কিছুক্ষণ পরে কর্নেল এসে বারান্দায় বসলেন। বিছানা থেকে উঠে পড়লুম। বারান্দায় আমাকে দেখে কর্নেল বললেন,–ভেবেছিলুম তুমি কম্বল ঢাকা দিয়ে ঘুমোচ্ছ!
বেতের চেয়ার টেনে বসে বললুম,–স্নান করে খেয়েদেয়ে ঘুমোব। কিন্তু আপনি কি হাড়মটমটিয়ার খোঁজে বাংলোর পিছনে ওত পেতেছিলেন?
-না। নাখুলালের সঙ্গে গল্প করছিলুম। লোকটি খুব সরল প্রকৃতির। আদিবাসীদের এই গুণটা আছে। খ্রিস্টান হলেও রংলিডিহির বুড়ো-বুড়িরা যেমন, তেমনি যুবক-যুবতীরাও জঙ্গলের দেবতাকে মানে। শুনলে না? তখন নাখুলাল ঠাকুরবাবার কথা বলছিল। তবে এই ঠাকুরবাবা এক ভয়ঙ্কর দেবতা। আগে মানুষের রক্ত খেত। এখন মুরগির রক্ত পেলেই খুশি হয়। জঙ্গলের মধ্যে যেখানে একটা ডোবা আছে, ওটার পাড়ে ঠাকুরবাবার থান ছিল। এখন থানটা বটগাছের শেকড়ে ঢাকা পড়েছে। তবে নাখুলালের মুখ থেকে কিছু তথ্য পেলুম। দীপুর হারিয়ে যাওয়ার রাত্রে ডোবার পাড়ে রক্ত দেখে পুলিশ বলেছিল, আদিবাসীরা মুরগি বলি দিয়েছিল, সেই রক্ত। নাখুলাল বলল, পুলিশের কথা ঠিক। কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে কেউ-কেউ ঠাকুরবাবার কাছে মুরগি বলি দিয়ে মানত করে। মানত করার জন্য গোপনে বিকেলের দিকে বলির জায়গাটা পরিষ্কার করতে হয়। তো নাখুলাল কথায়-কথায় বলে ফেলল, কোজাগরী পূর্ণিমার রাত্রে মানত দিয়েছিল তার জ্যাঠুতুতো দাদা মানকু। মানকুর সঙ্গে বিকেলে গোপনে থান পরিষ্কার করতে গিয়েছিল শিবু। শিবু খ্রিস্টান হলেও ওঝার পেশা ছাড়েনি। সে মন্তরতন্তর জানে।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন। জিগ্যেস করলুম,–তারপর?
কর্নেল আস্তে বললেন,–মানকু আর শিবু-ওঝা দুটো লোককে একটা ঝোঁপের আড়ালে বসে থাকতে দেখেছিল। তাদের সাড়া পেয়ে ওরা লুকিয়ে পড়ে। ওদের একজনকে মানকু আর শিবু চিনতে পেরেছিল। সেই লোকটা রায়গড়ের উপেন দত্ত। অন্যজনকে চিনতে পারেনি।
–এসব কথা কি ওরা পুলিশ বা কুমুদবাবুকে বলেছিল?
–না। ওরা খামোকা ঝামেলায় জড়াতে চায়নি। তাছাড়া ওদের মানত করার কথা শুনলে ফাদার স্যামুয়েল চটে যেতেন। মিশন থেকে সাহায্য বন্ধ হয়ে যেত। তাই নাখুলাল আমাকে অনুরোধ করল, এসব কথা যেন কাকেও না বলি।
কথাগুলো শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম। বললুম,–কর্নেল! তাহলে উপেন দত্ত ওরফে পীতাম্বর রায় আর তার সেই গুন্ডা গোবিন্দ বল কুড়োতে আসা দীপুকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর দীপু কোনও সুযোগে পালিয়ে যায়। তাই পীতাম্বর রায় কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।
কর্নেল হাসলেন,–অঙ্কটা একটু জটিল জয়ন্ত!
–কেন?
