আমি সত্যিই চা গিলে ফেলে তৈরি হয়ে নিলুম। এবার কর্নেল সহাস্যে বললেন,–বাঃ! এই তো চাই।
কর্নেল জানালা বন্ধ করে তালা এঁটে নাখুলালকে বললেন,–বেরুচ্ছি নাখুলাল!
নাখুলাল কালকের মতো মালির সঙ্গে গল্প করছিল। সেলাম দিয়ে বলল,–কখন ফিরবেন সার?
–যদি একটু রাতও হয়, তুমি চিন্তা করো না।
কর্নেল বাংলো থেকে নেমে রাঙামাটির সেই এবড়োখেবড়ো রাস্তায় এগিয়ে গেলেন। তাঁকে অনুসরণ করে বললুম,–কর্নেল! আপনি আজ অবিকল এক মন্ত্রীমশাইয়ের মতো বলছিলেন, অত কেন-কেন কেন? অবশ্য তারপরও তিনি আমাদের সাংবাদিক দলটিকে ভেংচি কেটে বলেছিলেন, খালি কেনর ক্যানেস্তারা!
কর্নেল বললেন, তোমার নার্ভ চাঙ্গা হয়ে গেছে। এবার শোনা! রংলিডিহির মোড়ে সুরেন হালদারমশাইকে বাসে তুলে দিয়ে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। তার সঙ্গে আমরা যাব মাখন দত্তের বাড়ি।
–উপেন দত্তের দাদা মাখন দত্ত। তাই না?
–তোমার কিছু মনে থাকে না। যাই হোক, তুমি ওখানে যাচ্ছ সাংবাদিক পরিচয়ে, যা তোমার প্রকৃত পরিচয়। উপেন দত্তের মৃত্যু সম্পর্কে খবর সংগ্রহের জন্য তুমি কলকাতা থেকে এসেছ। বুঝেছ তো? এবার পরে কথাটা মন দিয়ে শোনা। এ ছাড়া কুমুদবাবুর ছেলে দীপুর জঙ্গলে নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে তুমি সকালে কুমুদবাবুর বাড়ি গিয়ে সব খব নিয়েছ। কেমন?
–বুঝেছি।
–তুমি উপেন দত্তের স্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলবে। সান্ত্বনা দেবে। সরকারি সাহায্যের জন্য দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় লিখবে–একথাও বলবে। মাখনবাবুর সঙ্গে কথা বলা সময় তার দেখা রায়গড় রাজবাড়ি এবং রাজলাইব্রেরির কথাও তুলবে। তারপর মওকা বুঝলে সেই সংস্কৃত পাণ্ডুলিপিটার–
কর্নেলের কথা শেষ হল না। অতর্কিতে সংকীর্ণ এবং এবড়োখেবড়ো রাস্তার বাঁদিকের ঘন ঝোঁপ থেকে কেউ কর্নেলের দিকে প্রায় ঝাঁপ দিল। আমি হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলুম। তারপর দেখলুম, কর্নেল আশ্চর্য ক্ষিপ্রতায় আততায়ীর তলপেটে স-বুট লাথি মারার সঙ্গে-সঙ্গে সে আর্তনাদ করে ধরাশায়ী হল। কর্নেল তার পিঠের ওপর দমাস করে বসে রিভলভার বের করে তার কানের পাশে ঠেকিয়ে বললেন,–ট্রিগার টানলেই কী হবে তুমি বুঝতে পারছ তো?
এতক্ষণে দেখতে পেলুম, তার হাতের ছোরাটা ছিটকে পড়েছে। ছোরাটার ফলা প্রায় ছ’ইঞ্চি। ওটা কুড়িয়ে নিলুম। এবার আমার হাতে রিভলভার।
কর্নেলের মতো প্রকাণ্ড এবং ওজনদার মানুষ তার পিঠে বসেছিলেন এবং তার ফলে তার মুখটা মাটিতে ধাক্কা খেয়ে নাকমুখ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছিল। কর্নেল এবার তার দু’হাত পিছনে টেনে আমাকে বললেন,–আমার ব্যাগে দড়ি আছে। শিগগির বের করে দাও।
কর্নেলের পিঠে আঁটা ব্যাগের চেন টেনে নাইলনের শক্ত দড়ি বের করে দিলুম। আমি জানি, এই ব্যাগে ভ্রু-ডাইভার থেকে শুরু করে সবরকমের জিনিস ভরা থাকে। কর্নেল দড়িতে আততায়ীর হাতদুটো পিঠমোড়া করে বেঁধে ওর পিঠ থেকে নামলেন। তারপর চুল খামচে ধরে তাকে দাঁড় করালেন। রক্তাক্ত মুখে সে হাঁফাচ্ছিল। কর্নেল তার পাঁজরে একটা ঘুসি মেরে বললেন,–তোর নাম গোবিন্দ। তাই না?
