–বুঝেছি সার! আপনি কেষ্ট অধিকারীমশাইয়ের বন্ধুর কথা বলছেন?
–হ্যাঁ। তুমি ঠিক ধরেছ।
–সার! উনি কিছুক্ষণ আগে চলে গেলেন। রিকশো ডেকে দিলুম।
কর্নেল ঘড়ি দেখে মুখে হতাশার ছাপ ফুটিয়ে বললেন,–কী আশ্চর্য! আমার সঙ্গে ওঁর দেখা করার কথা চিল! হঠাৎ কেন চলে গেলেন?
লোকটা বলল,–ওঁকে অধিকারীমশাই টেলিফোন করেছিলেন। তাই চলে গেলেন।
–আর ফিরে আসবেন না বলে গেছেন নাকি?
–হ্যাঁ সার।
–ওঁর নামটা ভুলে যাচ্ছি। ট্রেনে আসবার সময় আলাপ হয়েছিল। ডঃ দেবব্রত চট্টরাজ, না…
–সার! চট্টরাজ নয়। চ্যাটার্জি সায়েব। ডি. চ্যাটার্জি। বড়ো সরকারি অফিসার।
–ঠিক বলেছ!
বলে কর্নেল চলে এলেন। সাইকেলরিকশোতে চেপে বললুম,–বড্ড গোলমেলে ঘটনা কর্নেল!
কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–মিঃ অধিকারী দেখছি গভীর জলের মাছ। কলকাতায় কুমারবাহাদুরের কথা শোনার পরই তার সম্পর্কে আমার সন্দেহ জেগেছিল। তবে আমার এখন মনে হচ্ছে, কুমুদবাবুকে সঙ্গে নিয়ে উনি যখন আমার কাছে যান, তখন উনি দীপুর অন্তর্ধানরহস্যের মূল কারণটা জানতেন না। সম্ভবত পীতাম্বর রায় অর্থাৎ উপেন দত্ত এখানে এসে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তারপর উপেন সম্ভবত মিঃ অধিকারীর কথায় হাড়মটমটিয়ার জঙ্গলে পুঁতে রাখা প্রাচীন রত্নকোষ-হা, জিনিসটাকে প্রাচীন যুগে রত্নকোষ বলা হতো–
ওঁর কথার ওপর বললুম,–ঠিক বলেছেন। মিঃ অধিকারীই হয়তো রত্নকোষ বিনা পয়সায় বাগিয়ে নেওয়ার জন্য জঙ্গলের ভেতর উপেনকে খুন করেছেন।
রিকশোওয়ালার দিকে ইশারা করে কর্নেল আস্তে বললেন,–চুপ! এখন কোনও কথা নয়।
কিছুক্ষণ পরে রিকশোওয়ালা জিগ্যেস করল–আপনারা কি চৌরাস্তার কাছে নামবেন সার?
কর্নেল বললেন, না। তুমি হাইওয়েতে চলল। রংলিডিহির মোড়ে আমরা নামব।
রংলিডিহি নাখুলালদের বস্তির নাম, তা ভুলে গিয়েছিলুম। হাইওয়ে ওই আদিবাসী বস্তির প্রান্তে ধনুকের মতো বেঁকে আবার সোজা দক্ষিণে চলে গেছে। বাঁকের মুখে নেমে রাঙামাটির এবড়োখেবড়ো রাস্তায় হেঁটে বনবাংলোয় পৌঁছুতে মিনিট পনেরো লাগল। রাস্তাটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে চড়াইয়ে উঠেছে। বাংলোর গেটের কাছে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে তিনি উত্তেজিতভাবে বললেন,–জঙ্গলে কী একটা জানোয়ার আছে। আমি ফায়ার করার সুযোগ পাই নাই। নাখুলালের মুখে যা শুনছি তা মিথ্যা না।
কর্নেল বললেন,–একটা পনেরো বাজে। স্নান করেননি কেন?
