এবং সবুজ চিকন পাতার পরগাছা আটকানো। শেকড়বাকড় কিছুটা দু’ধারে ঝুলে আছে। কর্নেল কুমুদবাবুকে দেখে বললেন,–এক মিনিট। এটা নাখুলালকে মাটিতে বসিয়ে রাখতে বলে আসি।
বললুম,–হালদারমশাই কোথায়? উনি তো আপনাকেই ডাকতে গেছেন!
কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন,–হালদারমশাই? তার সঙ্গে তো আমার দেখা হয়নি!
কর্নেল বাংলোর পিছনদিকে চলে গেলেন। কুমুদবাবু বললেন,–দেখা না হয়েই পারে না। জায়গাটা গোলকধাঁধার মতো। হয়তো এখনও উনি কর্নেলসায়েবকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন!
একটু পরে কর্নেল ফিরে এসে ডনকে কিছু টাকা দিলেন। ডন খুশি হয়ে চলে গেল। সুরেন গেল তার খুড়োর কাছে। কর্নেল এসে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–একটা কিছু ঘটেছে, তা বুঝতে পারছি। বলুন কুমুদবাবু!
কুমুদবাবু চিঠির ব্যাপারটা বলে রুমালে চোখ মুছলেন। কর্নেল বললেন,–চিঠিটা হালদারমশাই নিয়ে গেলেন কেন? চিঠিটা আমার দেখার দরকার ছিল।
কুমুদবাবু বললেন,–ওটা দীপুরই হাতের লেখা।
কর্নেল বললেন,–ঠিক আছে। চিন্তা করবেন না। আপনি বাড়ি গিয়ে স্নানাহার করুন। ঘুণাক্ষরে চিঠির কথা যেন আর কাউকেও জানাবেন না।
কুমুদবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–কৃষ্ণকান্তবাবু বাড়িতে নেই। উনি–
তার কথার ওপর কর্নেল বললেন, কুমুদবাবু! কৃষ্ণকান্ত অধিকারীই আপনার ছেলে দীপুকে আটকে রেখেছে। কিন্তু সাবধান! একথাও যেন আপনি ছাড়া কেউ না জানতে পারে।
কুমুদবাবু চমকে উঠেছিলেন। তিনি মুখ নিচু করে একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর বিষণ্ণমুখে বেরিয়ে গেলেন।
কর্নেল বাংলোর পশ্চিমদিকে গিয়ে বাইনোকুলারে গড়ের জঙ্গল দেখছিলেন। আমি বারান্দায় গিয়ে তাকে লক্ষ করছিলুম। প্রায় পনেরো মিনিট পরে কর্নেল ফিরে এলেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। তিনি ঘড়ি দেখে বললেন, লাঞ্চের সময় হয়েছে। আমরা লাঞ্চ খেয়ে নিয়ে বেরুব। হালদারমশাইয়ের জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। উনি যখন খুশি ফিরে লাঞ্চ খাবেন।
বললুম,–ওঁর কোনও বিপদ হয়নি তো?
–বলা যায় না। হঠকারী আর জেদি মানুষ মাঝে মাঝে নিজেকে আগের মতোই পুলিশ অফিসার ভেবে বসেন, এটাই হালদারমশাইয়ের ব্যাপারে একটা সমস্যা।
বলে কর্নেল পোশাক বদলাতে বাথরুমে ঢুকলেন।
আরও আধঘণ্টা দেরি করে সওয়া একটায় আমরা খেয়ে নিলুম। তারপর দুটোর সময় কর্নেল চুরুটে শেষ টান দিয়ে বললেন,–জয়ন্ত! হালদারমশাই সম্ভবত কেষ্ট অধিকারীর ফাঁদে নিজের অজ্ঞাতসারে পা দিয়েছেন। চলো! তার খোঁজে বেরুনো যাক। সুরেনকে ডেকে নিচ্ছি। গড়ের জঙ্গল তার নখদর্পণে।
কর্নেল, সুরেন আর আমি প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ডাইনে হাড়মটমটিয়ার জঙ্গল এবং বাঁদিকে সমান্তরালে নদী রেখে গড়ের ধ্বংসস্তূপের কাছে পৌঁছুলুম। সেখানে নদী পেরিয়ে পশ্চিম গড়ের ধ্বংসস্তূপে ঢুকলুম। কর্নেল এতক্ষণ বাইনোকুলারে চারদিক মাঝেমাঝে দেখে নিচ্ছিলেন। গড়ের ধ্বংসস্তূপের গোলকধাঁধায় ঢোকার পর তিনি বললেন,–সুরেন! দ্যাখো তো ওটা কী?
সুরেন এগিয়ে গিয়ে বাঁহাতে একটা নোংরা রুমাল তুলে ধরল। আমি চমকে উঠে বললুম, –এটা দেখছি হালদারমশাইয়ের নাকের নস্যি-মোছা রুমাল!
আরও কিছুক্ষণ ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে এগিয়ে একখানে থেমে কর্নেল বললেন,–কী আশ্চর্য!
সুরেন বলে উঠল,–সার! ওই দেখুন, কারা সুড়ঙ্গের দরজায় কত বড় পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে!
কর্নেল এগিয়ে গিয়ে ঝোঁপ সরিয়ে বললেন,–জয়ন্ত! সুরেন এসো, আমরা পাথরটা সরানোর চেষ্টা করি। কেষ্টবাবুর লোকেরা সুড়ঙ্গের ছোট্ট দরজাটা পাথর দিয়ে কেন বন্ধ করে গেছে, দেখা যাক।