আততায়ী বয়সে তরুণ। এখনও রক্তাক্ত মুখে তাকে বীভৎস দেখাচ্ছিল। সে কোনও কথা বলল । কর্নেল মুচকি হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–চলো! এই শয়তানটাকে জঙ্গলের ভেতর একটা গাছে বেঁধে রেখে আসি। হাড়মটমটিয়া খুবলে-খুবলে এর মাংস খাবে।
কর্নেল এই বলে তাকে টেনে বাঁদিকে জঙ্গলে ঢোকানোর ভঙ্গি করতেই সে বিকট ভাঙা গলায় কেঁদে উঠল,–আর এমন করব না সার। আমি টাকার লোভেও হো হো! বাবা গো!
কর্নেল বললেন,–আগে বল তোর নাম গোবিন্দ? মিথ্যা বললে তোকে গাছে বেঁধে রেখে আসব।
সে গোঙানো গলায় বলল,–হ্যাঁ সার। আমি গোবিন্দ।
কে তোকে টাকার লোভ দেখিয়ে আমাকে খুন করতে বলেছে?-বলে কর্নেল তার চুল ওপড়ানোর মতো সজোরে ঝাঁকুনি দিলেন।
গোবিন্দ হাঁফাতে-হাঁফাতে বলল,–কেষ্টবাবু সার! আজ আসানসোল যাওয়ার সময় আমাকে বলেছিল, দাড়িওলা সায়েবকে খুন করলে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দেবে।
কর্নেল আবার তার চুলে টান দিয়ে বললেন,–কুমুদবাবুর ছেলে দীপু কোথায়?
-–মা কালীর দিব্যি, জানি না সার! উপেনদা তাকে কলকাতায় একজনের বাড়িতে রেখেছিল। দীপু সেখান থেকে পালিয়ে গেছে।
এই সময় একদল আদিবাসী মজুর হাঁটাপথে রায়গড় স্টেশন থেকে আসছিল। তারা এসে নিজেদের ভাষায় হইচই করতে থাকল। একজন বাংলায় বলল,–সায়েব! এর নাম গোবিন্দ গুন্ডা। পুলিশের তাড়া খেয়ে কলকাতা পালিয়েছিল। আমাদের বস্তিতে গিয়েও এই বজ্জাত গুন্ডা যাকে খুশি, খামোকা মারধর করে টাকা আদায় করত। এই গুন্ডাটা রংলিডিহিতে ঢুকলে আমাদের বউ-ঝিরা ভয়ে ঘরে ঢুকে পড়ত। একে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
বলে সে আদিবাসী ভাষায় কিছু বলল। দুজন দৌড়ে চলে গেল। কর্নেলের নির্দেশে ছোরাটা ভাঁজ করে গোবিন্দের প্যান্টের পকেটে ভরে দিলুম। কর্নেল আদিবাসীদের ঘটনাটা শোনালেন। একজন প্রৌঢ় আদিবাসী আচমকা গোবিন্দর পিঠে এক কিল মেরে নিজেদের ভাষায় কিছু বলল। বুঝলুম, অতীতে গোবিন্দ তার কোনও ক্ষতি করেছিল।
একটু পরে রংলিডিহি থেকে ধামসা আর কঁসি বাজাতে-বাজাতে একদল লোককে আসতে দেখলুম। কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! ওরা গোবিন্দকে হয়তো গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলবে। তার আগে তুমি আর আমি রিভলভার থেকে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে ওদের থামানোর চেষ্টা করব।