কর্নেল বললেন,–পরে বুঝবে। আপাতত স্নান করে ফেলো। প্রায় বারোটা বাজে।
স্নানাহারের পর কর্নেল বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে হেলান দিলেন। আমি অভ্যাসমতো ভাতঘুম দিতে গায়ে কম্বল চাপা দিলুম। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।
সেই ঘুম ভাঙল চৌকিদারের ডাকে। সে চা এনেছিল। বিছানা ছেড়ে ঘড়ি দেখলুম। চারটে বেজে গেছে। জিগ্যেস করলুম,–কর্নেলসায়েব কোথায় নাখুলাল?
চৌকিদার বলল,–সুরেন এসেছিল সার! কর্নেলসায়েব তার সঙ্গে আমাদের বস্তিতে গেছেন।
কর্নেলের খেয়ালিপনা আমার জানা! রাগ করার মানে হয় না। বারান্দা থেকে লনে গিয়ে দিনশেষের বিবর্ণ রোদে দাঁড়িয়ে চা পানে মন দিলুম। লনের দুধারে সুদৃশ্য স্কুলবাগান। ঝাউগাছ, অর্কিড আর কয়েকরকম পাতাবাহার। এতক্ষণে দেখলুম একজন মালি এসে আপনমনে বাগান পরিচর্যা করছে। চৌকিদার তার সঙ্গে গল্প করতে গেল।
প্রায় এক কিলোমিটার দূরে রেললাইন পূর্ব থেকে বাঁক নিয়ে পশ্চিম ঘুরেছে। ঢিমেতালে এগিয়ে চলেছে একটা মালগাড়ি। রেললাইন পেরিয়ে একটা পিচের রাস্তা এই বাংলোর পূর্বদিকে আদিবাসী বস্তির কিনারা ঘেঁসে উত্তরে অদৃশ্য হয়েছে। ওটাই বোধহয় রায়গড়গামী সড়ক। এই অবেলায় পিচের সড়কে মাঝে-মাঝে একটা করে ট্রাক বা বাস যাতায়াত করছে। একটা সাদা অ্যাম্বাসাডারও আসতে দেখলুম। গাড়িটা আদিবাসী বস্তির পূর্বে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মালি কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার সময় আমাকে সেলাম ঠুকে গেল। সরকারি অফিসার ভেবেছে হয়তো। চৌকিদার বাংলোর পিছনের ঘর থেকে একটা চীনা লণ্ঠন জ্বেলে আমাদের ঘরে রাখল। তারপর একটা হ্যারিকেন বারান্দায় টেবিলে রাখল।
বললুম,–নাখুলাল? তুমি পেছনের ঘরে থাকো। তোমার ভয় করে না?
নাখুলাল বুকে ক্রস এঁকে বলল,–না সার! আমার বল্লম আর তির-ধনুক আছে। তবে সার। জঙ্গলে আছেন বাবাঠাকুর আর আমার বুকে ক্রস আছে। প্রভু যিশু আছেন মাথার ওপর। ওই দেখুন! প্রভুর দয়া! চাঁদ উঠেছে।
এই বনভূমিতে জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য উপভোগ করব কী, আমার মনে শুধু সেই অদ্ভুতুড়ে জন্তুটার জন্য আতঙ্ক। হাওয়ায় গাছপালার অদ্ভুত শব্দে এদিক-ওদিকে তাকাচ্ছিলুম। হাতে ততক্ষণে টর্চ নিয়েছি এবং আমার লাইসেন্সড রিভলভারটা ঘরে বালিশের পাশে রেখেছি।
বারান্দায় বসে অকারণ এদিকে-ওদিকে টর্চের আলোয় জ্যোৎস্নাকে ক্ষতবিক্ষত করছিলুম। কতক্ষণ পুরে কাঠের গেট খুলে কর্নেলকে ঢুকতে দেখলুম। তিনি কাকে বললেন,–এবার তুমি চলে যাও। খামোকা কষ্ট করে আমার সঙ্গে আসার দরকার ছিল না।
কেউ বলল,–তা কি হয় সার? আপনি বাংলোয় না পৌঁছানো পর্যন্ত মনে শান্তি পেতুম না।