হালদারমশাই বললেন,–যা ঘটছে, স্নানের কথা মাথায় ছিল না। চলেন। সব কইতাছি।
আমাদের ঘরের তালা খুললেন কর্নেল। দক্ষিণ ও পশ্চিমের জানালা আমিই খুলে দিলুম। নাখুলাল এসে সেলাম দিয়ে বলল,–সুরেন আপনাদের জন্য অপেক্ষা করে বাড়ি গেল। খেয়েদেয়ে আসবে। আপনারা কখন যাবেন সার?
কর্নেল বললেন,–দেড়টায়। এখন সওয়া একটা বাজে।
নাখুলাল চলে গেলে হালদারমশাই যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই :
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে তিনি নাখুলালের সঙ্গে গল্প করতে-করতে বাংলোর পিছনে গিয়েছিলেন। তার মুখে জঙ্গলের হাড়মটমটিয়া নামে অদ্ভুত জন্তুর কথা শোনেন। তারপর উপেন দত্তের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ যেখানে পড়েছিল, তিনি খুঁজতে-খুঁজতে সেখানে যান। তারপর হঠাৎ তার বাঁদিকে ঘন ঝোঁপের ভেতর মটমট করে শুকনো ডাল ভাঙার মতো শব্দ শুনতে পান। অমনই তিনি রিভলভার বের করে সেদিকে সাবধানে এগিয়ে যান। কী একটা কালো ভালুকের মতো জন্তুকে আবছা দেখামাত্র তিনি রিভলভার তাক করেন। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা, জন্তুটা চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সাহস করে ঝোঁপের কাছে গিয়ে তিনি অনেক কালো বোম দেখতে পান। জন্তুটা যে ভালুক নয়, তার কারণ বুনোভালুক মানুষ দেখামাত্র তেড়ে আসে। কিন্তু তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, সে অদৃশ্য হল কেন? পিছনের জঙ্গল আরও ঘন। সেখানে একটা বিড়াল গলে যাওয়ার উপায় নেই।
শোনার পর কর্নেল বললেন,–ওসব নিয়ে ভাববেন না। আর জঙ্গলেও যেন একা যাবেন না। লাঞ্চ খেয়ে নেওয়া যাক। তারপর আপনার সঙ্গে আলোচনায় বসব।
খাওয়ার পর অভ্যাসমতো আমি কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে ভাতঘুমের চেষ্টায় ছিলুম। কর্নেল এবং হালদারমশাই খোলামেলা জায়গায় ঘাসের ওপর দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে চাপাস্বরে কথা বলছিলেন। বুঝতে পেরেছিলুম, কর্নেল এবার গোয়েন্দাপ্রবরকে পুরো ঘটনা ব্যাকগ্রাউন্ডসমেত জানাতে চান।
কতক্ষণ পরে আমার ঘুমের রেশ ছিঁড়ে গিয়েছিল কর্নেলের ডাকে। শীতের রোদ ফিকে সোনালি হয়ে উঠেছে। চারটে বেজে গেছে। আমি উঠে বসলে কর্নেল বললেন,–শিগগির তৈরি হয়ে নাও। সঙ্গে তোমার ফায়ার আর্মস নেবে।
বললুম,–এসময় এক পেয়ালা চা বা কফি খেলে শরীরটা চাঙ্গা হতো।
কর্নেল হাসলেন,–ওই দ্যাখো, টেবিলে প্লেট ঢাকা দেওয়া তোমার চায়ের কাপ। আমি আর হালদারমশাই কফি খেয়ে নিয়েছি।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম,–হালদারমশাইও যাচ্ছেন তো?
–উনি কিছুক্ষণ আগে চলে গেছেন।
–ওঁকে কোথায় পাঠালেন?
–আসানসোলে মিঃ অধিকারীর হেডঅফিসে। সেখানে ওঁর একটা বাড়িও আছে। সুরেন হালদারমশাইকে রংলিডিহির মোড়ে বাসে তুলে দেবে। ঘণ্টাতিন সময় লাগবে।
–ওঁকে আসানসোলে পাঠালেন কেন?
কর্নেল পিঠে তার কিটব্যাগ এঁটে গলা থেকে বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা ঝুলিয়ে তৈরি হয়ে আছেন। চোখ কটমটিয়ে ধমক দিলেন,–নো কেন! চা গিলে শিগগির তৈরি হও। অত কেন-কেন কেন?
